যত্রতত্র গ্যাস সিলিন্ডারের সরবরাহে বীভৎস মৃত্যু কাম্য নয়

  • ৩১-Oct-২০১৯ ১১:১৭ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

রাজধানীর মিরপুরের রূপগঞ্জ। সময় তখন বিকেল চারটা হবে। বিকট আওয়াজে ফেটে যায় শিশুদের জন্য রঙবেরঙের গ্যাস বেলুন ফোলানোর সিলিন্ডার। হাইড্রোজেনের আগুনে ঘটনাস্থলেই ঝরে যায় ৫ শিশুর প্রাণ। হাসপাতালে ঝরে আরও দুই শিশু মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে। আহতদের কারও হাত নেই। কারও পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ে ভুড়ি। মর্মান্তিক ঘটনায় মূহ্যমান হয়ে পড়েন এলাকাবাসী। ভারি হয়ে ওঠে হাসপাতাল অঙ্গন। গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘আহত অন্যদের মধ্যে মিজান, জুয়েলের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। অন্য তিনজনের শারীরিক অবস্থা কিছুটা ভালোর দিকে, তবে তারা আশঙ্কামুক্ত বলা যাবে না।’ সেক্ষেত্রে আরও প্রাণহানীর আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু শিশুদের এই খুশির বেলুন ফোলাতে যে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার হয়েছে তা কারা কীভাবে সরবরাহ করেন? এর জন্য রয়েছে নানা বিধি নিষেধ। সেগুলো কি মানা হয়েছিল এই গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহের সময়?

এই একটি সিলিন্ডার বিস্ফোরণ আমাদেরকে কঠিন থেকে কঠিনতর সতর্কতা অবলম্বনের কথা জানিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু কোথায় এই গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান? নিরাপদ হিলিয়ামের পরিবর্তে ‘নিষিদ্ধ’ হাইড্রোজেন ব্যবহারের কারণে বছরের পর বছর ঘটছে গ্যাস বেলুনের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। এতে বাড়ছে শিশুদের প্রাণহানিও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০ বছর আগে বিশ্বের অন্যান্য দেশে হাইড্রোজেন দিয়ে বেলুন ফোলানোর ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ দেশে প্রক্রিয়া বন্ধ করার ব্যাপারে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তারা বলছেন, শিশুদের সবচেয়ে পছন্দের এই খেলনাপণ্য এই বিপজ্জনক পদ্ধতিতে ফোলানো নয়।
শিয়ালবাড়ি এলাকায় স্ত্রী রূপালি আর দুই ছেলেকে নিয়ে থাকতেন রিকশাচালক জুয়েল সরদার (২৯)। প্রতিদিনের মতো গত বুধবার বিকেলবেলা রিকশা চালাতে বের হন। রূপনগর ১১ নম্বর সড়কে একজনকে গ্যাস বেলুন বিক্রি করতে দেখে জুয়েল সরদারের ইচ্ছে হয়, ছোট ছেলে জিসানের জন্য একটি বেলুন কিনবেন। বেলুন বিক্রেতার কাছে যেতেই বিকট শব্দে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। মুহূর্তের সব ইচ্ছে মিলিয়ে যায় জুয়েলের। সিলিন্ডারের টুকরো লেগে বাম হাত ভেঙে গেছে তার।

চিকিৎসা নিচ্ছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসকের মতে জুয়েলের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এমনই  জুয়েলসহ রূপনগরে বেলুনের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় তিন শিশুসহ আহত ছয়জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তারা হলেন শিশু মিজান (৬), জনি (৯) সিয়াম (১১), গৃহবধূ জান্নাত বেগম (২৬), রিকশাচালক জুয়েল ও বেলুন বিক্রেতা আবু সাইদ (৩০)। এদের মধ্যে ৯ বছর বয়সী জনি মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছোট বোন তাসনিয়ার জন্য বেলুন কিনতে যায়। এরপরই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে জনি। গুরুতর আহত জনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি বিভাগের অধীনে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে। সুলতান মিয়া পরিবার নিয়ে রূপনগরের ১১ নম্বর সড়ক সংলগ্ন একটি বস্তিতে থাকেন। জনির মা পারভিন আক্তার বলেন, তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে জনি ছোট বোন তাসনিয়ার জন্য বেলুন কিনতে গিয়েছিল। বেলুনের গ্যাস সিলিন্ডারটি বিস্ফোরিত হলে জনির মুখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে।

এমনকি ওর চোখেও আঘাত লাগে। আহত শিশু সিয়ামের মামা আরিফ হোসেন জানিয়েছেন, সিয়ামের বাবা তোফাজ্জল হোসেন রূপনগর এলাকায় কাঁচামালের ব্যবসা করেন। পরিবার নিয়ে থাকেন মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনে। সিয়াম তার বাবার কাছে গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে এই দুর্ঘটনার শিকার হয়। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার শরীরের ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। বেলুন বিক্রেতা আবু সাইদের গ্রামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কাঠালিয়াপাড়া গ্রামে। মিরপুরের সাড়ে এগারো নম্বর এলাকায় বসবাস করেন। বিস্ফোরণে তার বাম হাত কবজি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বাম পায়ের ঊরুতে ক্ষত রয়েছে। সাইদ জানান, তিনি বেলুনের ব্যবসা ১০-১২ দিন ধরে করছেন। এর আগে তিনি দরজির কাজ করতেন। সাইদের বিরুদ্ধে রূপনগরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় মামলা করেছে পুলিশ। পুলিশি প্রহরায় ঢাকা মেডিকেলের ক্যাজুয়ালটি বিভাগে তার চিকিৎসা চলছে। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে গত বুধবার ঘটনাস্থলেই রমযান (৪), নূপুর (৭), শাহিন (৯), ফারজানা (৬), রুবেল (৭) ও রিয়া (৭)। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘উন্নত বিশ্বে হাইড্রোজেন দিয়ে বেলুন ফোলানো বন্ধ হয়েছে ২০০ বছরের আগে। হিলিয়াম আবিষ্কারের পর নিরাপদ এই গ্যাস দিয়েই তারা বেলুন ফোলায়। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও এই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়নি।’ আসলে এসব যাদের দেখার কথা, তারা দেখছেন না বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এদিকে, কারখানায় হাইড্রোজেন তৈরি করে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে সরবরাহ করার কথা থাকলেও অনেক সময় সিলিন্ডারের ভেতরেই হাইড্রোজেন তৈরি করে বেলুনে গ্যাস ভরা হয়। এতে সিলিন্ডার ফেটে গিয়ে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ধরনের গ্যাস তৈরি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বলে জানিয়েছে বিস্ফোরক পরিদফতর। এই সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বিষয়ে পরিদফতরের প্রধান পরিদর্শক সামসুল আলম  বলেন, ‘এটি আসলে সিলিন্ডার নয়, গ্যাস প্রডিউসিং রিয়েক্টর। গ্যাস সিলিন্ডরকে মডিফাই করে সিলিন্ডারের ভেতরেই হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করার পদ্ধতি বানিয়েছে। সিলিন্ডারের ভেতরে কস্টিক সোডা ও অ্যালুমিনিয়াম পাউডার দিয়ে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করতে থাকে। এর সাহায্যে বেলুন ফোলাতে থাকে। এরমধ্যে কিছুক্ষণ ফোলানোর পরে কোনো কাস্টমার না থাকলে সাধারণত সিলিন্ডারের নবটি বন্ধ করে রাখে। এই সময়ের মধ্যে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি হতে থাকে। এতে সিলিন্ডারের ওপর গ্যাসের চাপ বাড়তে থাকে। আর তাতে ভেতরে ক্ষয় হতে থাকে। এক পর্যায়ে গ্যাসের চাপ বেশি বেড়ে গেলে সিলিন্ডারটি গরম হয়ে নরম হয়ে যায়।

এই অবস্থায় যখন আবার বেলুনে গ্যাস ভরার জন্য নব খোলা হয়, তখনই বিস্ফোরণ ঘটে।’ বিস্ফোরক পরিদফতরের প্রধান  পরিদর্শক আরও বলেন, ‘এই ধরনের রিঅ্যাক্টর একেবারে নিষিদ্ধ। এই ধরনের সিলিন্ডার যার কাছে দেখবে, তাকেই পুলিশের ধরা উচিত। পুলিশ প্রশাসনকে আমরা বহুবার চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে জানিয়েছি। কিন্তু পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করছে না।’ তিনি বলেন, ‘আইন অনুযায়ী কোনো কারখানায় হাইড্রোজেন তৈরি হলে সিলিন্ডারে ভরে তা সরবরাহ করতে হবে।

সিলিন্ডার থেকে বেলুন ফোলাবে। তারা তা না করে সরাসরি সিলিন্ডারের ভেতরেই হাইড্রোজেন তৈরি করে, যা খুবই বিপজ্জনক।’ সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বিষয়ে বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোহম্মদ এহসান বলেন, ‘সাধারণত দুই কারণে আগুন ধরে যেতে পারে। প্রথমত, সিলিন্ডারটি মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে, দ্বিতীয়ত বেলুনে গ্যাস ভরার সময় অসাবধানতাবশত লিকেজ হলে।’ তিনি বলেন, ‘যে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরা হয়, সেটি গ্যাস ভরার সময় ফুলে যায়, আবার গ্যাস বেলুনে ভরার সময় সিলিন্ডারটি সংকুচিত হয়। বারবার এই সংকুচিত ও সম্প্রসারিত হওয়ার বিষয়টি খালি চোখে দেখা যায় না। সিলিন্ডার মাপলে বোঝা যায়। প্রতিটি সিলিন্ডারের একটা মেয়াদ থাকে। মেয়াদ থাকা অবস্থায় যদি সিলিন্ডারটি ব্যবহার করা হয়, সেক্ষেত্রে সংকোচন বা সম্প্রসারণের ফলে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু যদি সিলিন্ডারটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, তাহলে এই গ্যাসের চাপ সিলিন্ডার নিতে পারে না। তখনই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এজন্য প্রতিবছর হাইড্রোলিক টেস্ট করা জরুরি।’ পাশাপাশি সিলিন্ডারের গায়ে মেয়াদের তারিখও লিখে দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি। 

Ads
Ads