
২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে কিশোর শিক্ষার্থীরা রাজপথে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলেছিল “উই ওয়ান্ট জাস্টিস”। কিন্তু আজ ২০২০ সালে এসে সড়কের বাস্তবচিত্র বিচার করলে দেখা যায়, সেই ‘জাস্টিস’ বা ন্যায়বিচার আজও সিন্ডিকেটের দেওয়ালে আটকে আছে। ঢাকার সড়ক আজ কেবল অব্যবস্থাপনার শিকার নয়, বরং এটি পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর শক্তিশালী সিন্ডিকেট এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দুর্নীতির এক অভেদ্য চক্রে বন্দি। রাজপথে প্রতিদিন যে মৃত্যু ঘটছে, তাকে কেবল ‘দুর্ঘটনা’ বলা ভুল; এটি আসলে একটি পদ্ধতিগত অবিচার।
সড়ক পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলার মূলে রয়েছে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর একাধিপত্য। এই সংগঠনগুলো কেবল ব্যবসায়িক স্বার্থই দেখে না, বরং তারা রাজনৈতিকভাবে এতটাই প্রভাবশালী যে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা রাখে। ২০১৮ সালে যখন বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর সড়ক পরিবহন আইন পাস করা হয়, তখন এই সিন্ডিকেটগুলো নজিরবিহীন বাধার সৃষ্টি করে। ২০১৯ সালে আইনটি কার্যকর করার উদ্যোগ নিলে পরিবহন নেতারা দেশজুড়ে ধর্মঘট ডেকে জনজীবন অচল করে দেন।
গবেষণায় দেখা যায়, এই সিন্ডিকেটগুলোর প্রধানেরা প্রায়ই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে থাকেন, যা এক ভয়াবহ স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে। যখন একজন পরিবহন শ্রমিক নেতা একই সাথে সরকারের নীতিনির্ধারক হন, তখন সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে পরিবহন খাতের মুনাফা ও আধিপত্যই প্রাধান্য পায়। ফলে আইনের কঠোর ধারাগুলো যেমন বেপরোয়া চালনার শাস্তি বা ফিটনেসবিহীন যানের জরিমানা এই সিন্ডিকেটের চাপে বারবার শিথিল করা হয়।
সড়কে অদক্ষ চালক এবং ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন নামার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে বিপুল সংখ্যক ড্রাইভিং লাইসেন্স যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এমন অনেক চালক সড়কে নেমেছেন, যাদের ট্রাফিক নিয়ম বা নিরাপদ ড্রাইভিং সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণাও নেই।
একজন অদক্ষ চালক যখন অর্থ বা প্রভাবের মাধ্যমে লাইসেন্স পান, তখন তিনি কার্যত একটি ঝুঁকিপূর্ণ যান চালানোর অনুমতি পান। একইভাবে, ফিটনেসবিহীন যানবাহনও নানা অনিয়মের মাধ্যমে সড়কে চলাচল করছে। এতে করে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ক্রমাগত হুমকির মুখে পড়ছে।
২০১৮ সালের আন্দোলনের চাপে প্রণীত সড়ক পরিবহন আইন ছিল সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়নি। বিভিন্ন সময় সিন্ডিকেটের চাপের মুখে আইনের প্রয়োগ শিথিল করা হয়েছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কঠোর ধারাগুলো সংশোধনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, এর নিরপেক্ষ ও কার্যকর প্রয়োগই মূল বিষয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বড় দুর্ঘটনার পরও অনেক ক্ষেত্রে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অনিয়ম, প্রভাব এবং দুর্বল প্রয়োগের কারণে বিচার প্রক্রিয়া অনেক সময়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
পরিবহন খাতের এই অব্যবস্থার পেছনে রয়েছে টার্মিনালভিত্তিক এক অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি, যেখানে বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এই অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত চালকদের ওপরই এসে পড়ে, যারা নির্দিষ্ট বেতন কাঠামোর বাইরে থেকে কাজ করতে বাধ্য হন।
ফলে চালকদের মধ্যে তৈরি হয় অতিরিক্ত যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা, যা তাদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাতে উৎসাহিত করে। এভাবে অদক্ষ চালক, দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামো এবং দুর্বল আইন প্রয়োগ, এই তিনটি উপাদান একত্রে ঢাকার সড়ককে ক্রমেই অনিরাপদ করে তুলছে।
সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে এই সিন্ডিকেটনির্ভর কাঠামো ভেঙে ফেলতে হবে। প্রয়োজন একটি স্বাধীন ও কার্যকর রোড সেফটি কর্তৃপক্ষ, যা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারবে। পাশাপাশি ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ফিটনেস সনদ প্রদানের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে।
একই সঙ্গে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রভাবের সুযোগ না থাকে। পরিবহন খাতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং চালকদের জন্য একটি স্থিতিশীল বেতন কাঠামো তৈরি করাও অত্যন্ত জরুরি।
ঢাকার রাজপথ আজ কেবল যানবাহনের চলাচলের পথ নয়, এটি ক্ষমতার দম্ভ ও দুর্নীতির প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনের দুর্ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার ফল। ২০১৮ সালে কিশোর শিক্ষার্থীরা আমাদের যে বার্তা দিয়েছিল, আমরা এখনো তা বাস্তবায়ন করতে পারিনি।
যদি আজও এই সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির চক্র ভাঙা না যায়, তবে ন্যায়বিচার কেবল স্লোগান হয়েই থেকে যাবে। রাজপথে আর কোনো নিরীহ প্রাণ হারানোর আগে আমাদেরই এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি তুলতে হবে। নিরাপদ সড়ক কোনো বিলাসিতা নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।