নৌকার এক আসনের মনোনয়নের জন্য ১৬৭ তোরণ

  • ২৭-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা তোরণ প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) আসনের হাটবাজার ও রাস্তার মোড়ে মোড়ে ১৬৭টি তোরণ তৈরি করা হয়েছে।

তোরণ নির্মাণে শীর্ষে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ আলী খনা খসরু। তাঁর নামে ৩৭টি তোরণ তৈরি করা হয়েছে। পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম খানের নামে ৩২টি তোরণ দেখা গেছে। যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়ের নামে ২৮টি তোরণ দেখা গেছে। জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি (অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল) নুর খানের তোরণ ২২টি। জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সামছুর রহমান ভিপি লিটনের তোরণ ২০টি। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান খানের তোরণ ১৬টি। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা রানা হামিদের তোরণ ১২টি। এ ছাড়া মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আমিরুল ইসলাম, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক পৌর মেয়র প্রশান্ত কুমার রায়, সাবেক যুবলীগের আহ্বায়ক ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য অধ্যাপক ওমর ফারুক, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা সামছুজ্জোহা, মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালিব, মুক্তিযোদ্ধা আবু আক্কাস আহাম্মেদ, কেন্দ্রীয় নেতা সুব্রত সরকার চন্দন ও সারোয়ার মোর্শেদ জাস্টিস। তাঁদের কেউ কেউ তোরণও (৫ থেকে ১০-এর মধ্যে) তৈরি করেছেন। আবার কেউ কোনো তোরণ তৈরি করেননি। প্রতিটি তোরণের ভাড়া ২০ হাজার টাকা হলে সব তোরণের মূল্য দাঁড়ায় ৩১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। দলীয় মনোনয়নের জন্য এ বিশাল ব্যয় মনোনয়নে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না তা নিয়েও সমালোচনা চলছে। তোরণ প্রতিযোগিতায় অন্য কোনো দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দেখা যায়নি। তবে অন্য দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের পোস্টার দেখা গেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ১৫ আগস্টের আগে তোরণ নির্মাণ শুরু হয়। ঈদুল আজহার আগে এটা ব্যাপক আকার ধারণ করে। অধিকাংশ তোরণের ওপরে ‘ঈদ মোবারক’, ‘পবিত্র ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন’ লেখা দেখা গেছে। সঙ্গে দলীয় শীর্ষদের পাশাপাশি নেতার ছবি শোভা পাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সম্প্রতি ঝড়-বৃষ্টিতে দুটি তোরণ ভেঙে গেছে। আটটির ব্যানার ও বাঁশ খুলে গেছে। তোরণের কারণে রাস্তা সরু হয়ে যান চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে। সবচেয়ে ঝুঁকির কথা, তোরণের ওপর বা পাশ দিয়েই গেছে বিদ্যুতের তার। ঝড়ে যেকোনো সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা।

দলীয় সূত্র জানায়, মনোনয়নের তীব্র প্রতিযোগিতায় সরকারদলীয় প্রার্থীদের মাঝে যেমন বেড়ে গেছে দৌড়ঝাঁপ, তেমনি বেড়েছে কর্মী-সমর্থকদের মাঝেও। কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষের মাঝেও বেড়ে গেছে জল্পনা-কল্পনা আর মনোনয়নের নানা হিসাব-নিকাশ। তোরণ প্রতিযোগিতা ছাড়াও প্রার্থীরা নিজের অবস্থান তুলে ধরতে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে তৃণমূলের দৃষ্টি কাড়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পরিচিত। আবার অপরিচিত বা কম পরিচিত মনোনয়নপ্রত্যাশীও রয়েছেন।

নেতকর্মীরা জানান, জেলা সদরের এ আসনটিতে এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় আছেন ১৬ জন প্রার্থী। বিগত দিনে এ আসনে এত বেশি মনোনয়নপ্রত্যাশী আর দেখা যায়নি।

তোরণ নেই এমন মনোনয়নপ্রত্যাশী মুক্তিযোদ্ধা আবু আক্কাস আহাম্মেদ বলেন, ‘আমি সুপরিচিত। আমি প্রতিটি ইউনিয়ন ওয়ার্ডে সবার কাছে যাচ্ছি। আমার কোনো তোরণের প্রয়োজন নেই। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আমাকে না চিনলে এই প্রচারে কোনো মূল্য নেই। তাই যাঁরা তোরণ দিয়ে নিজের প্রচার করছেন তাঁদের নিশ্চয়ই তৃণমূলের সঙ্গে পরিচয়ই নেই। তাহলে তাঁরা কী রাজনীতি করেছেন? তাঁরা তো মনোনয়ন পাওয়ারই যোগ্য না।’

জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক পৌর মেয়র (যার কোনো তোরণ বা পোস্টার নেই) প্রশান্ত কুমার রায় বলেন, ‘আমাকে দুটি থানার প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা চেনেন। দলের প্রয়োজনে বিভিন্ন ওয়ার্ড ও পাড়ায় কাজ করেছি। আমার যদি প্রচারের জন্য তোরণের প্রয়োজন হয়, তাহলে আমি মনোনয়নেরই যোগ্য না।’

বারহাট্টা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আজিজুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক কাজী আবদুল ওয়াহেদ জানান, অনেক প্রার্থী প্রচারে আছেন। কিন্তু তাঁরা তৃণমূলের সঙ্গে পরিচিত না। এলাকায় আসেন যার যার লাইনে।

জেলা কৃষক লীগের সভাপতি কেশবরঞ্জন সরকার বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে ভোট চাওয়া যায় না। দলীয় নেত্রীর এ ধরনের কোনো নির্দেশনা নেই। যাঁরা তোরণ বা বিলবোর্ড টাঙিয়েছেন তাঁরা ভুল করেছেন। তাঁরা মওসুমি পার্টি। এখানে নেতৃত্বের শূন্যতা রয়েছে। কিছু কালো টাকার মালিক দলের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছেন, যা আগে ছিল না। আমরা শেখ হাসিনার উন্নয়নের বার্তা ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়ে তুলে ধরব, তোরণে নয়।’

এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের জনসমর্থন নেই, এ কারণে তাঁরা তোরণ টাঙানোয় ব্যস্ত।’

তবে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিয়ার রহমান খান বলেন, ‘তোরণের সঙ্গে মনোনয়নের কোনো সম্পর্ক নেই।’

Ads
Ads