কোরবানির বর্জ্য অপসারণে চাই আত্মসচেতনতা

  • ১৯-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

কোরবানির ঈদে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য দেশজুড়ে পশু জবাই করা একটা বিশাল আয়োজনের ব্যাপার। সারা দেশে ঈদের জন্য ৫৫ থেকে ৬০ লাখ বড় ও ৪৫ থেকে ৫০ লাখ ছোট পশু কোরবানি করা হয়ে থাকে। তার মানে এই কোরবানি ঈদে মাত্র একদিনেই পশু জবাই করা হয় প্রায় ছোট-বড় মিলে ১ কোটির বেশি। এখানে এই পশু জবাই কতটা স্বাস্থ্য ও পরিবেশসম্মত হলো সেটাও দেখার বিষয় রয়েছে। লক্ষণীয় যে, যেখানে স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিন গোটা রাজধানীতে প্রায় দেড় থেকে ২ হাজার পশু জবাই করা হয়, সেখানে নিয়মতান্ত্রিকভাবে জবাই করা হয় মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ পশু। বাকি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ পশু জবাই করা হয় যত্রতত্র, যেখানে-সেখানে অনিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। আর কোরবানি ঈদে এই যে এক কোটির বেশি পশু জবাই করা হয় সেখানে আমরা কতটা স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্মত পশু জবাই প্রত্যাশা করতে পারি! 

প্রতিবছর কোরবানির সময় রাজধানীর অলিতে গলিতে যাত্রতত্র পশু জবাই করায় রক্ত ও পশুবর্জ্য ছড়িয়ে থাকে পুরো শহরময়। সেই বর্জ্য পরিষ্কার করাও সিটি করপোরেশনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। দেখা গেছে, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে সরকার বেশ কয়েক বছর ধরে রাজধানীতে পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়া করার জন্য স্থান নির্ধারণ করে দিয়ে এলেও সেখানে যাওয়ার আগ্রহ তেমন দেখা যায় না। আর এতেই প্রমাণ হয় নগরবাসী হলেও এখনো আমরা সবাই নাগরিক হয়ে উঠতে পারিনি।

কিন্তু এই সীমাবদ্ধতার মধ্যদিয়েও এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, এখন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে এ কাজটিতে গত তিন বছরে অনেক নিয়মতান্ত্রিকতা এসেছে, যা সবার চোখেই ধরা পড়ছে। এদিকে গতকাল রোববার পশু কোরবানির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাজধানী থেকে বর্জ্য অপসারণের ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। আর এবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় পশু জবাইয়ের জন্য ৬০২টি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।

নিয়মতান্ত্রিকভাবে পশু জবাই না হলে পশুর মাংসও যেমন জীবাণুমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত হয় না, অন্যদিকে পশুর চামড়াসহ আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে; যা সপ্তাহ কয়েক পর্যন্ত বিরাজমান থাকে। কেননা, কোরবানির পশুর রক্ত, মাংসের উচ্ছিষ্টাংশ, হাড়-হাড্ডি, নাড়ি-ভুঁড়ি পরিষ্কারের ময়লা, কাঁচা চামড়ার গন্ধ ইত্যাদির ক্ষতিকর প্রভাব মারত্মক পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি করে থাকে। এটা তো গেল শুধু রাজধানী ঢাকা শহরের কথা। কিন্তু সারা দেশে আসলে কী হচ্ছে? সেখানে সংশ্লিষ্ট এলাকার সরকারের প্রশাসন কিংবা জনপ্রতিনিধিরা যদি এ রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তাহলে কোরবানির পশু জবাই স্বাস্থ্য ও পরিবেশসম্মত হয়ে জনকল্যাণ হবে। এখন আটটি বিভাগীয় শহর, ৬৪টি জেলা শহর, প্রায় ৫০০টির ওপর উপজেলা শহর; এমনকি এখন পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও অনেক শহর গড়ে উঠেছে, সেখানেও সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কোরবানির পশুকে স্বাস্থ্য ও পরিবেশসম্মতভাবে জবাই তদারকি করা উচিত। তাছাড়া গ্রাম-গ্রামান্তরে তো খোলা অনেক মাঠ রয়েছে, যেখানে ইচ্ছা করলেই স্বাস্থ্য ও পরিবেশসম্মতভাবে পশু জবাই করা যেতে পারে। বিষয়টি খুবই সহজ একটি কাজ।

প্রত্যেকে তাদের কোরবানির পশু জবাই দেওয়ার পর তাড়াতাড়ি যদি সেই রক্ত জমাট বাঁধার আগেই কয়েক বালতি পানি ঢেলে সেখানে অল্প পরিমাণে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দেয় তাহলে স্থানটি জীবাণুমুক্ত হয়ে পরিবেশের জন্য ভালো হয়। আর সেই উচ্ছিষ্টাংশ যদি মাটির কোনো একটি স্থানে গর্ত করে মাটিচাপা দিয়ে রাখা যায় তাতেও পরিবেশ রক্ষায় অনেক ভালো ফল পাওয়া যায়। দেখা গেছে, ঈদের পর যদি আমরা কোথাও বেড়াতে যাই তাহলে এসব উচ্ছিষ্টাংশের গন্ধ সহজেই আমাদের নাকে এসে জানিয়ে দেয় কোরবানির ঈদ শেষ হয়েছে। সবাই যার যার জায়গায় একটু সচেতন হলেই এ থেকে আমরা পরিত্রাণ পেতে পারি। এসব কাজ তদারকির জন্য প্রয়োজনে পরিবেশ অধিদফতরের কর্মীবাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের দিয়ে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ ও প্রচার-প্রচারণা ব্যাপকভাবে করা যেতে পারে। সর্বোপরি একটি কথা আমরা সবাই একবাক্যে স্বীকার করব, সবকিছু শুধু সরকারের ঘাড়ে দায়-দায়িত্ব না চাপিয়ে দিয়ে কিছু দায়িত্ব নিজেকেও নিতে হবে। আর তা হলো আত্মসচেতনতা। প্রত্যেকে প্রত্যেকের জায়গায় মোটের ওপর সচেতন হলেই নিজের পরিবেশকে আমরা নিজেরাই বসবাসযোগ্য করে রাখতে পারি। আর কোরবানি যদি পুণ্যলাভের উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে তাহলে  ঈদের বর্জ্য অপসারণে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় আত্মনিয়োগ কেনই বা পুণ্যলাভ হবে না? কাজেই কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আমরা যেন অধিকতর নাগরিক হয়ে উঠতে সমর্থ হই।

সম্পাদক ও প্রকাশক
ড. কাজী এরতেজা হাসান

ফেসবুক প্রোফাইল: https://www.facebook.com/ertaza.hassan
ফেসবুক পেইজ : https://www.facebook.com/drkaziertazahassan/
ইঊটিউব চ্যানেল : https://www.youtube.com/channel/UCM8qAM20RII6fbh0hNkXs6Q

Ads
Ads