নাইমুল রাহাতের মৃত্যু: সচেতন চোখ অচেতন হয় কীভাবে?

  • ৩-Nov-২০১৯ ১০:৩০ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

সমাজের দর্পণ একটি পত্রিকা। স্বচ্ছ আয়নার সামনে দাঁড়ালে প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে যেমন, তেমনই দৈনিক পত্রিকার বৈশিষ্ট্য। তাই এতদসংশ্লিষ্ট আয়োজন সব দিক দিয়েই সতর্কতা অবলম্বন করা হবে এটাই সত্য। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে নাইমুল আবরার রাহাতের মৃত্যু প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। অনেকেই ‘দৈনিক প্রথম আলো’র মতো প্রথম শ্রেণির একটি জাতীয় দৈনিকের ‘কা-জ্ঞানহীনতা’কে সর্বোচ্চ নিন্দা জানিয়ে নানারকম শব্দের ব্যবহার করেছেন। অধিকাংশের প্রশ্ন একটাইÑ ‘ সচেতন চোখ কীভাবে অচেতন হয়?’

রাজধানীর রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল ও কলেজ মাঠে কিশোর আলোর বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নবম শ্রেণির ছাত্র রাহাতের মৃত্যুর ঘটনায় আয়োজক কমিটির সমালোচনা করেছেন অনেকেই। যদিও ‘কিশোর আলো’ সম্পাদক আনিসুল হক সে-রাতেই ১টা ৩৫ মিনিটে এ দুর্ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ফেসবুকে। যেখানে তিনি শোকার্ত পরিবারের সামনে তার অবস্থা ও পরিস্থিতি বেদনার উদ্রেক করে এমন শব্দপ্রয়োগে তুলে ধরেছেন এবং পরে সম্পূর্ণটাই শুধু একটি দুর্ঘটনা বোঝানো যায় এমনভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে গেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘নাইমুল আবরারের আব্বা-আম্মা এবং শোকার্ত পরিবারের সঙ্গে এতক্ষণ হাসপাতালে ছিলাম। এইমাত্র ফিরলাম।

হাসপাতালে শোকার্ত পরিবারের সামনে বসে আমি স্ট্যাটাস লেখার মতো অবস্থায় ছিলাম না। যা লিখেছি, তাতে বারবার ভুল হচ্ছিল, বানান ভুলও ছিল। কিশোর আলোর অনুষ্ঠানে এসে- দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেছেন, আমার জন্যে এর চেয়ে শোক, দুঃখ, পরিতাপের বিষয় আর নেই। নাইমুল আববার ঢাকা রেসিডেন্সিয়ালের ক্লাস নাইনের ছাত্র ছিল। ভালো ছাত্র ছিল। ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল। তারা দুই ভাই। বড়ভাই প্রকৌশলী, জার্মানিতে থাকেন। নাইমুল আবরারের আব্বা আগে সৌদি আরবে থাকতেন। এখন ফেসবুকে কতগুলো প্রচারণা দেখছি। আমি আমার জানা দেখা কথাগুলো বলি। আমাকে চারটার পর জানানো হয়, একজন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছেন। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। আরো খানিক পরে জানানো হয়, আহত ভদ্রলোক সম্ভবত চট্টগ্রাম থেকে আসা। অনুষ্ঠান শেষ হয় ৪টা ৪০ কি ৪টা ৪৫। পাঁচটার পর আমি জানতে পারি, আহত জন মারা গেছেন। মানে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার ১৫/২০ মিনিট পরে মৃত্যুর খবর আমি পাই। তারও আধ ঘণ্টা পর আমাকে জানানো হয়, যিনি মারা গেছেন, তিনি ক্লাস নাইনের ছাত্র রেসিডেসিন্সয়ালের ছাত্র। কাজেই যারা বলছেন, নাইমুল আবরার মারা যাওয়ার খবর গোপন করে অনুষ্ঠান চালিয়ে যাওয়া হয়েছে, তারা ঠিক বলছেন না। শেষ শিল্পী অর্ণব ওঠার আগে দুর্ঘটনা সম্ভবত ঘটেনি। সম্ভবত বলছি, কারণ একেকজন একেকটা কথা বলছেন।

দ্বিতীয়ত, ইউনিভার্সাল হাসপাতাল আমাদের স্পন্সর নয়। তারা আমাদেরকে জরুরি মেডিকেল সার্ভিস দেওয়ার জন্য ওখানে ছিলেন। দুজন এফসিপিএস ডাক্তার ছিলেন। একটা অ্যাম্বুলেন্স রেডি করা ছিল। সেই অ্যাম্বুলেন্সেই নাইমুল আববারকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কেন তাকে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নেওয়া হলো না, এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য আমার জানা নেই। তবে আমরা যে মেডিকেল ক্যাম্প, টিম, অ্যাম্বুলেন্স রেডি রেখেছিলাম, সেটা ভালোর জন্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তা থাকা সত্ত্বেও নাইমুল আববার আমাদের ছেড়ে চলে গেল। আমরা স্তব্ধ, বিধ্বস্ত। শোকাকুল।’
কিন্তু এতেই কি সব ঢেকে যায়! গত শুক্রবার বিকেলে বিদ্যুতায়িত হলে তাকে মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রাহাতের নিহতের ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন তার বাবা মজিবুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘আমার ছেলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আহত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্দেশ্যমূলকভাবে কালক্ষেপণ করে পাশে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে না নিয়ে মহাখালীতে ইউনিভার্সাল হাসপাতালে নেয়। সেখানে উপযুক্ত চিকিৎসা না পেয়ে কিছুক্ষণ পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ছেলের লাশ ময়নাতদন্ত না করে আমাকে দিয়ে দেয়। বাবার কাঁধে ছেলের লাশ কত যে ভারী, তা একমাত্র আমিই বলতি পারি। এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’ মজিবুর রহমান আরো বলেন, ‘অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল ৮টায়। রাহাত বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় বিকেল ৪টায়, তার মৃত্যু হয় সন্ধ্যা ৭টায়। খবর মোবাইল ফোনে তার সহপাঠী লাভিব আমাদের জানায়। আমরা হাসপাতালে গিয়ে তার লাশ দেখতে পাই।’

রাহাতের মৃত্যুর খবরে ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে গত শনিবার ক্যাম্পাসে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা সেখান থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সিসিটিভির ফুটেজ প্রদানসহ চার দফা দাবি তুলে ধরেন। অন্য দাবিগুলো হচ্ছে- অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে লিখিত বক্তব্য দিতে হবে, গাফিলতির বিষয়টি স্বীকার করে পত্রিকায় বিবৃতি দিতে হবে এবং তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ছাত্রদের হাতে পৌঁছাতে হবে। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্যে এদিন তদন্ত কমিটি করেছে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ কর্তৃপক্ষ। রাহাতের মৃত্যুর ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। এদিকে আবরারের মৃত্যুর ঘটনায় ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণে চেয়ে প্রথম আলোর সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্টদের লিগ্যাল নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কলেজটির সাবেক শিক্ষার্থী ওবায়েদ আহমেদের পক্ষে গতকাল রোববার রেজিস্ট্রি ডাকযোগে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাইজুল্লাহ ফয়েজ নোটিসটি পাঠিয়েছেন।

দৈনিক প্রথম আলোর প্রকাশক ও সম্পাদক, কিশোর আলোর সম্পাদক, তথ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর এ নোটিস পাঠানো হয়েছে। তবে ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রথম আলোর প্রকাশক, সম্পাদক এবং কিশোর আলোর সম্পাদককে দিতে বলা হয়েছে। নোটিসে ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের অনুষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তথ্য মন্ত্রণালয় সচিব, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সচিব এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়া নোটিসপ্রাপ্তির তিনদিনের মধ্যে প্রথম আলোর প্রকাশক, সম্পাদক এবং কিশোর আলোর সম্পাদকের কাছে ঘটনার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। ওই ঘটনায় ক্ষতিপূরণের ১০ কোটি টাকা নিহত আবরার রাহাতের পরিবারকে হস্তান্তর করতে বলা হয়েছে। তবে ক্ষতিপূরণ না দিলে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলেও নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে।

Ads
Ads