শীর্ষ ১০০ খেলাপির তালিকায় ইউনুছ বাদল

  • ১৪-Sep-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: নিজস্ব প্রতিবেদক ::

আবারো আলোচনার তুঙ্গে উঠেছেন জনতা ব্যাংক লুটের নায়ক ইউনুছ বাদল। দেশের শীর্ষ ১০০ ঋণ খেলাপির তালিকায় ওঠে এসেছে এক সময়ের গাড়ি চোর চক্রের এ মূল হোতার নাম। গত বুধবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী যে শীর্ষ ১০০ ঋণ খেলাপির তালিকা প্রকাশ করেছেন, তার ৭৫ নম্বরে স্থান পেয়েছে গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেড। ঋণ খেলাপি এ প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ইউনুছ বাদল। জনতা ব্যাংক লুটের শুরুটা এ গ্যালাক্সি সোয়েটারের মাধ্যমেই উন্মুক্ত হয়েছিল। জালিয়াতির মাধ্যমে ২০০৮ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়। এননটেক্স নামে অখ্যাত একটি শিল্প গ্রুপের নামে বিশাল অংশের এ ঋণ বের করে নেন গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউনুছ বাদল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের আর্থিক খাতে ন্যূনতম সুশাসন থাকলেও এতদিনে এননটেক্স গ্রুপের কর্ণধার ইউনুছ বাদলের বাসস্থান হতো কারাগার। যদিও দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েও নবাবের হালে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ইউনুছ বাদল। প্রকাশ্যে দেন-দরবার করছেন অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইউনুছ বাদল পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে প্রথম ঋণ পান গ্যালাক্সি সোয়েটার্স অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িংয়ের নামে। ২০১০ সালের ২৫ আগস্ট ৮০ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। এভাবে ঋণ বৃদ্ধি করে ৪৭৫ কোটি  টাকায় উন্নীত করায় পরের বছরই এ প্রতিষ্ঠানের দেনা একক গ্রাহকের সীমা অতিক্রম করে। তবে ঋণ কার্যক্রম বন্ধ রাখেনি অধ্যাপক বারকাতের নেতৃত্বাধীন তখনকার পর্ষদ। একক গ্রাহকের ঋণসীমা অতিক্রম করলেও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও ঋণের জন্য অনুমতি নেওয়া হয়নি। তার মালিকানাধীন আলাদা প্রতিষ্ঠানের নামে কৌশলে বিপুল অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে। ঋণখেলাপি না করার অভিনব পন্থা হিসেবে এমন কৌশল নেওয়া হয়। ঋণের টাকায় তিনি আগের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন। যে কারণে ওই সময়ে খেলাপি হননি। 

এননটেক্স গ্রুপকে উদার হস্তে ঋণ দেয়ার এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে পরবর্তী বছরগুলোতে। ২০১১ সালে ইউনুছ বাদলের মালিকানাধীন সিমি নিট টেক্সকে ৯৫ কোটি, সুপ্রভ কম্পোজিটকে ৩৮০ কোটি এবং এফকে নিটের নামে ৯৬ কোটি টাকা দেয় পর্ষদ। পরের বছর সিমরান কম্পোজিটকে ৪৫০ কোটি, জারা নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি, গ্যাট নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি এবং জেওয়াইবি নিট টেক্সকে ৯৩ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। ২০১২ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এমএইচ গোল্ডেন জুটকে ১৫১ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। ২০১৩ সালে লামিসা স্পিনিংকে ১৩৪ কোটি, জ্যাকার্ড নিট টেক্সকে ৩২০ কোটি, স্ট্রাইগার কম্পোজিটকে ৯০ কোটি, আলভী নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি, এম নূর সোয়েটার্সকে ৬০ কোটি এবং সুপ্রভ স্পিনিংকে আরও ৪৩০ কোটি টাকা দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে আবার জারা লেবেল অ্যান্ড প্যাকেজিংকে ৫৩ কোটি, সুপ্রভ মিলাঞ্জ স্পিনিংকে ১৫৫ কোটি, শাইনিং নিট টেক্সকে ৮৮ কোটি ও জারা ডেনিমকে দেওয়া হয় ৫৫ কোটি টাকা। আর ২০১৫ সালে সুপ্রভ রোটর স্পিনিংকে দেওয়া হয় ৩০০ কোটি টাকা।

জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংককে একাই ধসিয়ে দিয়েছে এক সময়ের গাড়ি চোর চক্রের এ হোতা। ঋণের নামে জনগণের মালিকানাধীন ব্যাংকটি থেকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছেন তিনি। নেওয়া অর্থের সুদ পরিশোধ না করতে পারায় খেলাপির খাতায় যুক্ত হয়েছে গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেড। অথচ বিশাল এ ঋণের পাহাড়ের হদিস না নিয়েই, নতুন করে আবারো তার মালিকানাধীন এননটেক্স গ্রুপকে টাকা দেয়ার তোড়জোর শুরু হয়েছে। 
বিতর্কিত শিল্পগ্রুপটির কোম্পানিগুলো বাঁচানের নামে জনতা ব্যাংক থেকে আরো হাজার কোটি টাকা ঋণ চায়

ইউনুছ বাদল। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি থেকে অর্থ বের করে নিতে ঘুষ, চাপ ও তদবিরের আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যেই ঋণের জন্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দরবারে ধর্ণাও দিয়েছেন তিনি। গত ২০ আগস্ট সচিবালয়ের অর্থমন্ত্রীর দরবারে এ নিয়ে বৈঠকও হয়েছে। বৈঠকে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান, এমডি, এননটেক্সের মালিক ইউনুছ বাদলসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নিয়েছেন। সে বৈঠকে ইউনুছ বাদলকে আরো টাকা দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

দেশের ব্যাংকিং খাতকে নাড়িয়ে দেয়া কেলেঙ্কারির জন্মদাতা ইউনুছ বাদলকে আরো টাকা দেয়ার সংবাদে বিস্মিত হয়েছে দেশের মানুষ। এক দশক আগেও গাড়ি চোর চক্রের হোতা হিসেবে গ্রেফতার হওয়া ইউনুছ বাদলের প্রতি অর্থমন্ত্রীর বাড়তি দরদে দেশের সাধারণ জনতা হতবাক হয়েছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ মুহুর্তে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ইউনুছ বাদলের বৈঠকের খবরে ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরাও বিস্মিত হয়েছেন। তারা বলছেন, এননটেক্স কেলেঙ্কারির জন্মদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে, আবারো অর্থ ঢালার সুপারিশের ঘটনায় আওয়ামীলীগের জনপ্রিয়তা কমবে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামীলীগের দায়িত্বশীল একজন নেতা বলেন, জনতা ব্যাংকের মালিক সরকার। দেশের সাধারণ মানুষের অর্থে ব্যাংকটি পরিচালিত হয়। সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর সরকারের দায়িত্ব ছিল ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া। যদিও দোষীদের বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ইউনুছ বাদলের বৈঠকের সংবাদ জনগণের কাছে নেতিবাচক বার্তা দেবে। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি উৎসাহিত হবে। অন্যরাও ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নিতে উদ্বুদ্ধ হবে।
বাছবিচার না করেই ঋণের নামে এননটেক্সকে হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়ে মহাবিপদে পড়েছে জনতা ব্যাংক। ঋণ কেলেঙ্কারির বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার পর থেকে ব্যাংকটির দৈনন্দিন অনেক কাজই থমকে গেছে। এননটেক্সও এখন ঋণের সুদ পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে বন্ধ হওয়ার পথে এগুচ্ছে গ্রুপটির সব কারখানা। এ অবস্থায় চলতি মূলধনের নামে জনতা ব্যাংক থেকে আবারো হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইউনুছ বাদল। এ নিয়ে গত ২০ আগস্ট অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) ডাটাবেজে রক্ষিত তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে গত বুধবার শীর্ষ ১০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সংসদ টেবিলে এ তালিকা তুলে ধরেন তিনি। তালিকাটি করা হয়েছে ২০১৮ সালের জুনভিত্তিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে। তবে শীর্ষ খেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কী পরিমাণ ঋণ রয়েছে, সে তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের সবক’টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের তালিকাও সংসদে তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।

এই বিষয়ে ইউনুছ বাদলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যাইনি।

Ads
Ads