আয়কর দেওয়ার অভ্যাস দেশকে এগিয়ে নেবে

  • ২১-Nov-২০১৯ ১০:৩৭ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

আয়কর প্রদানে বাংলাদেশের বহু মানুষের অনীহা একটি সর্বজনস্বীকৃত বিষয় হলেও এবার তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। ৩৬০ কোটি টাকার কর দিয়েছে ১৮ ব্যাংক। রিটার্ন দাখিলও হয়েছে উল্লেখযোগ্য। আগে আয়কর অনীহার কারণ অনেকটাই দায়ী করা যায় আয়কর ব্যবস্থাকে। এক্ষেত্রে আয়কর বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানিও কম দায়ী নয়। সুনাগরিকরাও আয়কর প্রদানের বিদ্যমান পদ্ধতিতে অস্বস্তি বোধ করতেন, এখনো অনেকেই করেন। আয়কর রিটার্ন ফরমের অনেক কিছুই এখনো অনেকে ভালো বোঝেন না। এ কারণে তাকেও মধ্যস্বত্বভোগী কর আইনজীবীদের শরণাপন্ন হতে হয়। অনেক সময় কর আইনজীবীরা কাগজপত্র ঠিক করতে কর অফিসের বাড়তি খরচের দোহাই দেন।  তবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে আয়কর ব্যবস্থায় গতি আনার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পদ্ধতিগত জটিলতা এখনো পুরোপুরি দূর না হলেও দিনদিন তা উন্নতির পথে। 

২০১৭ সালের আগে আয়করের বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের ভয়ভীতি ছিল। মানুষ সহজে কর দিতে চাইতেন না। তাদের বিশ্বাস ছিল, কর দিতে এলেই এনবিআর কর্মকর্তারা ধরবেন, হয়রানি করবেন। বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানও স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে বেশ কিছু উদ্যোগের কারণে করদাতাদের সেই মনোভাবের পরিবর্তন হয়েছে। ভয়ভীতি দূর হয়েছে। এখন অনেকেই স্বপ্রণোদিত হয়ে কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। করদাতাদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো হয়েছে। তাদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এ কারণে কর প্রদানে সক্ষম এ রকম অনেক ব্যক্তি এখন এগিয়ে আসছেন। 

২০০৮ সালে দেশে প্রথম আয়কর দিবস পালন শুরু হওয়ার পর বহু করদাতা কর বিষয়ে সচেতন এবং উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। আয়কর প্রদানের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে আয়করদাতার সংখ্যাও। এই মেলার মূল উদ্দেশ্য, করদাতা বাড়িয়ে দেশের উন্নয়নের জন্য সরকারের আয় বৃদ্ধি করা। গত কয়েক বছরে সরকারের আয় যেমন বেড়েছে তেমনি অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতায় এগিয়ে গেছে দেশ। আয় বাড়ায় নিজস্ব অর্থায়নে বাজেট প্রণয়নসহ পদ্মাসেতুর মতো বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০১২ সালে দেশে আয়কর মেলা চালু হওয়ার পর প্রায় ৪৫ লাখ নাগরিক সেবা নিয়েছেন; যাতে এনবিআরের আয় হয়েছে সাড়ে দশ হাজার কোটি টাকার বেশি। মেলার প্রাঙ্গণে করদাতাদের ভিড় ক্রমশ উপচেপড়ার অবস্থা দেখা গেছে। মেলায় করদাতারা আয়কর রিটার্ন পূরণ করে জমা দেওয়া ও প্রযোজ্য কর পরিশোধ করতে পারছেন। নতুন করে করের খাতায় নিবন্ধিত হয়ে কর শনাক্তকরণ নম্বর (ই-টিআইএন) নেওয়াসহ সব ধরনের কর সেবা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে মেলায়। ঢাকাসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহরে এ মেলা চলে সপ্তাহব্যাপী। ২০১৮ সালে আয়কর রিটার্ন দাখিল করার সংখ্যা ছিল ২০ লাখ। সে বছর ই-টিআইএনধারীর সংখ্যা ৩৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৫০ লাখে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। 

স্বীকার করতেই হবে, নাগরিকদের মধ্যে আয়কর দেওয়ার প্রবণতা আগের চেয়ে বেড়েছে। তারপরও কর প্রদানের ব্যাপার জনগণের মধ্যে এখনো অনাগ্রহী হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা সঙ্গত। আয়কর বাড়ানোর জন্য এনবিআর এবং আয়করদাতাদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক জরুরি। 

এবার সপ্তাহব্যাপী আয়কর মেলায় ১৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ৩৬০ কোটি টাকা কর দিয়েছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, মেলার ষষ্ঠ দিন মঙ্গলবার আয়কর সংগ্রহ হয় ৩৫৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩৪ টাকা। এদিন মেলা প্রাঙ্গণ থেকে সেবা নেন দুই লাখ ৫২ হাজার ৮১৫ জন। এর মধ্যে রিটার্ন দাখিল করেন এক লাখ ১৯ হাজার ১৪৫ জন। আর পাঁচ হাজার ৩২৫ জন নতুন ই-টিআইএন নিবন্ধন করেন। এর মাধ্যমে মেলার প্রথম ছয় দিনে আয়কর আদায় হয়েছে দুই হাজার ১৬ কোটি ৪৫ লাখ ২১ হাজার ১২০ টাকা। মেলা প্রাঙ্গণ থেকে এই ছয় দিনে সেবা নেন ১৫ লাখ ১২ হাজার ৫৯২ জন। এর মধ্যে রিটার্ন দাখিল করেছেন পাঁচ লাখ ৩৯ হাজার ৯১০ জন। আর ২৬ হাজার ৮৩১ জন নতুন ই-টিআইএন নিবন্ধন করেছেন। গত বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার কাছে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), সিইও এবং প্রতিনিধিরা চেক প্রদান করেন। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যাংক খাতের প্রতিষ্ঠান-আইএফসি ব্যাংক আয়কর দেয় ৫০ কোটি টাকা। ট্রাস্ট ব্যাংক ২৫ কোটি, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ১০ কোটি, মধুমতি ১০ কোটি, যমুনা ব্যাংক ১০ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ২০ কোটি, ডাচ্বাংলা ব্যাংক ২০ কোটি, প্রাইম ব্যাংক ১০ কোটি, সিটি ব্যাংক ২০ কোটি টাকা, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ১০ কোটি, ঢাকা ব্যাংক ১৫ কোটি, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ১০ কোটি, ব্যাংক এশিয়া ১০ কোটি, পূবালী ব্যাংক ১০ কোটি, উত্তরা ব্যাংক, ১০ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ১০ কোটি, ব্র্যাক ব্যাংক ১০ কোটি টাকার চেক প্রদান করে। এর আগে মেলার প্রথমদিনে ১০০ কোটি টাকা আয়কর দিয়েছিল বেসরকারি ইসলামী ব্যাংক। সব মিলিয়ে ১৮ ব্যাংক মেলায় ৩৬০ কোটি টাকা দিয়েছে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মেলায় সাধারণ বীমা করপোরেশন ১০ কোটি, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ২০ কোটি, বেক্সিমকো লিমিটেড দুই কোটি এবং হেলথ কেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস এক কোটি টাকা কর দিয়েছে। মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন মেলায় আয়কর দিয়েছে ১৫০ কোটি এবং ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো কর দিয়েছে ৫০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২৪টি ব্যাংক বীমা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান মেলায় কর দিয়েছে ৫৯৩ কোটি টাকা।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আয়কর মেলায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে করদাতারা কর জমা দিচ্ছেন। আয়কর মেলাকে তারা নির্ভরযোগ্য বলে মনে করেন। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, মেলার মতো কর অঞ্চলেও নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে কর দিতে পারবেন। কোনো প্রকার হয়রানি হবে না। যদি কেউ হয়রানি করতে চায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।’ ৩০ নভেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিলের অনুরোধ জানিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ে আয়করের রিটার্ন না দিলে পরবর্তীতে জরিমানা দিতে হবে।’ মেলায় আয়কর দাতাদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মেলায় যেসব করপোরেট প্রতিষ্ঠান আয়কর দিয়েছে তাদের করের পরিমাণ আরো বেশি। কিন্ত অতি অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে তারা কর অংশ জমা দিয়েছে। এজন্য আমরা তাদের স্বাগত জানাই।’ আগামীতেও তারা এ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে প্রত্যাশা করেন এনবিআর চেয়ারম্যান।

মূলত ভয়ভীতি দেখিয়ে আয়কর আদায়ের চেষ্টা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সফল হয় না। কর প্রদান পদ্ধতি আরো সহজ এবং যুগোপযোগী হলে করদাতার সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হবে। দেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য যা হবে ইতিবাচক। 

Ads
Ads