তাদের মতোই নির্মম ইতিহাসের সাক্ষী হচ্ছেন বি.চৌধুরী- কামাল-ফখরুল!   

  • ২৯-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস অত্যন্ত নির্মম। এদেশের মূলধারার রাজনৈতিক দল থেকে বেরিয়ে কেউ কোনোদিন টিকে থাকতে পারেনি। অনেকেই মূল রাজনৈতিক দলে ভালো অবস্থানে থেকেও সরে গিয়ে নতুন কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট করার উদ্যোগ নিয়েছেন। অনেক দল ও জোট গঠনও করেছেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, এদের কেউই নতুন করে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা পাননি। বরং রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও দল দুয়ই হারিয়ে গেছেন কালের অতল গহ্বরে।

মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি। কিন্তু ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছর গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। তবে মূলধারা আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গিয়ে ভাসানী রাজনীতিতে বড় কোনো প্রভাব রাখতে পারেননি। আজও ন্যাপ টিকে আছে, তবে এটি শুধুই এক নাম সর্বস্ব দলে পরিণত হয়েছে।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালের ৩১শে অক্টোবর প্রতিষ্ঠা হয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। মুক্তিযুদ্ধের ৯নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) এম এ জলিল-কে সভাপতি এবং ডাকসুর ভিপি ও ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রবকে সাধারণ সম্পাদক করে দলটির প্রথম কমিটি গঠিত হয়। নূরুল আলম জিকু, সাজাহান সিরাজসহ তৎকালীন তুখোড় আওয়ামী লীগ নেতারা যোগ দিয়েছিলেন জাসদে। জাসদ নিয়ে কত স্বপ্নই দেখেছিলেন আওয়ামী লীগের দলছুটরা। এখন কোথায় সেই জাসদ। আদর্শতো তো বহুদূর। ভেঙ্গে কয়েক টুকরা হয়ে পড়েছে জাসদ। জাসদ এখন যত টুকরা ততটি আসনও নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনা নেই বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ছাত্রনেতা, মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক ১৯৯৮৩ তে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে যান। নতুন দল করেও টিকতে না পেরে আবার ফিরে আসেন আওয়ামী লীগে। 

এভাবে বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক নেতারা বিচ্যুত এবং সময়ের পরীক্ষায় ব্যর্থ হিসেবেই পরিচিত হয়েছেন।

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল দাবি করা বিএনপিরও দলচ্যুত রাজনীতিবিদদেরও একই হাল দেখা গেছে। বিএনপির দাপুটে মহাসচিব (১৯৮৬ থেকে১৯৮৮ পর্যন্ত) ছিলেন কে এম ওবায়দুর রহমান। কিন্তু বিএনপি থেকে বেরিয়ে গিয়ে আলাদা দল গঠন করলেও টিকতে পারেননি। হারিয়ে গেছেন অজ্ঞাতনামা হিসেবেই। দলটিরও আর অস্তিত্ব নেই।

বিএনপির সফলতম মহাসচিব বলা হয় মান্নান ভুঁইয়াকে। ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের সময় তিনি বেরিয়ে যান বিএনপি থেকে। বর্তমানে মান্নান ভুঁইয়ার মৃত্যুবার্ষিকী যায় আসে, কিন্তু কেউ কোনো খবরই রাখে না। 

আবার হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে জাতীয় পার্টি থেকে সরে যান নাজিউর রহমান মঞ্জু। একইভাবে এরশাদকে ছেড়ে গেছেন আনোয়ান হোসেন মঞ্জু। দুই মঞ্জুই আলাদা আলাদা জাতীয় পার্টির প্রতিনিধিত্ব করছেন। তবে দুটি দলের কোনোটিই এরশাদের জাপার সমকক্ষ হতে পারেনি। দুটির অবস্থাই নিভু নিভু।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক সমস্যা, সংকট ও জটিলতা আছে। এদেশের রাজনীতি নিয়ে হা-হুতাশও করেন অনেকে। কিন্তু একটি বিষয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্পষ্ট। পদস্খলিত রাজনীতিবিদ, অর্থাৎ যারা দলছুট হন তারা আর কখনোই রাজনীতিতে পুন:প্রতিষ্ঠা পান না।

বাংলাদেশের মূলধারার দলগুলোর জন্য এক কঠিন সময় ছিল ২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেন। ওই সময় বড় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির দলছুট নেতাদের নিয়ে তৃতীয় শক্তি গঠনের উদ্যোগ দেখা যায়। কিংস পার্টি বলে একটি দলও আবির্ভাব হয় যাঁর নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্রলীগের এক সময়ের সভাপতি ও তৎকালীন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী। ওয়ান ইলেভেনে দলছুট ফেরদৌস কোরেশীকে এখন কেউ চেনে না। কিংস পার্টির অস্তিত্বও এক অর্থে বিলীন।

নির্বাচন সন্নিকটে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষে সপ্তাহেই অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এমন সময়ে আজ আওয়ামী লীগের দলছুট ও বর্তমান গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেনের বাসায় রাজনৈতিক বৈঠক বসেছে। মূলধারার দলগুলো থেকে বিচ্যুত লোকজনেরই ভিড় সেখানে। মনোনয়ের আশায়ও ঐক্য প্রক্রিয়া আসছেন অনেকে। দলছুট ড. কামাল ও বি. চৌধুরীর তৃতীয় শক্তি নিয়ে অনেক আশাই করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস যে ভিন্ন কথা বলে। তাঁরা কি পারবেন ইতিহাসকে বদলে দিতে?  নাকি পূর্ব ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন?  

Ads
Ads