ফের শ্রমিক অসন্তোষ: অসঙ্গতি দ্রুত নিরসনই প্রত্যাশিত

  • ১০-জানুয়ারী-২০১৯ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

নতুন সরকার গঠিত হওয়ার প্রাক্কাল থেকেই শুরু হয়েছে দেশের গার্মেন্ট শিল্প নিয়ে অস্থিরতা। গত কয়েক বছর ধরেই গার্মেন্ট খাতে বেতন, মজুরি নিয়ে যে অচলাবস্থা শুরু হয় তা এখনো প্রশমিত হয়নি। নতুন মজুরি কাঠামো পর্যালোচনায় কমিটি গঠনের পরও সড়কে বিক্ষোভ করেছে পোশাক শ্রমিকরা।  গতকাল বৃহস্পতিবার পঞ্চম দিনের মতো ঢাকার মিরপুর, উত্তরা, সাভার, ধামরাই, গাজীপুর, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ও ময়মনসিংহের ভালুকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ-অবরোধের খবর পাওয়া গেছে। ফলে সৃষ্টি হয় যানজট, দুর্ভোগে পড়েন বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীরা। ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় গার্মেন্ট শ্রমিকদের বিক্ষোভের সময় গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত। অতীতেও দেখা গেছে, যে কোনো আন্দোলন বা বিক্ষোভের সময় সড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহন ও নিরীহ যাত্রীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়, যা মোটেই কাম্য নয়। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এহেন পরিস্থিতি ধৈর্য্যরে সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। অতি উৎসাহী হয়ে এমন ব্যবস্থা নেওয়া ঠিক হবে না, যা নতুন সরকারের জন্য বিব্রতকর হয়। গত মঙ্গলবার বিক্ষোভ চলাকালে একজন শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে, যা অনাকাক্সিক্ষত।  

আমরা মনে করি, ন্যায্য দাবি-দাওয়া আদায়ের মাধ্যম হিসেবে আলাপ-আলোচনাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সরকার অবশ্য শ্রমিক বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে প্রায় দেড় মাস আগে ঘোষিত নতুন মজুরি কাঠামো পর্যালোচনাসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নবনিযুক্ত শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সদ্য ঘোষিত বেতন কাঠামোয় অসঙ্গতি থাকলেও তা সমাধানের সুযোগ রয়েছে। এখানে যেহেতু প্রতিমন্ত্রী স্বীকার করে নিয়েছেন, ঘোষিত বেতন কাঠামোয় ‘অসঙ্গতি’ রয়েছে কাজেই আমরা আশা করবো খুব শিগ্গিরই এই অসঙ্গতি দূর করা হবে। যাতে করে শ্রমিকদের ক্ষোভ প্রশমিত হতে পারে। তবে শ্রমিকদেরও এ জন্য ধৈর্য্য ধরতে হবে। অযথা অসহিষ্ণু হলে চলবে না; অবরোধ-ভাঙচুর এবং জ্বালাও-পোড়াওসহ অন্যান্য ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড দাবি আদায়ের মাধ্যম হতে পারে না। এক্ষেত্রে তাদের এটাও মনে রাখা উচিত যে, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল এই জ্বালাও-পোড়াও, অবরোধ-ভাংচুর প্রভৃতি শেষে আজ তারা বিলুপ্ত প্রায়। ভবিষ্যতে তারা আর কখনো দাঁড়াতে পারবে এমন কোনোই সম্ভাবনা নেই। কাজেই এ ক্ষেত্রে শ্রমিকরাও যেন দেশের বৃহত্তম দলটির মতো নিজেদেও ‘কবর’ নিজেরাই না খোঁড়ে। নিজেদের সমাধি যেন নিজেরাই না দিয়ে বসে। যেমনটি এক সময়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম দলটি করলো। তাহলে কিন্তু তাদের নিজেদের জন্য আত্মঘাতি হবে, তেমনি দেশের গার্মেন্ট শিল্পের ভবিষ্যতের জন্যও আত্মঘাতি হবে।

সর্বোপরি দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্যই আত্মঘাতি হবে। কাজেই তাদের ধীরে-সুস্থে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়েই নিজেদের দাবি আদায় করে নিতে হবে। বস্তুত দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অংশীজন হিসেবে শ্রমিকরা কখনই ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হতে পারে না। মনে রাখতে হবে, মালিক ও শ্রমিক একই বাইসাইকেলের দুটো চাকার মতো। একটি না থাকলে আরেকটি চলবে না। কাজেই উভয়ের স্বার্থরক্ষায় উভয়পক্ষকেই আন্তরিক হতে হবে।

মালিকপক্ষকে যেমন মালিকগিরি করা চলবে না, তেমনি শ্রমিকপক্ষকেও মালিকপক্ষের সীমাবদ্ধতা বুঝতে হবে। গার্মেন্ট শিল্পের বিকাশ ও সুরক্ষায় মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণের যৌক্তিকতা নিয়ে দ্বিমত পোষণের অবকাশ নেই। দেশের মোট রফতানি আয়ের অন্যূন ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প খাতে ৪০ লাখের বেশি কর্মী কাজ করেন। উন্নত বিশ্বজুড়ে এ শিল্পের সুনাম অনস্বীকার্য। 

দুঃখজনক হলেও সত্য, এ খাতে কর্মরত শ্রমিকরা অনেক সময়ই কর্তৃপক্ষের মালিকগিরি বা খামখেয়ালিপনার শিকার হয়ে দুঃসহ অবস্থার মধ্যে নিপতিত হয়। দেখা গেছে, কোনো কোনো কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের প্রাপ্য বেতন ও বোনাস দিতে গড়িমসি করে। এমনটি কাম্য নয়। তাদের এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, তারাও মানুষ। তারাও মানুষের মতো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে চায়। সেজন্য তাদের ন্যূনতম মজুরি কতো হওয়া উচিত তা আশা করি মালিকদেরও না বোঝার কথা নয়। সেটা বুঝেই যেন তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে কর্তৃপক্ষ মানবিক ও উদারহস্ত হন, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

Ads
Ads