বুয়েটে শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আসুক

  • ৪-Dec-২০১৯ ১০:৫০ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ক্যাম্পাসে যতদিন ত্রাসের রাজনীতি বন্ধ না হচ্ছে, র‌্যাগিংয়ের নামে ক্যাম্পাসে চলা অশুদ্ধ সংস্কৃতির অবসান না হচ্ছে, তত দিন একাডেমিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা। ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে শাখা ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী পিটিয়ে হত্যা করলে আন্দোলনে নেমে শিক্ষার্থীরা এমনই মত ব্যক্ত করেন। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে বুয়েট উপাচার্য সাইফুল ইসলাম ১১ অক্টোবর ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এরপর ১৬ অক্টোবর মাঠের আন্দোলনে ইতি টানলেও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেন তারা। 

আন্দোলন শিক্ষার্থীরা যখন আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তখন তাদের ক্ষোভ ছিল- আবরার হত্যার পরপরই কেন উপাচার্য আসেননি? এ সময় তারা না চাইলেও বুয়েট শিক্ষক সমিতির নেতারা উপাচার্যকে প্রশাসন পরিচালনায় ‘অক্ষম’ আখ্যা দিয়ে তার পদত্যাগের দাবি তোলেন। শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় পিছিয়ে যাচ্ছে যেনেও তখন বলেন, ‘আমরা তো অপেক্ষা করতে পারি না যে, আমাদের মধ্য থেকে আরেকটা আবরার আসুক। আমাদের সঙ্গেও ব্যাপারটা হতে পারে। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে বৃহত্তর স্বার্থে আমরা আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব। প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে, আমরা একাডেমিক অসহযোগে আছি।’

অবশেষে আবরার হত্যার দুই মাসের পর শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নিলে তারা ক্লাসে ফিরবেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান। ফলে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাণ ফিরবে এবং র‌্যাগিং বিষয়ে কঠোর অবস্থানে যাওয়ায় ও র‌্যাগিং হলে স্থায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আর কোনো আবরারকে এভাবে প্রাণ হারাতে হবে না বলেও নিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকা-ের ঘটনায় শুরু থেকেই সচেষ্ট থাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। ধন্যবাদ জানাই আমরাও। তিনি মা। মায়ের অবস্থান থেকে একজন আববার হারানোর বেদনায় ছিলেন মূহ্যমান। প্রধানমন্ত্রী আবরারের বাবা ও মাকে ডেকে নিয়ে সাক্ষাৎ করেন। তিনি দ্রুততার সঙ্গে সুষ্ঠু বিচারের কথাও জানান। আবরারের ছোট ভাই ঢাকা ছেড়ে দিতে চাইলে আইনমন্ত্রী তার নিরাপত্তার ব্যবস্থার কথাও জানান। 

এদিকে শিক্ষার্থীদের প্রথম দাবি অনুযায়ী ২১ নভেম্বর শেরে বাংলা হলের ২৬ ছাত্রকে বুয়েট থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়। দ্বিতীয় দাবি অনুযায়ী ২৮ নভেম্বর র‌্যাগিংয়ে অভিযুক্ত আহসানউল্লাহ ও সোহরাওয়ার্দী হলের ২৬ ছাত্রকে হল থেকে বহিষ্কার করে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে দুই হলের ৯ ছাত্রকে হল থেকে আজীবন বহিষ্কারের পাশাপাশি একাডেমিক কার্যক্রম থেকে ৪ থেকে ৭ টার্ম বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া আহসানউল্লাহ হলের চার ছাত্রকে সতর্ক করা হয় আর সোহরাওয়ার্দী হলের ১৭ শিক্ষার্থীকে হল থেকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার ও ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক করা হয়। সর্বশেষ গত সোমবার সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি ও র‌্যাগিংয়ের শাস্তি বিষয়ক নীতিমালা প্রকাশ করেছে বুয়েট কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীদের তিন দাবির মধ্যে কেবল তিতুমীর হলে আগের র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বাকি রয়েছে। এটি হলেই শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই তিতুমীর হলে র‌্যাগিংয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিদফতরের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান। ২৮ ডিসেম্বর থেকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসতে শিক্ষার্থীরা সম্মত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।

বুয়েট কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবি মেনে নেওয়ার পর নিজেদের অবস্থান জানাতে আজ বিকেলে বুয়েটের শহীদ মিনারের পাদদেশে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অন্যতম মুখপাত্র  তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মাহমুদুর রহমান (সায়েম)। সেখানেই ক্লাসে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা। 

শিক্ষার্থীরা তাদের যৌক্তির দাবি দ্রুততার সঙ্গে বুঝে পেয়েছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও দ্রুততার সঙ্গে তা মেনে নিয়েছেন। বর্তমান শিক্ষা কার্যক্রমে কোনো অপরাধ থাকবে না। শুধু বুয়েট নয়, আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবরারকে হারাতে হবে না। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু শিক্ষার আলোই জ¦লবে। 

Ads
Ads