ড. ইউনুসের কারনেই বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতুর অর্থায়ন বন্ধ করে: প্রধানমন্ত্রী

  • ১৪-Oct-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কারণে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ করেছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রোববার (১৪ অক্টোবর) পদ্মা সেতু প্রকল্প পরিদর্শনে গিয়ে মাওয়ায় এক সুধি সমাবেশে তিনি দেশের অন্যতম বড় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নানা বাধা-বিপত্তিতে পড়ার কথা তুলে ধরেন।

এর আগে সকালে মাওয়ায় পৌঁছে তিনি সেতুর নামফলক উন্মোচনসহ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কাজের উদ্বোধন করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতুর মাওয়া টোল প্লাজার পাশের গোল চত্বরে আয়োজিত সমাবেশে অংশ নেন।

সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে শেখ হাসিনা এই সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে সৃষ্টি হওয়া জটিলতার প্রসঙ্গটি আবারও তোলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ম অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ব ব্যাংকসহ পশ্চিমা বিশ্বের কিছু নেতা পদ্ম সেতু নির্মাণে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নের কথা থাকলেও সংস্থাটি দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুললে তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে টানাপড়েনের সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে সরকার বিশ্ব ব্যাংককে বাদ দিয়েই কাজটি শুরু করে।

পদ্মায় বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু নির্মাণে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন আটকাতে মুহাম্মদ ইউনূসের ‘ষড়যন্ত্র’ ছিল বলে প্রধানমন্ত্রী আগেও বলেছেন।

মাওয়ার সমাবেশে তিনি আবারো সেই প্রসঙ্গ টেনে বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আমি সমর্থন দিয়েছি। গ্রামীণ ফোনের লভ্যাংশ গ্রামীণ ব্যাংক পাওয়ার কথা ছিল। সেখান থেকে দরিদ্র মানুষের জন্য সেই টাকা ব্যয় করার কথা ছিল। কিন্তু ফোনের কোনো লভ্যাংশ গ্রামীণ ব্যাংক পায়নি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইন অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির বয়সসীমা ৬০ বছর হলেও ড. ইউনূসের বয়স ৭০ বছর হয়ে গিয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে তাকে প্রস্তাব দেওয়া হলো এমডি পদ ছেড়ে দিয়ে উপদেষ্টা হিসেবে তিনি যেন গ্রামীণ ব্যাংকে থাকেন। কিন্তু তিনি সেটা না মেনে সরকার ও বাংলাদেশে ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করে দিলেন।

ড. ইউনূস প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, কোনো অনুমোদন ছাড়াই এমডি ছিলেন এবং সরকারি বেতনও নিতেন। এটা সম্পূর্ণ ইলিগাল। তাকে আমরা কখনও অসম্মান করতে চাইনি। অর্থমন্ত্রী ও গওহর রিজভী ইউনূসের সঙ্গে দেখা করে তাকে এমিরেটাস অ্যাডভাইজার করার প্রস্তাব দেন। তিনি রাজি না হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করলেন দুইটা। একটা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে আরেকটা সরকারের বিরুদ্ধে। কোর্ট চাইলে সেই বেতন ফেরত নিতে পারত।

এমডি পদ হারিয়ে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস পদ্মা সেতুর অর্থায়ন আটকানোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন তাও আবার বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, হিলারি ক্লিন্টন তাকে এমডি রাখতে ফোন করেন। টনি ব্লেয়ার ছিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী । তার স্ত্রী শেলি ব্লেয়ার ফোন করলেন। মামলায় তিনি হেরে গেলেন। পশ্চিমা দেশের অনেক রাষ্ট্রদূত এসে আমাকে হুমকি দিত। ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যংক থেকে সরানো হলে পদ্মা সেতু হবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি।

পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতির যে অভিযোগ বিশ্ব ব্যাংকের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছিল সে প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক পদ্মাসেতুর টাকা বন্ধ করে দিয়েছিল, যার পেছনে ছিলেন ড. ইউনূস। তারা দুর্নীতির অভিযোগ তুলল, আমি বললাম আমি প্রমাণ চাই। তারা কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। আমার বিরুদ্ধে, আমার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বার বার তারা তদন্ত করল। কিন্তু কোনো প্রমাণ পেল না। স্টেট ব্যাংক আমার ছেলে জয়কে তিনবার ডেকে নিয়ে শাসিয়েছে। এটা নিয়ে মামলা হয়েছে। আমরা প্রমাণ করেছি। সমস্ত অভিযোগ ভুয়া, মিথ্যা। কোনো দুর্নীতির চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, জনগণের ওপর আমার ভরসা ছিল। সেই ভরসা নিয়েই সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করেছি। অনেক বাধা বিপত্তি মোকাবেলা করতে হয়েছে।নিজস্ব অর্থায়নে করছি। কিন্তু এর পেছনে যে অপমান যে নির্যাতন আমাদেরকে ভোগ করতে হয়েছে, এর পেছনে দেশের কিছু লোক জড়িত। যারা গরীবকে টাকা দিয়ে সুদ খায় তারা এর চেয়ে বেশি কী করতে পারে?

শেখ হাসিনা বলেন, নিজেদের অর্থায়নে পদ্মাসেতু করার ঘোষণা দেওয়ার পর দেশের মানুষ আমাকে সাহায্য করেছে। অনেকেই মনে করতো বাংলাদেশ একটি দুর্যোগের দেশ, তাদের পক্ষে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ছাড়া পদ্মাসেতু করা সম্ভব নয়। 

তিনি বলেন, আমি একটা কথা বিশ্বাস করি- বাংলার জনগণের ওপর আমার ভরসা ছিলো। সেটা নিয়েই আমি এ প্রকল্পের কাজ শুরু করেছি। এখন পদ্মাসেতুর ৬০ শতাংশ কাজ হয়েছে। নদী শাসন করে সেতুকে ছোট করতে চাইনি। যতটুকু আছে সেটাই করা হচ্ছে। এখন ৭৫০ মিটার সেতু দৃশ্যমান হয়েছে। এটা কঠিন কাজ। যারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের ধন্যবাদ জানাই।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জাতির পিতা আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করা, স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত করা, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা আমার একমাত্র লক্ষ্য, আমার একমাত্র চাওয়া। আল্লার কাছে দোয়া করবেন, এই পদ্মাসেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে- বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যারা নষ্ট করতে চেয়েছিল, বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে যারা বাধা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের দারিদ্র্যসীমা অতিক্রমের পথ যারা বাদ বন্ধ করতে চেয়েছিল তাদের উপযুক্ত জবাব আমরা দেবো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজে যারা সম্পৃক্ত তাদের ধন্যবাদ। যারা এ কাজের জন্য নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে দিয়েছেন আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ, যারা জমি দিয়েছেন তাদের আমরা প্লট বরাদ্দ দিয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই গর্বের সেতু নির্মিত হচ্ছে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও উপকরণ দিয়ে। দ্বিতল পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে স্টিল ও কংক্রিট স্ট্রাকচারে। বহুমুখী এই সেতুর ওপরের ডেক দিয়ে যানবাহন এবং নিচের ডেক দিয়ে চলাচল করবে ট্রেন। এর নির্মাণ কাজ শেষ হলে ঢাকার সাথে সড়ক ও রেলপথে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ১৯টি জেলার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, পদ্মা সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের সুবিধা বাড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটবে এবং তাদের জীবনযাত্রার উন্নয়ন হবে। জাতীয় অর্থনীতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১.২% বৃদ্ধি এবং প্রতি বছর ০.৮৪% দারিদ্র্য নিরসন হবে। ৬.১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘে্যর এ সেতুটির সর্বশেষ পঞ্চম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে মূল অবকাঠামোর ৭৫০ মিটার বর্তমানে দৃশ্যমান হয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের মূল সেতুর ভৌত অগ্রগতি ৭০%।

পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্পের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন ঘোষণা করে তিনি বলেন, চীনের দক্ষ ও অভিজ্ঞ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ‘চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড’ নির্ধারিত সময়ে গুণগতমান বজায় রেখে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করবে বলে আমি আশাবাদী। দেশের আস্থার প্রতীক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স এবং সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এ প্রকল্পে পরামশর্কের দায়িত্ব পালন করছে। আমি আশা করি, পদ্মা বহুমুখী সেতু চালুর দিন থেকেই সড়কে যানবাহনের পাশাপাশি ট্রেন চলাচল করবে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা গ্রামে গ্রামে মানুষের সাহায্য দিচ্ছি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সহায়তা দিচ্ছি। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং যাবে। আমরা ডেল্টা প্লান-২১০০ প্রণয়ন করবো।

এর আগে, রবিবার সকাল ১১ টা ১৫ মিনিটের সময় প্রধানমন্ত্রী মাওয়ার অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হয়ে নামফলক উন্মোচন করেন। পদ্মা সেতুর চলমান কাজের উদ্বোধনের পাশাপাশি রেল সংযোগের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, এক্সপ্রেসওয়ে পরিদর্শন ও নদী শাসন প্রকল্পেরও উদ্বোধন করেন।

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক, সেনাবাহিনী প্রধান আব্দুল আজিজ, মুন্সীগঞ্জ ২ আসনের সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন, মুন্সীগঞ্জ ৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, আওয়ামী লীগ জেলা সভাপতি মো. মহিউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান, প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্থানীয় নেতারা।

/ই

Ads
Ads