খালেদা অন্য বন্দিদের চেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন

  • ২৮-Oct-২০১৯ ১১:৫১ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

অপরাধী অপরাধীই। অপরাধীকে অন্যদৃষ্টিতে দেখলে ন্যায়চোখ কালিমায় ঢাকা পড়ে। আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার তা বারংবার প্রমাণ করে চলেছেন। এরই মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কথা বলে তার দলের নেতারা নানা দিগভ্রান্তিমূলক বক্তব্য ছুড়ছেন। অথচ বিএনপি নেত্রী অন্যান্য বন্দিদের চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা লাভ করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে পুনরায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘যারা অপরাধ করবে তাদের বিরুদ্ধে আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। সে যেই হোক এবং যে দলই করুক না কেন।’ গত শনিবার সন্ধ্যায় স্থানীয় হিলটন হোটেলে আজারবাইজানে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যদি আমাদের দলের কেউ ও অপরাধে জড়িত হয়, সে তৎক্ষণাৎ শাস্তি ভোগ করছে।’ ‘অন্যকে শিক্ষা দেওয়াটা নিজের ঘর থেকেই শুরু করা উচিত’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘আমি সেটাই করছি (দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ) এবং আমি এটি অব্যাহত রাখবো।’

বিএনপি-জামায়াত সরকারের ব্যাপক দুর্নীতির কোন সীমা ছিল না। তারা এখনো দুর্নীতি করে চলেছেন। সুযোগ পেলেই গুজব ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির পাঁয়তারা করছেন। তাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল, যারা জনমনে সন্দেহের বীজ বুননে লুকিয়ে রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে। বর্তমান শুদ্ধি অভিযানে তাদের অনেকেরই মুখোশ খুলে গিয়েছে। এর আগে গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনীতে লোক মেরেও তারা দেশে ভীতি ও ক্ষোভ তৈরির চেষ্টা করেছে, যার প্রমাণ বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ ও ওইসব ঘটনায় গ্রেফতার আসামিদের স্বীকারোক্তিতে ফুটে উঠেছে। ষড়যন্ত্রের এই সব দিকে সফল হতে না পেরে তারাই এবার তাদের দলের চেয়ারপারসনের অসুস্থতার বিভ্রান্তমূলক বক্তব্য ছুড়তে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এটিও যে গুজব তা মানুষের বুঝতে বাকি নেই। কারণ মানুষ জানে নেতারা ডাক্তার না হয়েও ডাক্তারের দেওয়া বক্তব্যকে উড়িয়ে দেওয়ার পাঁয়তারায় মত্ত। কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ড বলেছে, বিএনপি চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থার কোনো অবনতি হয়নি এবং তিনি চিকিৎসায় সন্তুষ্ট। খালেদা জিয়ার জীবন অত্যন্ত সংকটাপন্ন এবং তার ফিরে না আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বলে বিএনপি নেতাদের আশঙ্কা প্রসঙ্গে মেডিকেল বোর্ড বলছে, তাদের এমন কোনো আশঙ্কা নেই। তবে তারা এও বলছে জীবন-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর বিএসএমএমইউতে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক জিলন মিঞা। 

গত এপ্রিল থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে কারা তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন আছেন। তার চিকিৎসার জন্য এক স্থায়ী মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তিনি হাসপাতালের কেবিন ব্লকের ৬২১ নম্বর কক্ষে চিকিৎসাধীন আছেন। বিএসএমএমইউ পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে মাহবুবুল হক জানান, ‘ভর্তি হওয়ার সময়েই খালেদা জিয়া ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, বাতজ্বর, দাঁতসহ কিছু সমস্যা ছিল। ভর্তির সঙ্গে সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্থায়ী মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা প্রতিনিয়ত তদারকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ব্লাড পেশার, পালস ব্লাড সুগার প্রতিদিন মাপা হয়। ইনসুলিন ইনজেকশন নিয়মিত দেওয়া হয়। একদিন পর পর ফিজিওথেরাপি দেওয়া হয়। মেডিকেল বোর্ড একযোগে বা আলাদাভাবে ওনার চিকিৎসা তদারকি করে থাকে।’

চিকিসৎকরা সব সময় খালেদা জিয়াকে দেখার সুযোগ পান না উল্লেখ করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে মাহবুবুল হক বলেন, ‘একটি বিষয় আগে কখনোই বলতে চাইনি। কিন্তু বিভিন্ন সংবাদের প্রেক্ষিতে বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার। চিকিৎসকরা খালেদা জিয়াকে সব সময় দেখার সুযোগ পান না। ওনার কাছ থেকে আগে অনুমতি নিতে হয়। বেশির ভাগ সময় দুপুর দেড়টা বা তারপরে উনি সময় দিয়ে থাকেন। কিন্তু বাস্তবে নির্ধারিত সময়ে দেখা পাওয়া যায় না। একবার বোর্ডের চিকিৎসকরা বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত বসে থেকেও তাকে দেখার সুযোগ পাননি।’ তিনি জানান, ওনার বাত রোগের আধুনিক চিকিৎসার জন্য এক ধরনের ভ্যাকসিন দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এখনো সেটা দেওয়ার ব্যাপারে খালেদা জিয়ার সম্মতি পাওয়া যায়নি। তাই আগের পদ্ধতিতেই এই রোগের চিকিৎসা চলছে। সাত মাসে খালেদা জিয়ার অবস্থার কোনো কোনো ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানায় বিএসএমএমইউ। তারা আরও বলেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার কোনো অবনতি ঘটেনি। তার চিকিৎসা ভালো হচ্ছে।

শুধু চিকিৎসা কেন, বিএনপি নেত্রী অন্যান্য বন্দিদের চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা লাভ করছেন। বেগম জিয়ার ইচ্ছা অনুযায়ী একজন গৃহপরিচারিকা কারাগারে তার সঙ্গে রাখা হয়েছে। তার মানে বেগম জিয়াকে কারাগারে সে সেবা করছে। অথচ কারাগারের ইতিহাসে বা কোন দেশে এমন নজির নেই কোন নিরপরাধী গৃহপরিচারিকা একজন বন্দির সঙ্গে কারাগারে অবস্থান করে। কিন্তু খালেদা জিয়া সেই সুবিধা ভোগ করছেন। অথচ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিগত কেয়ারটেকার সরকারের আমলে দায়েরকৃত মামলায় সাজা হয়। আরো মামলা চলমান রয়েছে। বেগম জিয়ার দুই ছেলে মানি লন্ডারিং, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে।

এরপরেও খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল জানিয়ে বিএসএমএমইউর দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের নেত্রীর অবস্থা শঙ্কাজনক হলেও বিএসএমএমইউ হাসপাতালের পরিচালক সরকারের ‘শেখানো’ কথা বলেছেন। খালেদার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক জিলন মিঞা সরকারের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে বিএসএমএমইউ পরিচালকের বক্তব্যের ফারাক তুলে ধরেন রিজভী। তিনি বলেন, ‘জিলন মিঞা সরকার বলেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া চিকিৎসকদেরকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেন এবং অত্যন্ত বিনয়ী ব্যবহার করেন, ম্যাডাম আমাদের সঙ্গে সবসময় হাসিখুশিতে কথা বলেন। চিকিৎসক হিসেবে নানা অসুবিধার কারণে আমাদেরও প্রতিদিন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার সম্ভব হয় না। অথচ পরিচালক সাহেব বলেছেন যে, বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও দেখা পাওয়া যায় না। প্রায় সময় ডাক্তাররা কেবিনে গিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান না। অধ্যাপক জিলন মিঞা সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে পরিচালকের এই বক্তব্য অসামঞ্জস্যপূর্ণ।’ বিএসএমএমইউ হাসপাতালের পরিচালকের সমালোচনা করে বিএনপি নেতা বলেন, ‘আমরা দেখলাম পরিচালক সাহেব যে কথাগুলো বললেন, সেই কথাগুলো প্রায়ই প্রধানমন্ত্রী, তার মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেব ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করে বলেন তার (খালেদা জিয়া) অসুস্থতা নিয়ে। আজকে পরিচালক প্রকারান্তরে সেই ব্যঙ্গ বিদ্রুপের প্রতিফলন ঘটালেন। আমি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’ 

মূলত বেগম জিয়ার মুক্তির দাবিকে আন্দোলনের ইস্যু বানাতে এসব করছেন তারা। এটা স্পষ্ট। কিন্তু জনগণ কী বলছে? তাদের পক্ষে একজনও নেই। তাই কেউই তাদের এই সব ইস্যুতে চুপচাপ। আর সরকারের প্রতি সন্তুষ্ট বলেই তারা তারা সরকারের দৃঢ়তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধার চোখে দেখছেন। 

Ads
Ads