ফেসবুকে ফের গুজব : ভোলায় সংঘর্ষ অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা

  • ২১-Oct-২০১৯ ১০:৩৭ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির আড়ালে দুর্নীতি, লুটপাট ও ষড়যন্ত্র ঠিকঠাক চালিয়ে নিতে একের পর এক চক্রান্ত বাস্তবায়নে ব্যস্ত কুচক্রীমহল। কারণ তারা ভালো করে জানেন, দেশ এগিয়ে চলেছে। এই ধারা অব্যাহত রয়েছে বলেই বিশে^র দরবারেও তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে নিয়ে রটনা রটিয়ে টিকে থাকতে পারেনি। আর দেশের সচেতন মানুষ তো স্বচক্ষেই দেখছে সব। এমন অবস্থায় নানা ষড়যন্ত্রের মধ্যে গত আট বছরে বেশ কয়েকটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধাতেও মত্ত হয়েছেন তারা। গত রোববার ভোলার বোরহানউদ্দিনে ফেসবুকে ইসলামের রসুলকে নিয়ে কটূক্তি করা হয়েছে বলে জানানো হলে সেখানেও পুলিশ-গ্রামবাসীর সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ৪ জন, আহত হয়েছেন শতাধিক।

এসব ক্ষেত্রে অসচেতনতা রয়েছে নানা মাধ্যমেরও। রোববার রাতেই যুবলীগ নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে গত রোববার প্রধানমন্ত্রী মিডিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে এমন বিষয় সব সময় ধারাবাহিকভাবে প্রচার করবেন না। বরং যারা সত্যিকার অপরাধী তাদের দেখান।’ তিনি আরও বলেন, ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেশে একটা অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য এসব ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করা হয়। যখনই দেখা যায় দেশটা একটু ভালোভাবে চলছে, অগ্রগতি হচ্ছে। তখনই একটা শ্রেণি আছে নানাভাবে অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়। এটা যেন কোনোভাবে করতে না পারে সেজন্য আমি সাধারণ মানুষের সহযোগিতা চাই।’ তিনি বলেন, ‘কেউ যদি আমাদের নবী করিম (সা.)-এর বিরুদ্ধে কিছু লিখে থাকে নিশ্চয়ই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্যের ক্ষতি করার জন্য যারা এ ধরনের কথা লিখবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, মাদক এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখব।

এক্ষেত্রে অপরাধীর ক্ষমা নেই। তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব। কারণ আমরা যখন দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই স্বাভাবিকভাবেই কিছু মানুষের ভেতরে একটা লোভ সৃষ্টি হয়। যার ফলাফল আমাদের সমাজটাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। কাজেই এ ধরনের অন্যায়-অবিচার বরদাশত করা হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেন এভাবে আরেকজনের আইডি চুরি করবে, তাকে শেষ করে তার কাছে চাঁদা চাইবে, টাকা দিতে না পারলে মিথ্যা অপপ্রচার চালাবে, আর সেটাও চালাবে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে বা মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে। এ অপরাধীদেরই শনাক্ত করা দরকার এবং তাদের জাতির সামনে তুলে ধরা দরকার। আমি এটুকুই বলব, এ ধরনের নানা চক্রান্ত আমার বিরুদ্ধে সব সময় হয়ে থাকে।’ 

বাংলাদেশে গত আট বছরে কয়েকটি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রায় একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করে এসব হামলার পটভূমি তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে এবারই প্রথম পুলিশ শুরুতেই জানিয়েছে, তারা এটি উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে যে ভোলার বোরহানউদ্দিনে একজন হিন্দু ব্যক্তির বিরুদ্ধে মুসলমানদের নবী মোহাম্মদকে অবমাননার অভিযোগ তোলা হলেও এটি করেছেন দুজন মুসলিম। ওই হিন্দু ব্যক্তি আগেই তার আইডি হ্যাকের কথা পুলিশকে জানিয়েছিলেন। পুলিশ বলছে যে দুই মুসলিম ব্যক্তি একজন হিন্দু ব্যক্তির ফেসবুক হ্যাক করে নবী অবমাননাকর বার্তা দিয়েছিলেন তাদের আটক করা হয়েছে। তবে এ ধরনের ভুয়া খবর প্রচার করে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা এবারই প্রথম নয়।

২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধদের বাড়িঘর ও বৌদ্ধবিহারে হামলার ঘটনা পুরো দেশকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছিলো। তখনও ফেসবুকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একজনের নামকে যুক্ত করে দেয়া হয়েছিলো। এবার সর্বশেষ ভোলাতেও সেই একই কৌশল দেখা গেছে। তবে এবার পুলিশ শুরুতেই জড়িত দুজনকে আটক করেছে। বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য নামে একজনের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ঐ বার্তাটি বিভিন্নজনকে পাঠানো হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ সদর দফতর জানিয়েছে ভোলার বোরহানউদ্দিনের ঘটনার জন্য যে দুজন দায়ী তাদের আটক করা হয়েছে তারাই বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ম্যাসেঞ্জারে নবী অবমাননাকর বার্তা দিয়েছে যেগুলো পরে স্ক্রিনশট নিয়ে বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যের বলে প্রচার করে। কিন্তু এরই মধ্যে এর জের ধরে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে চার জন, অন্যদিকে ছয় দফায় বিপ্লবের ফাঁসি দাবি করা হয়েছে। 

ফেসবুক ব্যবহার করে ধর্ম বা নবী অবমাননার অভিযোগ তুলে একই কৌশলে হিন্দু বা বৌদ্ধদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেছে আগেও। সমুদ্র সৈকতের শহর কক্সবাজার জেলার রামুতে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে একটি ছবি ট্যাগ করার ঘটনা নিয়ে তুলকালাম কা- ঘটে যায়। উত্তম বড়ুয়া নামে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এক যুবকের ফেসবুকে কোরান অবমাননার ছবি কেউ ট্যাগ করে দেয়। এর জের ধরে রামুতে বৌদ্ধ স্থাপনা ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়িঘরে হামলা করা হয়। দশটিরও বেশি বৌদ্ধ বিহার ও প্রায় ২৫টি বাড়িতে হামলা হয়েছিলো। এর আগে প্রচার করা হয়েছিলো যে একটি কম্পিউটারের দোকান থেকে উত্তম বড়ুয়া নামে এক বৌদ্ধ তরুণের ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট থেকে ইসলাম ধর্ম, কোরান বা নবীকে অবমাননা করা হয়েছে। কিন্তু যেই তরুণের নাম প্রচার করা হয়েছে তার খোঁজ পাওয়া যায়নি আর এবং এসব ঘটনায় কারও তেমন কোনো শাস্তির খবরও পাওয়া যায়নি।

২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে আক্রান্ত হিন্দুরা। রামুর কায়দাতেই হামলাটি হয়। অভিযোগও সেই পুরনোÑ  ফেসবুকে ইসলাম বিদ্বেষী ছবি। এসময় প্রচার করা হয় রসরাজ নামে এক হিন্দু ব্যক্তির নাম। অভিযোগ তোলা হয়েছিলো যে মুসলমানদের কাবা ঘরের সঙ্গে হিন্দুদের দেবতা শিবের একটি ছবি জুড়ে দিয়েছিলেন রসরাজ। এ ঘটনার জের ধরে তাকে পিটিয়ে পুলিশে দেয় স্থানীয়রা। তবে ঘটনা তাতে থেমে যায়নি। পরে ইসলামপন্থী কয়েকটি সংগঠন বিক্ষোভ সমাবেশ ডাকে ও সেখান থেকেই হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা শুরু হয়। প্রায় তিনশো বাড়ি ভাংচুর করা হয়। অথচ আড়াই মাস পর জেল থেকে বের হয়ে রসরাজ জানান তিনি ফেসবুক চালাতে পারেন না। এমনকি এর যে পাসওয়ার্ড বলে একটি বিষয় আছে তা নিয়ে তার কোনো ধারণাই নেই।

নাসিরনগরে হামলার ঠিক এক বছরের মাথায় রংপুরের গঙ্গাচড়ায় হামলা যেন নাসিরনগর মডেল। ২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়াতে ফেসবুক থেকে ছড়ানো গুজবের জের ধরে এক জনের মৃত্যু হয়। অভিযোগ সেই একইÑ হিন্দু তরুণের ফেসবুকে থেকে নবীকে অবমাননার অভিযোগ। পুলিশ তখন জানিয়েছিলেন, টিটু রায় নামে যে ব্যক্তির ফেসবুক পোস্ট ঘিরে এই ঘটনা সেই টিটু রায়ের বাড়ি গঙ্গাচড়ায় হলেও তিনি নারায়ণগঞ্জে বসবাস করেন। গঙ্গাচড়ায় কয়েকদিন মাইকিং করে হামলা হয়েছিলো হিন্দুদের বাড়িঘরে। পরে টিটু রায়কে গ্রেফতারও করা হয়েছিলো।

চলতি বছরের জুনে ঈদের নামাজের পর হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটে সিলেটের ওসমানীনগরে। সনাতন ধর্মের এক নারীর মৃত্যুর পর সৎকার নিয়ে হিন্দু ও মুসলিমদের কয়েক ব্যক্তির মধ্যে মত বিরোধ হয়। পরে হিন্দু সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির নামে ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খুলে এমন কিছু পোস্ট দেয়া হয় যা নিয়ে মুসলিমদের একটি অংশ ক্ষোভ প্রকাশ শুরু করে। এর জের ধরে কয়েকটি বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে।

এর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেয়ায় কয়েকশ’ অস্ত্রধারী অতর্কিত হামলা চালায় যশোরের অভয়নগর উপজেলার চাপাতলা-মালোপাড়ায়। হামলাকারীরা ২০/২৫টি বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি ছাড়াও শতাধিক বাড়িঘরে ভাঙচুর এবং ঘরের মালামাল লুটপাট করে। পুড়িয়ে দেয়া হয় ১০টি বাড়ি। হামলায় আহত হন অন্তত ২৫ জন। ফেসবুকে পোস্ট কেন্দ্রিক ঘটনাটি না ঘটে থাকলেও দেশকে অস্থিশীল করাই যে মূল লক্ষ ছিলো, তা এখন সবার জানা। 

চাপাতলা-রামু কিংবা সাম্প্রতিক বোরহানউদ্দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনার মতো করেই সময়ে অসময়ে চক্রান্তকারীরা তাদের সুবিধা বাগিয়ে নিতে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাই ডিজিটাল এই দেশে জনগণকেই সতর্ক থাকতে হবে। সব কুচক্রীর চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সবাইকে সতর্ক থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন। 

Ads
Ads