আইসিজে রায়কে অভিনন্দন: ফিরিয়ে নেওয়া হোক রোহিঙ্গাদের

  • ২৪-জানুয়ারী-২০২০ ১১:২৯ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

রোহিঙ্গাদের হত্যা-নির্যাতন বন্ধে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত (আইসিজে) এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরা সর্বসম্মতভাবে ঐতিহাসিক এ আদেশ দেন। এই রায়কে নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরকারী গাম্বিয়া, বাংলাদেশ সরকার, মানবাধিকার সংগঠন, মানবাধিকার কর্মী ও সুশীল সমাজ স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো সু চি বলেছেন, তাদের ওপর অত্যাচারের কথা রোহিঙ্গারা বাড়িয়ে বলছেন। সু চির বক্তব্য যে মোটেই সঠিক নয়। সেটা উক্ত রায়ের মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে।

মিয়ানমার সরকার রাখাইনে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা-নির্যাতন চালিয়ে অন্যায় করেছে। হত্যা-নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছে। বহুদিন ধরে মিয়ানমার সরকার তার দেশের নাগরিক রোহিঙ্গাদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে আসছে। হত্যা ছাড়াও রোহিঙ্গা নারীদের উপর ধর্ষণ চালিয়েছে। নির্বিচারে হত্যা-নির্যাতন-ধর্ষণ করেও মিয়ানমার সরকার সবকিছুকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। 
তাদের এই দুষ্মকর্মের  বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহল সোচ্চার হয়ে উঠেছে। মিয়ানমারকে এই হত্যা-নির্যাতন থামানোর অনুরোধও তারা করে আসছে অনেকদিন ধরে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলের কোনও কথা কানে তোলেনি মিয়ানমার, বরং রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা-নির্যাতন-ধর্ষণ ক্রমশ বাড়িয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের থাকার আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে এবং বাংলাদেশকে লাখ লাখ রোহিঙ্গার ভরনপোষণের চাপ সহ্য করতে হচ্ছে। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ আর কতদিন উদ্বাস্তু রোঙ্গিাদের ভার বহন করবে? আমরা মনে করে আন্তর্জাতিক মহলকে মিয়ানমান সরকারের উপর আরও চাপ বৃদ্ধি করে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। একটি দেশ তার নাগরিকদের উপর হত্যা-নির্যাতন-ধর্ষণ চালিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে ঠেলে দেওয়ার মতো জঘন্য কাজ করতে পারে, তা আমাদের বিবেক মেনে নিতে পারে না। এটা কোনও সভ্য মানুষই সেটি মেনে নিতে পারে না। ফলে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার যে গণহত্যা চালিয়েছে তার কঠোর শাস্তি দেশটিকে ভোগ করতেই হবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদার বলেই উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দিয়েছেন। এটা করে তিনি মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন।  এ জন্য বিশ্বনেতারা তাকে অভিনন্দিতও করেছেন। কিন্তু আমরা মনে করি- এখন সময় এসেছে বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়ার। এটা আর কালবিলম্ব করা মিয়ানমান তথা সু চির ঠিক হবে না। 

এ ব্যাপারে আমরা আশা করবো ভারত-চীন-আমেরিকা এবং বিশ্বের প্রতিটি শক্তিশালী রাষ্ট্র এগিয়ে আসবে। কোনও দেশই চায় না নির্যাতিতরা নিজের দেশ ছেড়ে অন্যদেশ আশ্রয় নিয়ে বসবাস করুক। এ জন্য মিয়ানমারকে পর্যাপ্ত চাপ সৃষ্টি করে তার দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতেই হবে।
আমরা জানি মিয়ানমারে দীর্ঘদিন সামরিক জান্তা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে রেখেছিল। এ কারণে দেশটি ক্রমশ পিছিয়ে গেছে। এরপরে সু চির দল ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেও অবস্থার কোনও পরিবর্তন ঘটেনি।  রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন-হত্যা-ধর্ষণ কমেনি বরং বেড়েছে। শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন সুচি। অতীতে তিনি একজন গণতান্ত্রিক নেত্রী হিসাবে সারা বিশ্বের শ্রদ্ধা কুড়িয়েছেন। সেই তিনি কিভাবে তার নিজের দেশের রোহিঙ্গা নাগরিকদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালান তা বোধগম্য নয়।

আইসিজে যে রায় দিয়েছে তা ঐতিহাসিক, এখন  এই রায়ের বাস্তবায়ন দরকার। মিয়ানমার সেটি কতটা বাস্তবায়িত করবে এ নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। কারণ মিয়ানমার বাংলাদেশে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে রাজি হওয়ার পরেও নানা তালবাহানা করে যাচ্ছে। এটাও মোটেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। পাশাপাশি রাখাইনে যেসব রোহিঙ্গা রয়েছে তাদের উপর হত্যা-নির্যাতন-ধর্ষন নেমে আসুক এটা কেউ প্রত্যাশা করে না। আইসিজে এ ব্যাপারে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায় সু চির দেশ মিয়ানমার খুবই খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নিজের দেশের নাগরিকদের উপর গণগহত্যা চালিয়ে বিশ্বপরিমণ্ডলে কঠোর সমালোচনার মুখে রয়েছে। ফলে আইসিজে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় মিয়ানমারকে জরুরিভিত্তিতে চার দফা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ যেসব দিয়েছে তা মিয়ানমারকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে।

আদালত বলেছেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বা কোনো পক্ষ এমন কিছু করতে পারবে না, যা গণহত্যা হিসেবে গণ্য হতে পারে। জাতিসংঘ কনভেনশন অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে হবে। গণহত্যার প্রমাণ ধ্বংস করা যাবে না। প্রথমে চার মাস পর এবং পরে প্রতি ছয় মাস পর পর মিয়ানমারকে আদালতে রিপোর্ট দিতে হবে, যত দিন না পর্যন্ত বিচারের চূড়ান্ত রায় প্রকাশিত হয়। এই রায় এমন একটি বিষয় তুলে ধরেছে যাতে বলা যায় অন্যায় করে কেউ কখনো পার পেতে পারে না। মিয়ানমারও তার অন্যায় কৃতকর্মের ফল ভোগ করবে।

Ads
Ads