
মার্কিন সরকারের প্রকাশিত জেফ্রি এপস্টাইন সংক্রান্ত সর্বশেষ নথিতে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের একাধিক উল্লেখ পাওয়া গেছে। তবে নথিগুলোতে এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ নেই। এপস্টাইন ফাইলের এই অংশে মূলত যোগাযোগ, ইমেল আদান–প্রদান, সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও বৈঠকের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নাম উঠে এসেছে।
নথিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম আছে উল্লেখ করা হলেও তথ্যটি ভূয়া বলে নিশ্চিত করেছে রিউমার স্কানার।
এদিকে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নাম আলোচিত এই নথিতে পাওয়া গেছে। একটি নথিতে উল্লেখ রয়েছে, জনপ্রিয় অ্যানিমেটেড সিরিজ দ্য সিম্পসনস-এর স্রষ্টা ম্যাট গ্রোনিংয়ের সঙ্গে ইউনূসের পরিচয় করিয়ে দেওয়া ব্যক্তিদের নাম পরবর্তীতে ফাইল থেকে মুছে ফেলা হয়।
এপস্টাইন ফাইলে উল্লেখিত বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে- ব্র্যাক, আইসিডিডিআর, বি এবং ওয়েস্ট কনসার্ন বাংলাদেশ। ৪ জানুয়ারি ২০১০ তারিখের একটি ইমেলে দেখা যায়, এপস্টাইনের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী বাংলাদেশ ও ভারত সফর করেছিলেন, যদিও সফরের উদ্দেশ্য নথিতে উল্লেখ করা হয়নি।
একাধিক ইমেলে জেফ্রি এপস্টাইনের কার্বন ক্রেডিট ট্রেডিংয়ে সম্পৃক্ত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। একটি ইমেলে একজন ব্যক্তি নিজেকে ওয়েস্ট কনসার্ন বাংলাদেশের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে এপস্টাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আরেকটি ইমেলে উল্লেখ করা হয়, এপস্টাইন IRRC নামে একটি প্রকল্পে যুক্ত হতে আগ্রহী ছিলেন, যার একটি অংশ ছিল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
ব্র্যাক সংক্রান্ত একটি ইমেলে একটি টিকাদান কর্মসূচির গবেষণার জন্য একজন তথ্যচিত্র নির্মাতা নিয়োগের কথা উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী নিয়ে এপস্টাইনের আগ্রহের কথাও নথিতে পাওয়া যায়। এ বিষয়ে ব্র্যাকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ বারবার উঠে এসেছে।
আইসিডিডিআর, বি সম্পর্কিত একাধিক ইমেলে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি বিখ্যাত জনস্বাস্থ্য গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ১৭ এপ্রিল ২০১৪ তারিখের একটি ইমেলে ঢাকার আইসিডিডিআর,বি-কে ‘অত্যন্ত বিখ্যাত’ ও ‘সুপরিচিত’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে আন্ত্রিক মাইক্রোবায়োলজি গবেষণার ভিত্তিতে একটি প্রোবায়োটিক প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাবে ১০ বছরের বিনিয়োগ, ৩ শতাংশ নিশ্চিত মুনাফা এবং এটিকে একটি দাতব্য সুযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
তবে নথিতে একটি ‘ব্যর্থ’ কলেরা প্রকল্পের কথাও উঠে এসেছে। ১৪ জুলাই ২০১৫ তারিখের একটি iMessage কথোপকথনে এপস্টাইন লেখেন, তিনি বাংলাদেশে কলেরা সংক্রান্ত বিষয়ে সহায়তা করার চেষ্টা করেছিলেন, যেখানে লাখ লাখ ডলার ব্যয় হলেও ফলাফল নেতিবাচক হয়েছিল।
শ্রম ও মানবিক বিষয়ক অংশে একটি মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে, এপস্টাইনের বাড়ি বা ম্যাসাজ পার্লারে একজন বাংলাদেশি গৃহকর্মী নিয়োজিত ছিলেন। মামলার সাক্ষী আলফ্রেডো রদ্রিগেজ জানান, ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে কিছু বাংলাদেশি থাকতে পারেন, যদিও তারা বাংলাদেশি না ফিলিপিনো ছিলেন- সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। একই সঙ্গে একটি ‘বাংলাদেশি দম্পতি’-র কথাও উল্লেখ রয়েছে, যাদের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থাকার ধারণা করা হয়।
নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে একটি কেবল টিভি বিল বা চালানের, যেখানে গ্রাহকের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছিল। যদি এটি এপস্টাইনের হয়ে থাকে, তবে ধারণা করা হয় তিনি বাংলা বা বাংলাদেশি টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য অর্থ পরিশোধ করতেন। এছাড়া, একাধিক প্রার্থীর মধ্য থেকে একজন বাংলাদেশি গবেষককে এপস্টাইন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলেও নথিতে উল্লেখ আছে।
আরেকটি নথিতে জাতিসংঘের ৬৭তম সাধারণ পরিষদের একটি কর্মসূচির কথা পাওয়া যায়, যেখানে লেখা ছিল- ‘রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নৈশভোজ অনুষ্ঠান- জেফ্রি এপস্টাইন: রাত ৮টা থেকে রাত ১০টা ৩০ মিনিট।’
নিউ মেক্সিকোর সাবেক গভর্নর বিল রিচার্ডসনের দাতাদের তালিকায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ আবদুল আউয়াল মিন্টুর নাম পাওয়া গেছে। নথি অনুযায়ী, তিনি ২০০৬ সালে রিচার্ডসনের নির্বাচনী প্রচারণায় পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান দেন। তবে মিন্টু ও জেফ্রি এপস্টাইনের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এপস্টাইন ফাইলে বাংলাদেশের নাম বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে উঠে এলেও, প্রকাশিত নথিতে বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এপস্টাইনের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।