নির্বাচনী ইশতেহার: কথায় ও কাজে মিলই প্রত্যাশিত

  • ২৩-Dec-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

আর মাত্র পাঁচদিন বাকি জাতীয় সংসদ নিবার্চন অনুষ্ঠানের। এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নিবার্চনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ। প্রায় এক দশক পর এই নির্বাচনে দেশের শীর্ষ দুই ভোটারপ্রিয় প্রতীক নৌকা ও ধানের শীষের জয়-পরাজয়ের টানাপড়েন চলছে এখন। এরই মধ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে এই প্রধান দুই দলসহ বিভিন্ন দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। নির্বাচনী ইশতেহার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা, ইশতেহারে রাজনৈতিক দলের আদর্শ ও লক্ষ্যের প্রতিফলন ঘটে। যদিও আজ পর্যন্ত কোনো ক্ষমতাসীন দলই তাদের ইশতেহারে প্রতিশ্রুত সকল ঘোষণা নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে বাস্তবায়িত করেনি বা সমর্থ হয়নি। 

ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন দলটির সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে। ক্ষমা চাওয়ার এ ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসেই বিরল। নিঃসন্দেহে এটা অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। ইশতেহারে বলা হয়েছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হলে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ‘২১টি বিশেষ অঙ্গীকার’ বাস্তবায়ন করবে আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে তরুণ সমাজকে উৎপাদনমুখী করে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দেশের প্রতিটি গ্রামকে শহরে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। পাঁচ বছরে ১ কোটি ২৮ লাখ বেকারের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি উঠে এসেছে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি, জঙ্গিবাদ ও মাদক নির্মূল, গণতন্ত্র, আইনের শাসন সুদৃঢ় করা ও মানবাধিকার সুরক্ষা, নারীর ক্ষমতা, লিঙ্গসমতা ও শিশুকল্যাণ, পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা, মেগা প্রজেক্টসমূহের দ্রুত ও মানসম্মত বাস্তবায়ন. গণতন্ত্র আইনের শাসন সুদৃঢ় করা ও মানবাধিকার রক্ষাসহ বিভিন্ন ধরনের অঙ্গীকার উঠে এসেছে।

অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকায় দলটির ইশতেহার ঘোষণা করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ইশতেহারে উঠে এসেছে যে, ক্ষমতায় গেলে গণতন্ত্রের অনুশীলন, রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা সুদৃঢ় করা ছাড়াও রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকার বিধান, গণভোট পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তন, সংসদের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা, বিরোধীদল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ, ন্যায়পাল নিয়োগ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট বাতিল বিশেষ ক্ষমতা আইন ’৭৪ বাতিল, বেকার ভাতা প্রদানসহ ১৯ দফা প্রতিশ্রুতি এসেছে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ইশতেহার প্রকাশ করে সোমবার। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ইশতেহারের বিস্তারিত পাঠ করেন। ৩৫ দফা ইশতেহার ঘোষণা করা হয়। ইশতেহারে ১৪টি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ও পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকার প্রতিশ্রুতি ছাড়াও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কার ও বিকেন্দ্রীকরণ, মৌলিক অধিকার রক্ষায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বন্ধ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল, পিএসসি এবং জেএসসি পরীক্ষা বাতিল, চাকরিতে প্রবেশের সময়সীমা না রাখা, নারীর নিরাপত্তা এবং ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। প্রতিহিংসার রাজনীতি দূরীকরণ, নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন ও সুশাসনসহ ১৪টি বিষয়ে আমূল পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। 

এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য, নির্বাচনী ইশতেহারের অর্থই হচ্ছে দেশের জনগণের কাছে অঙ্গীকার করা। সঙ্গত কারণেই বলা দরকার, যে দলই সরকার গঠন করুক না কেন অঙ্গীকারের বিষয়গুলো আমলে নিয়ে যথাযথভাবে তার বাস্তবায়নে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে, আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে কোনো প্রকার সহিসংতা, সন্ত্রাস কিংবা অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি যেন কেউ সৃষ্টি করতে না পারে তা নির্বাচন কমিশনকেই নিশ্চিত করতে হবে। এরই মধ্যে সিইসি বলেছেন, ‘প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ থাকে তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে।’ কিন্তু প্রশাসনকে এই ‘নিরপেক্ষ’ রাখার দায় কার? এই দায় কিন্তু সিইসিও এড়াতে পারেন না। এই যেমন ইসির একজন সদস্য বললেন, ‘সন্ত্রাস ও নির্বাচন একসঙ্গে চলতে পারে না’। এ উক্তির তাৎপর্য কী! আবার আরেক সদস্য বললেন, ‘ভোটে উত্তাপ না থাকলে ভালো লাগে না’। এই ‘উত্তাপ’ কীসের, আর এর সীমাই বা কতটুকু, এই বক্তব্যে কি নির্দিষ্ট করা হয়েছে? তার জবাবেই কি ইসির আরেক সদস্য ওই বক্তব্যের পরদিনই বললেন, ‘সন্ত্রাস ও নির্বাচন একসঙ্গে চলতে পারে না’?

মনে রাখা দরকার, ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সমান সুযোগ নিশ্চিত না হওয়া, কারচুপি, কেন্দ্র দখল থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম অভিযোগ এসেছে, সেসব অভিযোগ থেকে কিন্তু কোনো দলই মুক্ত নয়। এই দাগ সব দলের মধ্যেই কমবেশি লেগে আছে। সামান্য একটি আসন ‘মাগুরা’কে কেন্দ্র করে ইতিপূর্বে আমরা যা দেখেছি তা কখনোই ভোলার নয় বলে আমরা মনে করি। এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি সন্দেহাতীতভাবেই সুষ্ঠু নিবার্চনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক। একটি রাজনৈতিক দল বা জোট জনগণের ম্যান্ডেট পেয়ে যখন সরকার গঠন করে তখন তারা দেশ ও জনগণের জন্য কী কী কাজ করবে- ইশতেহারে সে বিষয়ের উল্লেখ থাকলেও আমাদের দেশে এর বাস্তবায়ন খুব বেশি ঘটে না। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিটি রাজনৈতিক দলই প্রত্যেক জাতীয় নির্বাচনের আগে দুর্নীতি দমনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার করে। যদিও দলগুলো মনোয়ন বাণিজ্য করে ইতোমধ্যেই দুর্নীতির প্রথম পাঠই নিয়ে রেখেছে। ফলে সেরকম দৃষ্টান্তস্বরূপই দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা আজও কমেনি। বরং দুর্নীতির অংক বেড়েছে। আগে দুর্নীতির অর্থ যেখানে কয়েকজন পাচার করার নজির দেখা গেছে এখন তা শত শত পার হয়ে গেছে। আগে দুর্নীতির টাকা দেশের ব্যাংকগুলোতেই থাকতো এখন তা সুইস ব্যাংকে গিয়ে ঠাঁই পাচ্ছে। আগে দুর্নীতির টাকায় দেশের বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্ট কেনা হতো এখন তা মালয়েশিয়া, দুবাই প্রভৃতি দেশে কেনা হচ্ছে। 

আমাদের প্রকৃত বক্তব্য হচ্ছে, নির্বাচনী ইশতেহারে রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দর্শনের যে প্রতিফলন ঘটার কথা তা বাস্তবক্ষেত্রে প্রায়শই অনুপস্থিত থাকছে। এক্ষেত্রে যেন নির্বাচনী ইশতেহার ভোটে জয়লাভ করাই মুখ্য হয় ওঠে। অর্থাৎ বাস্তবক্ষেত্রে এ ইশতেহার নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার লক্ষ্যের চেয়ে বেশি কিছু দেখা যায় না। তাই ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ইশতেহারের অঙ্গীকার প্রতিপালনের বিষয়টি খুব বেশি গুরুত্ব পায় না।

আমরা মনে করি, এই সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসা জরুরি। কথায় ও কাজ যদি এক না হয় তখন সেটাকে অনিবার্যভাবেই ডাবল-স্টান্ডার্ড বা ‘মোনাফেকি’ বলতে হয়। আমাদের নেতৃবৃন্দ যেন ভুলে না যান, জনপ্রতিনিধি হিসেবে তারা জনগণকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসেন, সেসবের প্রতিপালন করা তাদের দায়িত্ব। তা না হলে সেটা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করার শামিল। যারা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন, জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান জানানো তাদের নৈতিক দায়িত্বও বটে। তাই আমরা আশা করব, ক্ষমতায় যারাই আসুন, তারা তাদের ইশতেহারে বর্ণিত অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে আন্তরিক হবেন। একমাত্র তাতেই নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন ও ঘোষণার বিষয়টি অর্থবহ হয়ে উঠবে। তা না হলে এটি পরিণত হবে নিছক প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতায়। নিশ্চয় এটা জনগণের কাছে মোটেই প্রত্যাশিত নয়।

সত্য বলতে আমরা যা বুঝি, যারা প্রকৃত অর্থেই গণতন্ত্রে অবিচল বিশ্বাসী, যাবতীয় প্রতারণামুক্ত, তারা কখনোই প্রতিশ্রুত ইশতেহারের বরখেলাপ করতে পারে না। সর্বোপরি আমরা বলতে চাই, এবারের নির্বাচন নানা কারণেই তাৎপর্যবহ। ফলে কোনোভাবেই যেন নির্বাচন বিতর্কিত বা প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সেই লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ সাপেক্ষে করণীয় নির্ধারণ এবং তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নে যথাযথ পদক্ষেপ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এমন প্রত্যাশায় আমরা চাই, নিবার্চন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হোক। সেই সঙ্গে যারা মেজরিটি হয়ে সরকার গঠনে ম্যান্ডেট পাবে তারা যেন অঙ্গীকারবদ্ধ ইশতেহার বাস্তবায়নে সর্বান্তকরণে সচেষ্ট থাকে এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।

Ads
Ads