বিজয়ের অঙ্গীকার: এবার রুখতে হবে স্বাধীনতা বিরোধীদের

  • ১৬-Dec-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

গতকাল ১৬ ডিসেম্বর শ্রদ্ধাভরে মহান বিজয় দিবস উৎযাপন করেছে গোটা জাতি। এ আনন্দঘন দিনটির জন্য শোষণ-বঞ্চনার যাঁতাকলে পিষ্ট বাঙালি জাতিকে যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছে। বিজয় দিবসে আমরা স্মরণ করেছি সেই সব শহীদকে, যারা নিজেদের প্রাণের বিনিময়ে আমাদের এই লাল-সবুজের পতাকা দিয়েছেন। ৩০ লাখ শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, যারা জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। হানাদার বাহিনীর অত্যাচার-নিপীড়ন সইতে না পেরে কোটি কোটি মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পরবাসী হতে হয়েছিল, বনে-জঙ্গলে রাত কাটিয়েছে, নিজে না খেয়েও একজন মুক্তিযোদ্ধাকে একবেলা খাওয়ানোর জন্য ব্যাকুল থেকেছে। তাদের সবাই, আমাদের তথা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পরম পুজনীয়।

আজ জাতীয় জীবনে এমন একটি তাৎপর্যপূর্ণ সময় বিজয়ের মাস এসেছে। সে জন্য সেই বীর যোদ্ধাদের ঋণ পূরণের জন্য আমাদের কাজের মধ্য দিয়েই তার প্রতিফলন দেখাতে হবে। স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও আমরা আজও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ও জঙ্গিবাদ এবং রাজাকারমুক্ত দেশ গঠন করতে পারিনি। মহান বিজয় দিবসে জাতির বর্তমান প্রজন্ম দৃঢ় প্রত্যয়ে সেই শপথ নিয়েছে, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ও জঙ্গিবাদ এবং এদের প্রশ্রয়দাতাদের বয়কট করার। এদের উত্থানকে রুখে দিতে এই নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার সময় এসেছে। স্বাধীনতাবিরোধী এ অপশক্তিকে রাষ্ট্রিয় ক্ষমতায় আনতে এক এগার’র কুশিলবরা আজ এক হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে।

২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগ স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী এবং জঙ্গিবাদীদের রাজনীতির হত্যা, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এ কাজে তারা দেশি এবং আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন পাচ্ছে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির রাজনীতি শেষ হওয়ার পথে রয়েছে। দেশের বর্তমান তরুণ প্রজন্ম তাদের বয়কট করছে। তদুপরি টানা দুই টার্ম সরকার পরিচালনাকালে বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন করে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ সফরে এসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ উন্নয়নের মডেল’। চলমান এই উন্নয়নের ধারকে অব্যাহত রেখে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে হবে। তা হলেই কেবল মহান বিজয়ের স্বার্থকতা সর্বোচ্চ শিখরে পদার্পণ করবে। ভুলে গেলে চলবে না, চলমান উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে গত কয়েক বছর আগে জাতি অবাক চোখে এ অপশক্তির উন্মাদনা দেখেছে স্বচক্ষে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল ও নির্বাচন প্রতিহতের নামে  ২০১২-১৩ ও ১৫ সালে দেশজুড়ে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী ও তাদের দোসররা।

এ সময়ে তারা দেশজুড়ে সাধারণ মানুষ হত্যা, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের ওপর আক্রমণ করে পুলিশ হত্যা, সরকারি- বেসরকারি অফিস-আদালতে হামলা করে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, বাড়িতে আক্রমণ করে অগ্নিসংযোগ এবং অর্ধশতাধিক আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যা, বাসে পেট্রলবোমা মেরে কয়েকশ নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে। জামায়াতের এসব কাজে প্রকাশ্যে নৈতিক সমর্থন দেওয়া এবং অপ্রকাশ্যে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে বিএনপি। বেগম জিয়া দলের প্রধান পদে আসীন থাকলেও ২০০১ সালে সরকার গঠনের পর থেকে বিএনপির সকল রকমের কর্ম-পরিকল্পনা করা হয় তারেক জিয়ার সিদ্ধান্তে। ২০১৩ সালের নৈরাজ্য চলাকালীন লন্ডন থেকে তারেক রহমানের সঙ্গে বিএনপি নেতা শমসের মবিন চৌধুরীর টেলিফোন আলাপ ফাঁস হলে দেশবাসীর সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ে তারেক রহমানের জামায়াতপ্রীতি এবং জঙ্গি মানসিকতা। তারেক রহমানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে খবর প্রকাশ হয়েছে গণমাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর ২০০৫/০৬ সালে তারেক রহমানকে আমেরিকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। কানাডার দুই আদালত বিএনপিকে ‘সন্ত্রাসী দল’ বলে মতামত দেয়। সরকার পতনের আন্দোলনের নামে ২০১৫ সালের শুরুতে লাগাতার অবরোধের ডাক দিয়ে বেগম জিয়া বসবাস করতে শুরু করেন দলীয় কার্যালয়ে। দীর্ঘ ৯২ দিন সেখানে অবস্থান করে তিনি দেশজুড়ে চালান পেট্রলবোমা সন্ত্রাস।

এ সন্ত্রাসে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় কয়েকশ সাধারণ পথচারী, গবাদি পশু; ধ্বংস করা হয় কয়েক হাজার যানবাহন। সে সন্ত্রাস চলাকালে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এবং গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেন সন্ত্রাসীদের কাছে হার স্বীকার করে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বলেছিলেন আওয়ামী লীগকে। এত ব্যাপক সন্ত্রাসের পরেও সরকার টলাতে না পেরে বেগম জিয়া অবরোধের সমাপ্তি ঘোষণা না করে বাসায় ফিরে যেতে বাধ্য হন। ১৩-১৫ সালের পেট্রলবোমা সন্ত্রাস সাধারণ মানুষের কাছে বেগম জিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিঃশেষ করে দেয়। দেশজুড়ে এত ব্যাপক অগ্নি সন্ত্রাস, বিশেষ করে জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে যিনি রাজনৈতিক দাবি আদায়ের চেষ্টা করতে পারেন তাকে জনগণের নেতা হিসেবে আর মেনে নেয়নি সাধারণ মানুষ, এমনকি তার দলের নেতা-কর্মীরা পর্যন্ত। বিএনপির নেতা-কর্মীরা পর্যন্ত তার ডাকে সে আন্দোলনে সাড়া দেননি। ২০০১-০৬ সালে ক্ষমতায় থাকাকালীন রাজনৈতিক অরাজকতা, জঙ্গি সৃষ্টি বাংলাভাইদের উত্থান, বিরোধী দল হত্যা, নিপীড়ন, জামায়াত-শিবিরের দৌরাত্ম্য, যুদ্ধাপরাধীদের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়া, সর্বোপরি হাওয়া ভবন সৃষ্টি করে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে দুর্নীতিতে পরপর পাঁচবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের শিরোপা পাওয়া বেগম খালেদা জিয়া বিরোধী দলে থেকেও একই রকমের কাজ করেছেন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে তিনি শুধু বাধাই দেননি যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধকে অস্বীকার করেছেন; হরতাল করে, বিচারের রায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে, জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হত্যা-ধ্বংস করে বিচার বানচাল করার চেষ্টা করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন; পনেরো আগস্ট মিথ্যা জন্মদিন পালন করে বঙ্গবন্ধুহত্যাকে উপহাস করেছেন। ১/১১ সরকারের দায়ের করা দুর্নীতির মামলা, পরবর্তী সময়ে অগ্নি সন্ত্রাসের হুকুমের আসামি হিসেবে এবং অন্যান্য কারণে তার বিরুদ্ধে ৩০টির অধিক মামলা বর্তমানে চালু রয়েছে। এর একটির রায়ে তার পাঁচ বছরের সাজা হয়েছে। তারই দলের ব্যাণারে আজকে স্বধীনতাবিরোধী ও ১/১১ কুশিলবরা এক হয়ে এসব অপকর্মকে বৈধতা দেওয়া ও জঙ্গিবাদের প্রসার ঘটাতে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এসব অপশক্তিকে নিঃশেষ করতে তারুণ্যের দীপ্তমান শিখায় প্রজ্জ্বলিত হয়ে স্বাধীনতার স্বপক্ষের সকল লড়াকু সৈনিককে একাট্টা হতে হবে। এই হোক ৪৮তম মহান বিজয় দিবসের অঙ্গীকার।

Ads
Ads