* অভিযুক্তকে থানা হেফাজত থেকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ! * আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা না হওয়ায় * অনেক প্রশ্নের জবাব মিলছে না!

যশোরের ঝিকরগাছার পল্লীতে ৫ম শ্রেণিতে পড়ুয়া সাদিয়া আক্তার (১৩)নামের এক কিশোরীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় নানা জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে। থানা পুলিশের ভূমিকায় নানা প্রশ্ন ও সন্দেহের উদ্রেক করেছে। এই ঘটনায় অনেক প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে।
স্বজনদের অভিযোগ, তাকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনায় জড়িত সন্দেহভানকে পুলিশি হেফাজত থেকে ছেড়ে দেবার ঘটনায় নানা প্রশ্ন ও গুজব-গুঞ্জনের ডালপালা মেলেছে। পুলিশের বক্তব্যে অনেক প্রশ্নের জবাব মিলছে না!
অভিযোগ উঠেছে, ভিকটিম পরিবারের বিশেষ করে নিহত কিশোরীর বাবা-মায়ের বক্তব্য যদি সঠিক হয়ে থাকে তবে, নির্মম-নৃশংস অথচ অপমৃত্যুর এই ঘটনায় অভিযুক্তকে ''আত্মহত্যায় প্ররোচনার দায়ে নিয়মিত মামলা দায়েরপূর্বক তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করা যেত। কিন্তু সেটি না করে ঝিকরগাছা থানার পুলিশ অজ্ঞাত কারণে অভিযুক্তকে থানা থেকে ছেড়ে দিয়েছেন। পুলিশের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছেন খোদ ভিকটিম পরিবার ও গ্রামবাসী। এই ঘটনায় অনেকে অবাক ও বিস্মিত হয়েছেন।
পুলিশের দাবি, "ভিকটিম পরিবার প্রথমে কোন মামলা দায়ের কিংবা পোস্টমর্টেম ছাড়াই নিহত কিশোরীর লাশ ফেরত চেয়েছিলেন।
স্থানীয় একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিসহ অভিযুক্তের পক্ষের কয়েকজন থানায় এসে লাস ফেরত চেয়েছিলেন। কিন্তু,আইনগত সমস্যার কথা বিবেচনা করে লাশের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করত: লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।তারা মামলা করতে রাজি হননি"।
পুলিশের ভাষ্য, "এটি ঘটনার গত ১৮সেপ্টেম্বরের কথা। খবর পেয়ে এদিন নিহতের লাশ উদ্ধারপূর্বক পোস্টমর্টেম রিপোর্টের জন্য যশোর ২৫০শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
এই ঘটনায় সেপ্টেম্বর রাতে স্থানীয় জনতা অভিযুক্ত সন্দেহভাজন হুমায়ুন কবিরকে আটক করে ঝিকরগাছা থানার পুলিশকে খবর দেয়া হয়। পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানার হেফাজতে নেয়। পরদিন তাকে পাঁচ ব্যক্তির জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হয়।
পুলিশের দাবি, "যেহেতু একটি অপমৃত্যু মামলা রেকর্ড হয়েছে এবং পোস্টমর্টেম সম্পন্ন হয়েছে। সেহেতু আমরা পোস্টমর্টেম রিপোর্টের অপেক্ষায় আছি। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পজিটিভ হলে আসামিকে গ্রেফতার করা হবে"।
প্রশ্ন হল,নিহত কিশোরী সাদিয়া আক্তারের (১৩) মা মোছা: সালমা খাতুন (২৫)ও বাবা দরিদ্র ভ্যানচালক শহিদুল ইসলাম (৩৫) গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, "থানা পুলিশের পাশাপাশি আদালতে একটি পিটিশন মামলা করা হয়। তাদের দাবি, কোর্টের মামলাটি ঝিকরগাছা থানার পুলিশ নিয়মিত মামলা হিসেবে রেকর্ড করেছে বলে তারা শুনেছেন। কিন্তু, কে বা কারা এই বিষয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তা তারা বলতে পারেননি"। এই অভিযোগের সত্যতা জানতে চাওয়া হলে থানার ওসি তদন্ত ইদ্রিস আলী বিষয়টি স্পষ্ট করেননি।
অভিযুক্তকে ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, 'ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে অভিযুক্তকে লিখিত জিম্মাই ছেড়ে দেয়া হয়েছে'। পোস্টমর্টেমে পজেটিভ রিপোর্ট হাতে পেলে আসামিকে গ্রেফতার করা হবে"।
অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত হুমায়ুন কবির ওরফে ভোলা (৩০) তার মেয়েকে প্রায়ই নানাভাবে উত্ত্যক্ত করত। বিষয়টি তাদের পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও নিকট প্রতিবেশীরাও জানেন।
উল্লেখ্য, নিহত কিশোরী সাদিয়া আক্তার উপজেলার হাজিরবাগ ইউনিয়নের দেউলী গ্রামের দরিদ্র ভ্যানচালক শহিদুল ইসলামের মেয়ে।
অভিযুক্ত হুমায়ুন কবির নিহতের নিকট প্রতিবেশী আব্দুস সালাম ওরফে ভোলার ছেলে।
ঘটনাটি ঘটে, গত শুক্রবার (১৮সেপ্টেম্বর) বিকালে।
নিহতের মা মোছা: সালমা খাতুনের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ মাদকাসক্ত বখাটে যুবক হুমায়ুন কবিরকে দেউলী গ্রামের বটতলা মোড় থেকে সোমবার রাতে (২১সেপ্টেম্বর) গ্রেপ্তার করে।
সাদিয়ার মায়ের দাবি, তার মেয়েকে পাশবিক নির্যাতন করে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনি অভিযুক্তের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। নিহত সাদিয়া আক্তার দেওলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তো।
নিহতের মা সালমা খাতুন, পিতা শহিদুল ইসলামসহ আত্মীয়-স্বজন ও নিকট প্রতিবেশীদের সাথে এ প্রতিবেদকের কথা হয়।
নিহতের মা সালমা খাতুন ও বাবা শহিদুল ইসলাম দাবি করেন, হুমায়ুন কবির তার মেয়েকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করত। বিষয়টি তাদের কাছে প্রকাশ করেছিল মেয়ে সাদিয়া আক্তার। ঘটনার পাঁচ দিন আগেও সাদিয়ার হাতে কিছু একটা দিতে দেখেন তার মা। ফলে তার মা মেয়েকে সতর্ক করেছিল। ঘটনার দিন তার মা সালমা খাতুন মাঠে ঘাস কাটতে গেছিল। তার বাবা ভ্যান চালক শহিদুল ইসলাম তার চাচা হযরতের নার্সারি থেকে গাছের চারা নিয়ে মহেশপাড়া বাজারে গিয়েছিল। এসময় বাড়িতে কেউ ছিলেন না।এ পর্যায়ে প্রতিবেশী রাজুর মেয়ে মিম(১০)প্রথমে সাদিয়ার ঘরের ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পাই। তার ডাকচিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। এ পর্যায়ে বাড়ির আশপাশের মহিলাদের মাধ্যমে নিহতের চাচা মাসুম বিল্লাহ ও তাদের নিকট প্রতিবেশী আব্দুর রহিম সাদিয়া আক্তার গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে মর্মে জানতে পারেন। তারা বিষয়টি জানতে পেরে সাদিয়ার বাবার মোবাইলে তার মেয়েকে ঘরের সিলিং ফ্যানে ঝুলন্ত অবস্থার কথা জানান।প্রতিবেশীরা তাকে মুমূর্ষূ অবস্থায় উদ্ধার করে বাগআঁচড়া বাজারের একটি ক্লিনিকে নিয়ে যায়। সেখানে সাদিয়ার মৃত্যু ঘটেছে বলে জানানো হয়।
এ ব্যাপারে নিহতের দাদা শওকত গাজী,দাদি রফিকা বেগম, প্রতিবেশী মোস্তাফিজুর রহমান, নাজমুন নাহার বেগম, নেহাতের চাচা মাসুম বিল্লাহ, প্রতিবেশী আব্দুর রহিম, নিহতের ফুপু কাজল বেগম, প্রতিবেশী চাচা মুসা রাজের দাবি, অভিযুক্ত হুমায়ুন কবির নিয়মিত গাঁজাসেবনের পাশাপাশি সব রকমের নেশায় আসক্ত ছিল। তার প্রথম স্ত্রীসহ দ্বিতীয় স্ত্রীকে একটি কন্যা সন্তান থাকা অবস্থায় তালাক দিয়েছে।
জানা যায়, খবর পেয়ে ঝিকরগাছা থানার পুলিশের উপ পরিদর্শ মুস্তাফিজুর রহমান লাশের সুরতাল রিপোর্ট প্রস্তুত করেন। অতঃপর লাশ যশোর ২৫০শয্যা বিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করেন। এ ব্যাপারে ঝিকরগাছা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা রেকর্ড করেন।
এদিকে এ ব্যাপারে ঝিকরগাছা থানা হাজতে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে থাকা অভিযুক্তের কোন প্রকার বক্তব্য ছাড়াই ভিডিও ক্লিপ ধারণের অনুমতি চাইলে ডিউটি অফিসার এসআই ফিরোজ জানান, অফিসার ইনচার্জ ছুটিতে আছেন। ওসি তদন্ত বর্তমানে পুলিশ স্টেশনে নেই। তাদের অনুমতি ছাড়া ফুটেজ দেয়া সম্ভব নয়। বিষয়টি নাভারন সার্কেল এএসপি আরিফের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টার পর তিনি ফোন রিসিভ করেন। কিন্তু, সাংবাদিকদের তথ্য দেয়া যাবে না বলে তিনি জানিয়ে দেন।