ঠিকাদারি কাজ বাটোয়ারায় সতর্কতা এগিয়ে নেবে দেশকে

  • ৬-Nov-২০১৯ ১০:৩৭ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

এক ঠিকাদার একের পর এক কাজ পান, বাকিরা বসে থাকেন। জি কে শামীম তার উদাহরণ। একই সঙ্গে ৫৩ প্রকল্পের কাজ করে যাচ্ছিলেন তিনি। যার অধিকাংশই মেগা প্রকল্প। এখন বন্দি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব কাজ গেছে থেমে। তবে বাইরে থাকলেও কি উপকারে আসতো? একই ব্যক্তি বারবার ও একাধিক কাজ পেলে কাজের মান কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিশেষ করে ঠিকাদাররা এখন যে মানসিকতার মধ্য দিয়ে পার করছেন, সেই মানসিকতায় তাদেরকে ধীরে ধীরে অহঙ্কারী ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে দেখা যায়। ফলে প্রধানমন্ত্রীও একই ঠিকাদার যেন বারবার কাজ না পায় সেদিকে নজর দিতে বলেছেন। গত মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা শেষে প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, দরপত্র এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে নির্দিষ্ট কোনো ঠিকাদার বা বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ না পায়। নতুন ঠিকাদার যাতে কাজ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য বিদ্যমান পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর ২০০৮) সংশোধনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। 

জি কে শামীমের মালিকানাধীন জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড গণপূর্ত অধিদফতরের ৫৩ প্রকল্পের কাজ পেয়েছিল। এর মধ্যে ১৩টি একক ও ৪০টি যৌথভাবে কাজ পান তিনি। এসব কাজের মধ্যে ২০১৪ সালে শেষ হওয়ার কথা এমন প্রকল্পের কাজও অসমাপ্ত রয়েছে। ২০১৯ সালে শেষ করতে হবে এমন একটি প্রকল্পের অগ্রগতি শূন্য শতাংশ। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মধ্যে গত ২০ সেপ্টেম্বর শামীমের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব তাকে আটক করে। অস্ত্র, মাদক ও মুদ্রাপাচার আইনে তিনটি মামলায় আছেন জি কে শামীম কারাগার। শামীম গ্রেফতার হওয়ার পর তার হাতে থাকা বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ থমকে যায়। এসব প্রকল্পের কাজ শুরু করার জন্য আইনগত ব্যবস্থা নিতে গত ৯ অক্টোবর গণপূর্ত অধিদফতরকে চিঠি দেয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

গণপূর্ত অধিদফতরের ৫৩টি প্রকল্পের নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে জি কে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড। এসব প্রকল্পের চুক্তিমূল্য চার হাজার ৫৫০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এসব প্রকল্পের ২৪টির অনুমোদন দিয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। আটটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছেন গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী। এছাড়া অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী তিনটি, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছেন। বাকি ১৭টি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। জিকেবির ৫৩টি প্রকল্পের মধ্যে ২০১৪ সালে একটি, ২০১৬ সালে দুটি, ২০১৭ সালে দুটি, ২০১৮ সালের তিনটি, ২০১৯ সালে ১৯টি, ২০২০ সালে ২৩টি এবং ২০২১ সালে তিনটি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। এর মধ্যে ২০১৮ সাল পর্যন্ত যে ৮টি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা, তার মধ্যে দুটির কাজ শতভাগ শেষ হলেও ছয়টির কাজ বাকি রয়ে গেছে। আর ২০১৯ সালে শেষ হওয়ার কথা এমন ১৯টি প্রকল্পের মধ্যে ১৫টি প্রকল্পের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে। এছাড়া ১৫ অক্টোবর দুটি, ১৭ অক্টোবর একটি এবং ২৪ নভেম্বর একটি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। এসব প্রকল্পের অগ্রগতি যথাক্রমে ১২, ১৫, ৩৫ ও ১৮ শতাংশ। সেগুলোও সময়মত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

এসব বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন বলেছিলেন, ‘নানা কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হতে পারে। বাস্তবায়নকারী সংস্থা কাজ শেষ করার জন্য তাগাদা দেবে। কিন্তু আমি হয়ত তাদের সাইট বুঝিয়ে দিতে পারি নাই। যাদের নকশা দেওয়ার কথা তারা হয়তো নকশা দিতে পারে নাই। অথবা যে অথরিটির কাজ, তারা টাকা দিতে পারে নাই।’ প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরির ফলে ব্যয় বেড়েছে কি না- সেই তথ্য দিতে পারেননি গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী। ‘এ ব্যাপারে পুরোপুরি বলা সম্ভব না। সে কতটুকু কাজ করেছে, কতটুকু বাকি আছে। এসব হিসাব নিকাশের ব্যাপার আছে। তাছাড়া অনেকগুলো প্রকল্প, না জেনে বলা কঠিন।’ বলেন তিনি।  গত মঙ্গলবার নতুন করে ৪ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকার ছয়টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে গত মঙ্গলবারের একনেকের সভায়।

অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভৌত সুরক্ষা নির্মাণ; যশোর (রাজারহাট)-মনিরামপুর-কেশবপুর-চুকনগর আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন; ফেনী-সোনাগাজী-মুহুরী প্রকল্প সড়কের ৩০তম কিলোমিটারে মুহুরী সেতু এবং বক্তারমুন্সী-কাজিরহাট-দাগনভূঁঞা সড়কের ১৩তম কিলোমিটারে ফাজিলাঘাট সেতু নির্মাণ; কক্সবাজার জেলার একতাবাজার থেকে বানৌজা শেখ হাসিনা ঘাঁটি পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন; আগারগাঁওয়ের শেরেবাংলা নগরে পর্যটন ভবন নির্মাণ (১ম সংশোধিত) এবং সিলেট জেলার সিলেট সদর ও বিশ্বনাথ উপজেলায় দশগ্রাম, মাহতাবপুর ও রাজাপুর পরগনা বাজার এলাকা সুরমা নদীর উভয় তীরের ভাঙন থেকে রক্ষা প্রকল্প। একনেকের এই সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একই ব্যক্তিকে বারবার কাজ না দিতে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে পিপিআর ২০০৮ সংশোধনের নির্দেশও দিয়েছেন। দূরদর্শী বঙ্গবন্ধুকন্যার নির্দেশ পালনের মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজ বাটোয়ারায় সতর্কতা এগিয়ে নেবে দেশকে।

Ads
Ads