গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী রফিকের বদলি বাণিজ্যে উদ্বেগ আর আতঙ্ক!

  • ২৩-Sep-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: উৎপল দাস ::

সরকারের শেষ সময়ে গণহারে বদলি শুরু হয়েছে সরকারি ভবন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদফতরে। প্রতি ঘন্টায় বদলির তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হচ্ছেন একজন করে কর্মকর্তা। গত দেড়মাসে (আগস্ট থেকে মধ্য সেপ্টেম্বর) ৩০ কর্মদিবসে বদলি হয়েছেন ১৫৩ জন কর্মকর্তা। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৫ জনেরও বেশী কর্মকর্তা বদলীর তালিকায় উঠে এসেছেন। এদের মধ্যে উপ-সহকারী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে সহকারী প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীও রয়েছেন। গনপূর্ত অধিদফতরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অফিস আদেশ ঘেটে এসব তথ্য মিলেছে। 

অভিযোগ উঠেছে, এসব বদলীর অধিকাংশই বাণিজ্যিক কারণে করা হয়েছে। গৃহায়ন ও গনপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন এই প্রতিষ্ঠানটির প্রধানের মেয়াদ সরকারের মেয়াদের সাথে সাথেই (ডিসেম্বর) শেষ হচ্ছে। যে কারণে প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বাণিজ্য করে নিজের পকেট পুরো করে নিচ্ছেন। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে থাকা কর্মকর্তাদের ঢাকায় বড় বড় প্রকল্পের দায়িত্বে নিয়ে আসছেন। আবার অনেকের পোস্টিং দিচ্ছেন তাদের পছন্দ অনুযায়ী মন্ত্রীপাড়া, সংসদ, গনভবন, বঙ্গভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। আর এসব পদ ফাঁকা করতে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কর্মরতদের অন্যায়ভাবে সরিয়ে দিচ্ছেন অন্যত্র। এছাড়া টেন্ডার বাণিজ্য, ভূয়া প্রকল্প বানিয়ে টাকা লোট, এবং বিএনপি-জামায়াত কর্মকর্তাদেও পুর্ণবাসনের মাধ্যমে কামিয়েছেন কাড়ি কাড়ি টাকা। শুধুমাত্র টেন্ডারে অনিয়ম ও জালিয়াতি করেই সরকারের কয়েক শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। দেশ বিদেশে কিনেছেন বিলাসবহুল বাড়ি।
 
অবৈধ এই টাকায় তিনি  ফের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধান্দাও করছেন বলে জানা গেছে। আর এসব কাজে বিশ্বস্ত পাঁচ কর্মকর্তা তাকে সহযোগিতা করছেন, কাজ করছেন তার ক্যাশিয়ার হিসেবেও।  এরা হলেন- ঢাকা সার্কেল-১ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সোহরাওয়ার্দী, সিটি ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত উল্লাহ, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক চৌধুরী, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্নেন্দু শেখর মন্ডল এবং শেরেবাংলা নগর-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ফজলুল হক মধু। 
     
প্রাপ্ত তথ্যমতে, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এপর্যন্ত দেড় বছরে বিভিন্ন পদের দেড় হাজারেরও অধিক প্রকৌশলীকে বদলী করা হয়েছে। বাংলাদেশের কোনো সরকারি অফিসে এই সময়ে এত বদলির ঘটনা ঘটেনি। একারণে গণপূর্তে কর্মরতরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। কয়েকজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী জানান, সকাল হলে দুরু দুরু বুকে অফিসে যাই। আবার একই টেনশন নিয়ে প্রতিদিন অফিস শেষ করি। কখন বদলির চিঠিটা হাতে ধরিয়ে দেয়া হবে জানি না। বদলি মানেই ব্যাগ-লাগেজ গোছানো। সন্তানদের স্কুল-কলেজ নিয়েও চলে টানাপড়েন। স্ত্রী ঢাকায় চাকরিজীবী হলে সমস্যা আরো প্রকট। সব মিলিয়ে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। 

তারা জানান, প্রতিটি বদলির জন্য রয়েছে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন। এটাও আবার কয়েক ভাগে বিভক্ত। ঢাকায় যেসব এলাকায় নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ বেশি সেসব এলাকায় বদলির জন্য নেয়া হয় ১৫-২০ লাখ টাকা। মাঝারি কাজের জায়গার জন্য ১০-১৫ লাখ টাকা। আর ঢাকায় থাকার জন্য  নেয়া হয় ন্যূনতম ৫ লাখ টাকা। রমনা, ধানমন্ডি, শেরেবাংলা নগর ও গুলশান এলাকায় বদলির জন্য সর্বাধিক টাকা নেয়া হয় বলে জানান তারা। বাণিজ্য করতেই ব্যাপক হারে বদলি করা হচ্ছে জানিয়ে প্রকৌশলীরা বলেন, একজনকে শাস্তিস্বরূপ ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। আর্থিক লেনদেনে তুষ্ট হলে তাকে আবার নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। আবার কেউ টাকা দিতে রাজি না হলে তাকে বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পাঠানো হয়। মানবিক দিক বিবেচনার বিষয়টি এখানে একেবারে উপেক্ষিত থাকে। 

এছাড়া গণপূর্ত অধিদফতর বাস্তবায়নাধীন বড় প্রকল্পগুলোর প্রতিটিতেই অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শত কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ১ টাকা থেকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত কাজ ইজিবি টেন্ডারের মাধ্যমে দেয়ার নির্দেশনা থাকলেও বড় কাজের প্রায় সবগুলোই ম্যানোয়াল ওটিএম’র মাধ্যমে নিজস্ব ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। সিভিলের পাশাপাশি ইলেকট্রিক্যাল (ইএম) কাজে বিশেষ করে লিফট ক্রয় কাজে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাত্রা সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন ডিভিশনের আওতাধীন থাকা প্রকল্পে লিফট ক্রয়ের টেন্ডার দেয়ার এখতিয়ার ওই ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীর থাকলেও প্রধান প্রকৌশলী তাদের এখতিয়ার রুদ্ধ করে দিয়ে সব চাহিদা একসাথে করে পূর্তভবন থেকে তিনি নিজেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। মতিঝিল, উত্তরা, আজিমপুরসহ বিভিন্ন ডিভিশনের প্রায় তিনশ’ লিফট ক্রয়ের কাজ নিজস্ব ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে এভাবে দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এদিকে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত কাজও ইজিবি ছাড়াই নিজম্ব ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে দিয়ে দেয়া হয়েছে নির্ধারিত কমিশনের মাধ্যমে। 

পূর্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও ঠিকাদার জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম জামায়াতের সাবেক আমীর যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমের ভাগ্নে হিসেবে সমধিক পরিচিত। ব্রাম্মনবাড়িয়ার নবীনগরে তার গ্রামের বাড়িটি এক নামে রাজাকার বাড়ি হিসেবে সবাই চেনেন। জোট সরকারের আমলে নিজামীর বাসায় অবাধ যাতায়াত ছিল তার। যুদ্ধাপারাধী মামার তদবিরেই তিনি তৎকালীন গনপূর্ত মন্ত্রী মির্জা আব্বাসের সানিধ্য লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেসময় বিএনপি ও জামায়াতের তার ঘনিষ্টতার কারণে পদোন্নতিপ্রাপ্তও হন তিনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় পর সুবিধা নিতে ভোল পাল্টে বনে যান আওয়ামী লীগার। কিন্তু অন্তরে ধারন করা স্বাধীনতা বিরোধীতার বীজ তাকে স্ববিরোধী করে তুলে। নিজ দফতরেই আওয়ামী লীগের সমর্থক প্রকৌশলীদের সংগঠণ বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা পকৌশলী পরিষদের নেতাদের লাঞ্চিত করেন তার লোকজন দিয়ে।

দফতরে টানানো বঙ্গবন্ধুর ছবি সম্বলিত ফেস্টুন ব্যানার ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দিয়ে অসম্মান করেন জাতির পিতাকে। তার এসব অপকর্ম এবং জামায়াত প্রীতির অনেক ঘটণা বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতেও এসেছে। কিন্তু কিছুতেই হয়নি। টাকার জোড়ে সব অপকর্ম ধামাচাপা দেয়ার প্রয়াস চালিয়েছেন তিনি। 

এবিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামসহ অভিযুক্ত পাঁচ কর্মকর্তার সাথে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের স্বাক্ষাত পাওয়া যায়নি।

Ads
Ads