গণপূর্তের আশরাফুলের এখন সম্পদের পাহাড়, দুর্নীতির সত্যতা পেয়েছে একনেক

  • ৩১-জানুয়ারী-২০১৯ ০৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

গণপূর্ত অধিদফতরের রংপুর জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আশরাফুল আলমের দুর্নীতি ও অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে একনেকের তদন্ত কমিটি। তদন্তে পাওয়া গেছে, উচ্চ দর দেখিয়ে নিম্নমানের নির্মাণ সাগ্রমী সরবরাহের মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন ওই কর্মকর্তা।

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের আইএমইডি প্রতিবেদনে সমস্যা ও অনিয়ম ধরা পড়ে। মানহীন নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য এবং পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটি করা হয়। মেসার্স শাহ ইসলাম কনস্ট্রাকশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে হাসপাতালটির নির্মাণের কার্যাদেশ দেয়া হয়।

ওই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মালিক শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ। যিনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পালাতক আসামি। অভিযোগ ওঠেছে, কায়কোবাদসহ অন্যান্য ঠিকাদারের সঙ্গে আঁতাত করে মানহীন সরঞ্জাম সরবরাহ ও ব্যবহার করে হাসপাতালটি নির্মাণ করেন আশরাফুল আলম।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এর সচিবের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল ২০১২ সালের ১২ জুন হাসপাতাল নির্মাণ কাজ পরির্দশন করেন। এসময় তারা ১০ তলা বিশিষ্ট মূল হাসপাতাল ভবন, ডাক্তারদের জন্য ৬ তলা আবাসিক ভবন, স্টাফদের ৬ তলা আবাসিক ভবন ও নার্সদের ডরমেটরি নির্মাণ কাজে নানা ধরনের ত্রুটি দেখতে পান। পরে ওই প্রতিনিধি দল সরেজমিন পরির্দশনের একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন জমা দেন একনেকে। তাতে অভিযোগ আনা হয়, উচ্চ দর দেখিয়ে নিন্মমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করে বাস্তবায়ন করা হয়েছে পুরো প্রকল্পটি।

উল্লেখিত অভিযোগের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সুভাষ চন্দ্র সরকারের নেতৃত্বে ৮ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে একনেক। কমিটির অন্য সদস্যারা হলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শফিউল বারী, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের প্রতিনিধি মো. আহসান, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের পরিচালক ডা. মো. আখতারুজ্জামান, পরিকল্পনা কমিশনের অর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের একজন প্রতিনিধি, গণপূর্ত অধিদফতরের একজন, স্থাপত্য অধিদফতরের প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুবিভাগের উপপ্রধান ডা. মোহাম্মদ খাইরুল হাসান।

দুর্নীতি তদন্তে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গঠিত কমিটি সরেজমিন পরির্দশনকারী দলের অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায়। ২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী বরাবর তদন্ত প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়। এতে তারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ারও সুপারিশ করেন। ২০০৩ সালের ১৬ আগষ্ট একনেকে চূড়ান্ত প্রকল্পটি ২০০৬ সালের ৬ আগষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটির বরাবারে অনুমোদন দেয়া হয়।

ওই প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স শাহ ইসলাম কনস্ট্রাকশনের অধীনে আরো ৪টি প্রতিষ্ঠানকে সহযোগী নির্মাতা হিসেবে চুক্তিপত্রে দেখানো হয়। এদের মধ্যে মেসার্স রফিক ট্রেডার্সকে চিকিৎসকদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ, মেসার্স জ্যাকো কনস্ট্রাকশন ও মেসার্স ইন্সটেন্সের নামে দেয়া হয় স্টাফদের আবাসিক ভবন, মেসার্স খলিলুর রহমান নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান বরাবারে বরাদ্দ দেয়া হয় নার্সদের জন্য ডরমেটরি নির্মাণের কাজ।

এছাড়া ঠিকাদার কায়কোবাদের লাইসেন্স ব্যবহার করে আশরাফুল আলম যৌথভাবে চক্ষু হাসপাতাল নির্মাণের কাজ করেন। যা সম্পূর্ণরূপে সরকারি চাকরি বিধিমালা পরিপন্থী। ফলে নির্মাণ কাজটি হয় নিন্মমানের আর অধিকাংশ অর্থ ভাগাভাগি করে নেন ঠিকাদার কায়কোবাদ ও আশরাফুল আলম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত অধিদফতরের একটি সূত্র জানায়, আশরাফুল আলম বিএনপির সমর্থক, একনিষ্ঠকর্মী ও অর্থদাতা। তার বাড়ি বগুড়ায়। অথচ তিনি ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে চলেন। বর্তমানে নিজ কর্মস্থল রংপুরে অবস্থান না করে ঢাকায় অবস্থান করছেন তিনি। পাশাপাশি ঢাকায় বদলি হয়ে আসার জন্য জোর তদবিরও চালাচ্ছেন প্রকৌশলী আশরাফুল।

রাষ্ট্রীয় পদবি ব্যবহার করে কৌশলে ব্যক্তিগত ব্যবসার মাধ্যমে মানহীন সরঞ্জাম সরবরাহ করে থাকেন আশরাফুল আলম। গণপূর্তের শেরে বাংলা নগর ডিভিশন-১ এ নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ২০০৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৯ এর ৬ আগস্ট পর্যন্ত (সংসদ ভবন) ৩ লাখ টাকা করে ঘুষ নিয়ে ৩শ জনকে ভাউচারভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগ দেন। পরে ঘটনাটি জানাজানি হলে, মোটা উৎকোচের বিনিময়ে ধামাচাপা দেন আশরাফুল। এছাড়া তিনি ভুয়া বিল, ভাউচারে বিভিন্ন ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহারের মাধ্যমে কাজ না করেই টাকা উত্তোলনপূর্বক আত্মসাৎ করেন।

সূত্র আরো জানায়, রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেলে ওয়াহিদুল ইকবালসহ নির্দিষ্ট বেশ কয়েকজন ঠিকাদার রয়েছেন। যাদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব ব্যবসা করেন আশরাফুল আলম। সার্কেলে থাকার সময় আশরাফুল সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীদের কাছ থেকে প্রতিমাসে আপ্যায়ন বাবদ ৮০ হাজার টাকা করে আদায় করতেন। এছাড়া প্রতিটি প্রকল্পে ১৫ শতাংশ কমিশন নিতেন তিনি। তত্ত্বাবধায়ক প্রকোশলী থেকে পদোন্নতি পাওয়ার কিছুদিন আগে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে বিভিন্ন ঠিকাদারকে প্রায় ১শ’ কোটি টাকার কাজ দিয়ে কমিশন তুলে নেন তিনি। ফান্ডে অর্থ না থাকায় সেই ঠিকাদাররা এখন পড়েছেন চরম বিপাকে।

জানা যায়, আশরাফুল আলম প্রেষণে গণপূর্ত নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে কিছুদিনের জন্য জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষে চাকরি করেছেন। যাতে তার আগের সবকিছু ধামাচাপা পড়ে। পরবর্তীতে পদোন্নতি নিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে গণপূর্তে যোগ দেন।

অবৈধ উপার্জনের টাকায় আশরাফুল আলম নিজ জেলায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (বিপণি বিতান) গড়ে তুলেছেন। স্ত্রীর নামে ঢাকায় প্রায় দেড় কোটি টাকায় আলিশান ফ্ল্যাটও কিনেছেন। গুলশানে আরো দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। যার মূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। স্ত্রী ও সন্তানদের নামে নিজ জেলায় সুবিশাল বাড়ি ও বিপুল পরিমান সম্পত্তি রয়েছে। স্ত্রীর নামে ব্যাংকে আছে বড় অংকের এফডিআর। গড়ে তুলেছেন মাসিক সঞ্চয় ও একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সন্তানদের নামেও রয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। আছে কোটি কোটি টাকার আমানত। পরিবারের সদস্যদের দিয়ে বিভিন্ন আর্থিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা করছেন তিনি।

এছাড়া শ্বশুর-শাশুড়ি ও কাছের আত্মীয়দের নামে রয়েছে কৃষিজমি ও ব্যবসা। মালয়েশিয়ায় হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল পরিমানের অর্থ পাচার করে সেকেন্ড হোম করেছেন সরকারি এই প্রকৌশলী। এসবের পাশাপাশি আশরাফুল আলমের নামে-বেনামে রয়েছে আরো প্রায় ১শ’ কোটি টাকার সম্পদ। প্রকৌশলী নেতাদের সখ্যতার প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতিবাজ আশরাফুল আলম কর্মস্থলে বিভিন্ন অনৈতিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ডে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা আদায় করেন।

এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে মোহাম্মদ আশরাফুল আলমকে ফোন দিলে তিনি বলেন, ফোনে কথা বলা যাবে না। সামনাসামনি আসেন, কথা বলি। আর তদন্ত করে কেউ কিছু পায়নি। সবাই আমার পক্ষে রিপোর্ট দিয়েছেন।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এ প্রতিবেদককে বলেন, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল নির্মাণে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত রিপোর্ট দেখে অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Ads
Ads