বড়দিনে একটুখানি প্রত্যাশা

  • ২৭-Dec-২০১৯ ০৮:৩১ অপরাহ্ন
Ads

:: ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) ::

লেখাপড়ায় আমার হাতেখড়ি ১৯৭৬ সালে বনানীতে, রোজী অ্যান সেন্টার নামের একটা কিন্ডারগার্টেনে। আজকের বনানী থানাটা তখন ছিল বনানী পুলিশ ফাঁড়ি। বনানীর ওই রাস্তায়ই থানার কয়েকটা বাড়ি, আগে ছোট একটা একতলা বাসায় ছিল ওই রোজী অ্যান সেন্টার। মিস্টার নেলসন বলে একজন খ্রিস্টান ভদ্রলোক স্কুলটা চালাতেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী মিসেস রোজী আর ছেলে-মেয়েরা। এই মুহূর্তে রিকিদা, ডরোথি দি আর ক্যান্ডির নাম মনে করতে পারছি। স্কুলটা এখন আর নেই। নেই একতলা সেই ছোট বাড়িটাও। সেখানে এখন বিশাল মাল্টিস্টোরিড অ্যাপার্টমেন্ট। মিস্টার নেলসন আছেন কি না, জানি না। দীর্ঘদিন যোগাযোগ নেই। আর আমিই যখন ৫০ ছুঁইছুঁই, তাঁর না থাকাটাই হয়তো বা বাস্তবতা।

মূল স্কুল ভবনটার পেছন দিকে একটা টিনশেড ঘরে ছিল রিকিদার বিজ্ঞানাগার। থরে থরে নানা রকম কেমিক্যালে ঠাসা বয়াম সাজানো ছিল ছোট এই ঘরের চার দেয়ালের থাকগুলোয়। রিকিদা প্রায়ই পড়ার ফাঁকে নানা রকম রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া দেখিয়ে আমাদের মুগ্ধ করতেন। আমার অন্য সহপাঠীদের কথা জানি না; কিন্তু সেই যে ছোটবেলার মুগ্ধতা, পরবর্তী জীবনে বিজ্ঞান নিয়ে আমার যা কিছু নাড়াচাড়া, তার মূলে যে ছিল তা-ই, তা স্বীকার করতে আমার কোনো দ্বিধা নেই।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার ধর্মীয় বিভাজনের একটা গ্রাফ করা গেলে তাতে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের খুঁজতে মাইক্রোস্কোপ লাগতে পারে। অথচ খেয়াল করে দেখবেন, এই যে মুষ্টিমেয় বাঙালি, তাদের মধ্যে মিস্টার নেলসন আর রিকিদারা সংখ্যায় কিন্তু অনেক বেশি। এঁরা যখন পেশা বেছে নেন তখন জোর দেন সেবা খাতে। এ দেশের নার্সিং আর এনজিও সেক্টরে এঁদের তাই অভাব নেই। আবার তাঁরা যখন পুণ্যের জন্য কিছু করতে চান তখন কিন্তু ঈশ্বরকে তুষ্ট করতে গির্জার পাশাপাশি স্থাপন করেছেন হলি ক্রস, সেন্ট যোশেফ কিংবা নটর ডেমের মতো বিদ্যায়তন।

মিস্টার নেলসনের ওই স্কুলটায়ই আমার পরিচয় হাডুডুর সঙ্গে। টিফিনের ব্রেকে স্কুলের ছোট্ট আঙিনায় নিয়মিত হাডুডু খেলা হতো। জীবনে আমার প্রথম আর শেষবারের মতো হাডুডু খেলা ওই রোজী অ্যান সেন্টারেই। তখন বুঝিনি, এখন বুঝি। আমাদের বেড়ে ওঠাটা ছিল বঙ্গবন্ধু-পরবর্তী বাংলাদেশে একটা কদর্য সময়ে। ‘জয় বাংলা’ তখন ছিল নির্বাসনে আর দেশময় ছিল বাংলাস্তানিদের বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। যাত্রায় বিবেক ছিল না, ছিল প্রিন্সেসদের ঝুমুর ঝুমুর নৃত্য। ক্ষয়িষ্ণু বাঙালি জাতীয়তাবাদ আর নাস্তানাবুদ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সেই বাংলাদেশে একজন মিস্টার নেলসন ওই এক হাডুডু খেলার ছলে বাঙালিত্বের যে বীজ আমার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, তা পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশকে বুঝতে আমাকে সাহায্য করেছে অশেষ।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার ধর্মীয় বিভাজনের একটা গ্রাফ করা গেলে তাতে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের খুঁজতে মাইক্রোস্কোপ লাগতে পারে। অথচ খেয়াল করে দেখবেন, এই যে মুষ্টিমেয় বাঙালি, তাদের মধ্যে মিস্টার নেলসন আর রিকিদারা সংখ্যায় কিন্তু অনেক বেশি। এঁরা যখন পেশা বেছে নেন তখন জোর দেন সেবা খাতে। এ দেশের নার্সিং আর এনজিও সেক্টরে এঁদের তাই অভাব নেই। আবার তাঁরা যখন পুণ্যের জন্য কিছু করতে চান তখন কিন্তু ঈশ্বরকে তুষ্ট করতে গির্জার পাশাপাশি স্থাপন করেছেন হলি ক্রস, সেন্ট যোশেফ কিংবা নটর ডেমের মতো বিদ্যায়তন।

বাংলাদেশের বিপক্ষে এঁদের অবস্থান দেখেছি বলে মনে পড়ে না। খুঁজে দেখবেন, ওই যে ১০ হাজার আট শর মতো রাজাকারের তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে সম্ভবত ১০ জন খ্রিস্টান নেই। কিন্তু দেশের স্বার্থে ঝুঁকি নিতে তাঁদের কখনো পেছনে পড়তে দেখিনি। ঢাকার পাশেই কালীগঞ্জের নাগরী মিশনের পাদ্রিরা আশ্রয় না দিলে একাত্তরের শহীদদের তালিকায় ৩০ লাখের সঙ্গে যে আরো বেশ কয়েক হাজার মুসলমান আর হিন্দুর নাম যুক্ত হতো, তা নিয়ে আমার সন্দেহ নেই।

আর এই কয়েক দিন আগেও পাশ্চাত্যের নামজাদা প্রচারমাধ্যমে যখন বাংলাদেশে খ্রিস্টান নির্যাতনের মিথ্যা খবর প্রচার করা হয়েছে তখন ডাক দিতেই আমরা আমাদের সম্প্রীতি বাংলাদেশের সঙ্গে পেয়েছি এ দেশের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও অন্যান্য নেতাকে। জাতীয় প্রেস ক্লাবে সম্প্রীতি বাংলাদেশ আয়োজিত প্রেস কনফারেন্সে এসে তাঁরা হলভরা মিডিয়ার সামনে দ্ব্যর্থহীনভাবে সেই মিথ্যা প্রচারের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। তাই গত রমজানে খ্রিস্টান কমিউনিটি নেতা উইলিয়াম প্রলয় সমাদ্দারের ইফতারের দাওয়াত পেয়ে এতটুকুও অবাক হইনি।

আজ বড়দিন। এ দেশের খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা পৃথিবীর আর সব দেশের খ্রিস্টানদের মতোই মাতবে বড়দিন উদ্যাপনে। ঢাকার পাঁচতারা হোটেলগুলোয় তাদের সঙ্গে যোগ দেবে অনেক বাঙালি মুসলমানও। খ্রিস্টান পাড়াগুলোতেও সেই উত্সবে শামিল হব আমরা অনেকেই। কেউ কেউ অবশ্য বাঁকা চোখে তাকাবে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খোঁচাও দেবে একটু-আধটু। বাংলাদেশ এখন উন্নতির এক অন্য পর্যায়ে উপনীত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। এ উন্নতি শুধু ভবনের আর সড়কের হলেই চলবে না। উন্নতিটা হতে হবে মেধা আর মননেরও। এবারের বড়দিনে আমরা যারা উত্সবমুখর হব আর যারা হব না, তারা যদি এটুকু মাথায় রাখি, তাহলেই তো দেশটা সত্যি সত্যি বাংলাদেশ হয়ে যেত।

লেখক : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্যসচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

Ads
Ads