প্রধানমন্ত্রীর সৌদি সফর: উন্নয়নের অংশীদার হতে স্বাগতম

  • ২১-Oct-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

উন্নত বিশ্বের কোনো দেশ যখন বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার হতে আগ্রহ দেখায় তখন সেটা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য ইতিবাচক খবর। এতে করে স্পষ্ট হয় যে, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ একটা আস্থার জায়গা খুঁজে পেয়েছে। নয়তো বর্তমানে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার হতে চাইবে?

বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চার দিনের সৌদি আরব সফরকালে বাংলাদেশের উন্নয়নে অংশীদার হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বিন আবদুল আজিজ। এ লক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশে একটি বিশেষজ্ঞ দল প্রেরণ এবং তাদের মূল্যায়ন ও সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলাদেশের কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এটি অবশ্যই খুবই আশাবাদী হওয়ার মতো একটি খবর। খবরটি দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতর সম্পর্কেরও ইঙ্গিতবাহী। সৌদি বাদশাহ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলেছেন, এটি আপনার বাড়ি। এখানে যখন ইচ্ছা বেড়িয়ে যাবেন। যদিও আধুনিক বিশ্ব ধর্মীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে না আর তারপরও বলতে হয়, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কিন্তু সেরকম সম্পর্কই আশা করা হয়ে থাকে। তা দেশে যে সরকারই আসুক না কেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুবরাজের বৈঠকে মূলত দুটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

এর একটি হলো বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কিত, অন্যটি প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত। এই সফরে প্রত্যাশিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি যদিও কারিগরি প্রেক্ষাপটে পিছিয়ে গেছে, উন্মোচিত হয়েছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরও কিছু নতুন দ্বার। আমরা জানি, ভৌগোলিকভাবে দূরবর্তী হলেও ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কারণে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ মিত্রগুলোর একটি সৌদি আরব। বস্তুত পবিত্র কাবা শরিফ ও হজরত মুহাম্মদের (সা.) রওজা শরিফের অবস্থান দেশটিকে গোটা মুসলিম বিশ্বের কাছেই অনন্য মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। প্রতিবছর লাখ লাখ হজযাত্রী আমাদের দেশ থেকে মক্কা-মদিনা ভ্রমণ করেন। বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি জনশক্তি ওই দেশে কর্মরত থেকে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ সমৃদ্ধ করে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।

যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বিন আবদুল আজিজ তার ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ এবং সাম্প্রতিক সৌদি সমাজব্যবস্থায় বিভিন্ন সংস্কার কাজের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তাকে দেশটির ক্ষমতাবলয়ের শীর্ষস্থানে অবস্থানকারীদের একজন বলে মনে করা হয়। যদিও বর্তমানে সাংবাদিক খাসোগি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার জড়িত থাকার অভিযোগ নিয়ে তার অবস্থান ইতোমধ্যে টলমলায়ন হয়ে ওঠেছে, তদুপরি দেশটির অর্থনৈতিক শক্তি এমন অবস্থানে পৌঁছে গেছে যে, দেশটির এই দুর্যোগ যুবরাজ সহসাই সামাল দিতে পারবেন বলেই মনে হয়। সে প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে বিনিয়োগ সংক্রান্ত তার আগ্রহ ধরে রাখা সম্ভব হলে দেশে বিদেশি বিনিয়োগের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে বলে আমরা আশাবাদী।  

সেক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন নতুন ক্ষেত্রে দেশটিকে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে পারে। বর্তমানে মূলত নির্মাণ শিল্পে নিযুক্ত বাংলাদেশি শ্রমিকের পাশাপাশি সেবা, শিক্ষা ও গবেষণামূলক খাতেও বাংলাদেশি জনশক্তির প্রয়োজন হবে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন যে, বিভিন্ন খাতে আমাদের দক্ষতা বাড়াতেই হবে। গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে সৌদি যুবরাজও সম্পর্কের এই নতুন মাত্রা নিয়ে কথা বলেছেন। একই দিন সকালে সৌদি ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে আলোচনায়ও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, আউটসোর্সিংয়ের জন্য বাংলাদেশ একটি উদীয়মান কেন্দ্র। সৌদি আরব এখানকার সহজলভ্য কর্মী, অপেক্ষাকৃত সস্তা শ্রম এবং বিশেষায়িত রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের সুযোগ নিতে পারে। ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের ধারাবাহিক সাফল্য সৌদি বিনিয়োগের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক হতে পারে। তবে সে দেশে চাকরির বাজার সম্প্রসারণ, চাকরিরত বাংলাদেশিদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি সৌদি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হলে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। 

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক, সামাজিকসহ বিভিন্ন দিক থেকেই বাংলাদেশের অগ্রগতির বিষয়টি সামনে আসছে বারবার। সঙ্গত কারণেই আমরা প্রত্যাশা করি, সৌদি আরব বাংলাদেশে বড় ধরনের বিনিয়োগ করুক এবং বাংলাদেশে যে উন্নয়নের ধারা এগিয়ে যাচ্ছে তার অংশীদার হোক। এই সফরে প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের নতুন ভবন উদ্বোধন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর রিয়াদ সফর এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বিন আবদুল আজিজের সঙ্গে তার বৈঠকের পর দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের যে নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, তা ফলপ্রসূ করার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে সেখানকার বাংলাদেশি দূতাবাস ও কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমরা আশা করব, সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনাকাক্সিক্ষত রাজনৈতিক দ্বৈতাচারের উর্ধ্বে ওঠে আন্তরিকতার পরিচয় দেবেন। 

একইসঙ্গে দেশে বিনিয়োগের প্রতিকূল অবস্থা এবং তা নিরসনের ব্যাপারেও আমাদের ভাবতে হবে। দেশে বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ না করলেও গ্যাস ও বিদ্যুতের স্বল্পতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ বিভিন্ন কারণে নতুন বিনিয়োগে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা আগ্রহী হচ্ছেন না। সেক্ষেত্রে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সব ধরনের হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হবে। এতে করে সৌদি আরবসহ দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রীর রিয়াদ সফরের মধ্য দিয়ে দু’দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার এবং দেশে বিনিয়োগের যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা আরো অধিকতর ফলপ্রসূ হবে।

Ads
Ads