বৃহস্পতিবার ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫ মাঘ ১৪৩২

শিরোনাম: ২২ বছর পর আজ রাজশাহী যাচ্ছেন তারেক রহমান   রাজধানীতে বাস চাপায় ব্যাংক কর্মচারীর মৃত্যু    হোয়াটসঅ্যাপ-ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম চালাতে গুণতে হবে টাকা    হিলিতে চালের দাম কমেছে কেজিতে ৮ টাকা   ৮ জেলার শীত নিয়ে বড় দুঃসংবাদ    রাবির বি ইউনিটের ফল প্রকাশ   পুঁজিবাজারে সূচকের বড় উত্থানে বেড়েছে লেনদেন    
১৭ মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৫ খুন!
কিশোর গ্যাং, জমি বিরোধ ও গণপিটুনি, অস্থিরতার নেপথ্যে কী?
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:০৫ AM

জুলাই–আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী গত ১৭ মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সংঘটিত হয়েছে অন্তত ৫৫টি হত্যাকাণ্ড। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৯টি মামলা দায়ের হয়েছে এবং কয়েকটি মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, ধারাবাহিক এই হত্যাকাণ্ড জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে গভীর উদ্বেগজনক অবস্থায় নিয়ে গেছে।

অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে, বাড়ছে সহিংসতা, এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকরা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে সহিংসতার চরিত্রে একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা বৃদ্ধি, মাদকের সহজলভ্যতা, তুচ্ছ ঘটনায় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা, জমি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ এবং গণপিটুনির ভয়াবহ বিস্তার এসব সহিংসতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে সীমান্তঘেঁষা উপজেলাগুলোতে সামাজিক উত্তেজনা দ্রুত প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

২০২৪ সালের আগস্ট মাসেই সহিংসতার ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৭ আগস্ট ভোলাহাটে ডাকাত সন্দেহে সানোয়ার নামে এক যুবককে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিনে নাচোলে স্কুলছাত্র ইসমাইল হোসেনের লাশ উদ্ধার হয়, যাকে পূর্বশত্রুতার জেরে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা পুলিশের।
১০ আগস্ট শিবগঞ্জে রায়হান আলী নামে এক যুবককে গলাকেটে হত্যা করা হয়। পুলিশের ধারণা, মোটরসাইকেল ছিনতাই ও আধিপত্য বিস্তারই ছিল এর পেছনের কারণ।

২৭ আগস্ট একই উপজেলায় নবম শ্রেণির ছাত্র আব্দুল করিমকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৪ সেপ্টেম্বর পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে রাজমিস্ত্রি বাদল আলী লাঠির আঘাতে প্রাণ হারান।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ভোলাহাটে পারিবারিক কলহ থামাতে গিয়ে ভাতিজার ছুরিকাঘাতে নিহত হন চাচা ইসমাইল হোসেন।

১০ অক্টোবর সদর উপজেলায় এক ইমামের ওপর হামলার পর স্থানীয়দের গণপিটুনিতে নিহত হন মাদকাসক্ত মিজানুর রহমান মিজু।

৩০ অক্টোবর ভোলাহাটে ডাকাত সন্দেহে জাহাঙ্গীর ও ইয়াকুব আলী নামে দুই ভাই গণপিটুনিতে নিহত হন।

নভেম্বরের মাঝামাঝি শিবগঞ্জে মানসিক ভারসাম্যহীন জামাতার শাবলের আঘাতে নিহত হন শাশুড়ি সাকিনা বেগম।

২০ নভেম্বর গোমস্তাপুরে খাস জমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে আব্দুস সাত্তার ও তোফাজ্জল হোসেন নিহত হন, আহত হন অন্তত ১৪ জন।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নাচোলে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে মাসুদ ও রায়হান নামে দুই কিশোর প্রাণ হারায়।

২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি নাচোলে খাস জমি দখল নিয়ে সংঘর্ষে আহত তরিকুল ইসলাম বকুল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ৯ জুন গোমস্তাপুরে শিশুদের ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধে বাশেদ আলী বিশু নামে এক বৃদ্ধ নিহত হন।

জুন মাসে শিবগঞ্জে ঘাস কাটা ও জমি নিয়ে বিরোধে মাসুদ রানা, রফিকুল ইসলাম ও নজরুল ইসলামসহ তিনজন নিহত হন।

২৩ জুন নাচোলে ভ্যানচালক রাজু আহমেদের গলাকাটা লাশ উদ্ধার হয়; ভ্যান ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা পুলিশের।

৫ জুলাই জমি বিরোধে নিজ ভাইদের হাতে নিহত হন শুকরানি বেগম। ৯ জুলাই সদরের রামচন্দ্রপুর হাট এলাকায় পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হন মাদকাসক্ত মাহাবুবুল ইসলাম বাবু।

১৮ আগস্ট গোমস্তাপুরে আমবাগান থেকে এক অজ্ঞাতনামা নারীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২২ আগস্ট নাচোলে মাদকাসক্ত স্বামীর নির্যাতনে মারা যান আঁখি রাণী।

১৫ অক্টোবর নাচোলে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত মিলন ও আলম নামে দুই ভাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

২৯ নভেম্বর শিবগঞ্জে দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হন বৃদ্ধ নৈশ্যপ্রহরী মো. তোজ্জামেল হক। ৮ ডিসেম্বর সদরের ইসলামপুরে চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত হন মোশারফ হোসেন। একই রাতে শিবগঞ্জে যুবদলকর্মী নয়নকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

স্থানীয় আইনজীবী মো. সাইফুল ইসলাম রেজা বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। হত্যাকাণ্ডের কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি অভিযোগ করেন, কিছু মামলায় চার্জশিট দাখিলে বিলম্বের কারণে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে। গণপিটুনির বিষয়ে তিনি বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এমনকি অপরাধী হলেও তাকে হত্যা করা দণ্ডনীয় অপরাধ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, ৫৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৪৯টি মামলা হয়েছে। অধিকাংশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কয়েকটি মামলার চার্জশিটও দাখিল করা হয়েছে।

তিনি জানান, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশি তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে।

ক্রমবর্ধমান হত্যাকাণ্ড কি সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি, নাকি প্রশাসনিক দুর্বলতার ফল, এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসীর মনে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।



« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: vorerpata24@gmail.com বার্তা ইমেইল:news@dailyvorerpata.com বিজ্ঞাপন ইমেইল:vpgmad@gmail.com