মেননের বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্যে রয়েছে ষড়যন্ত্রের গন্ধ

  • ২০-Oct-২০১৯ ১১:৪১ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট কারচুপি হয়েছে এমন বক্তব্য দিয়ে সমালোচনার মুখে এ বিষয়ে নাটকীয় ব্যাখ্যা দিয়েছেন ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। দায় চাপিয়েছেন গণমাধ্যমের ওপরে। রোববার এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ‘বরিশাল জেলা পার্টির সম্মেলনে আমার একটি বক্তব্য সম্পর্কে জাতীয় রাজনীতি ও ১৪ দলের রাজনীতিতে একটা ভুল বার্তা গেছে। আমার বক্তব্য সম্পূর্ণ উপস্থাপন না করে অংশ বিশেষ উত্থাপন করায় এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।’ এর আগের দিন শনিবার বরিশালে দলীয় ওই কর্মসূচিতে গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন নিয়ে বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসেন ক্ষমতাসীন ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি নেতা মেনন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমিও নির্বাচিত হয়েছি। তারপরও আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, ওই নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। এমনকি পরবর্তীতে উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ভোট দিতে পারেনি দেশের মানুষ।’

মূলত কিছু না পাওয়ার ঝাঁজ বুকে আটকে ছিলো তার। এরই প্রেক্ষিতে শনিবার বেরিয়ে আসে ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্য। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও তার পরবর্তী নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে তিনি এই বক্তব্য দিয়েছেন। এমনটাই মনে করছেন বোদ্ধা রাজনীতিক ও দেশপ্রেমীরা। বিএনপি জোটের এতদিনের অভিযোগের সমর্থনে তার এ বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে ঢাকা-৮ আসনে তিন দফায় নির্বাচিত মেনন এবার মন্ত্রিত্ব না পেয়ে এখন এই কথা বলছেন বলে মন্তব্য করেন অনেকে। তার বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্যকে পুঁজি করে নিয়েছে বিএনপি ও তার শরীক জোটনেতারা। ইতোমধ্যে নির্বাচন ও ভোট নিয়ে বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন তার নিজের দায় ও অপরাধ স্বীকার করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, রাশেদ খান মেনন জাতির সামনে রাজসাক্ষী হয়ে রাতের ভোট ডাকাতির স্বীকারোক্তি দেওয়ার মাধ্যমে নিজের দায় ও অপরাধ স্বীকার করেছেন।’ মেননের বক্তব্যকে পুঁজি করে তিনি ‘সরকারের যদি লজ্জা থাকে তাহলে তাদের পদত্যাগ করা উচিত। তারা যে অবৈধ সরকার তাদের লোকেরাই তা স্বীকার করেছেন’ বলে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন। রুহুল কবির রিজভী আরও বলেছেন, ‘নিশিরাতের ভোট নিয়ে মহাসত্যটা বলে দিয়েছেন মেনন। ওবায়দুল কাদের ও হাছান মাহমুদও একদিন এই সত্য স্বীকার করবেন।’

নিজেদের অভিযোগের পক্ষে বড় প্রমাণ হিসেবে দেখছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন। গতকাল  রোববার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির এক বৈঠকের পর সাংবাদিকরা প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ড. কামাল বলেন, ‘দেরিতে হলেও উনি (রাশেদ খান মেনন) এটা করেছেন। আমি খুশি।’ ড. কামাল আরও বলেছেন, ‘আমি তো এই কথাটি বার বার বলে যাচ্ছি যে, আপনারা কেউ কি ৩০ ডিসেম্বর ভোট দিয়েছিলেন? আমি এই পর্যন্ত একজনের কাছ থেকে পাইনি যে ‘হ্যাঁ’ দিয়েছেন। এখন উনিও (রাশেদ খান মেনন) কনফার্ম করলেন। এজন্য আমি উনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’ জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেছেন, ‘আজকে সরকারি জোটের একজন নেতা বলেছেন, বাংলাদেশের কোনো জনগণ ভোট দিতে পারে নাই, আমি সাক্ষ্য দেব। উনার সঙ্গে সঙ্গে বলা আছে যে, উনি মাসে ১০ লাখ টাকা করে পেতেন এবং নির্বাচনের সময়ে কোটি কোটি টাকা নিয়েছেন। আমরা বলতে চাই, আরও রাঘববোয়াল আছে, ওদের নাম প্রকাশ করেন। চুনোপুঁটি ধরতেছেন, ওয়ার্ড কমিশনার ধরতেছেন, বড় বড় রাঘববোয়াল কোথায়? যুবলীগের ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট বলেছেন, আমি একা কেন, বাকিরা কোথায়?’

এভাবে স্বাধীনতার চেতনাবিরোধীদের পক্ষ নিয়ে তাদের উস্কে দিতে মেনন এমন কথা বলেছেন এবং পরে নিজের বক্তব্যে খুব একটা সুবিধা করতে না পেরে ভোল বদলে নিতে চেষ্টা করেছেন বলেই মনে করছেন সচেতন সুশীল সমাজ। কারণ তার বক্তব্যের কারণ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাখ্যা করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক, পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কঠোর সমালোচনা করে গত মন্ত্রিসভার সহকর্মী মেননের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘তিনি যদি বলেই থাকেন, আমার প্রশ্ন হচ্ছে এতদিন পরে কেন? এই সময়ে কেন? নির্বাচনটা তো অনেক আগে হয়ে গেছে। আরেক প্রশ্ন সবিনয়ে- মন্ত্রী হলে কি তিনি এ কথা বলতেন? আর কোনো কিছু বলতে চাই না।’

ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার বলেছেন, ‘জনগণ ভোট দিয়েছে। আমরা ভোটের মাধ্যমেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। রাশেদ খান মেনন যা বলেছেন তা উনার ব্যক্তিগত বক্তব্য।’ ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেছেন, ‘যারা এই নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তাদের মুখে এমন কথা মানায় না। এসব কথা উনি বলার জন্য বলেছেন। তিনি হয়তো সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চান। উনি পদত্যাগ করে এসব বললে তখন ঠিক মনে করতাম।’ তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভা-ারি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘উনি ও উনার দলের সংসদ সদস্যদের একযোগে পদত্যাগ করা উচিত। উনারা জাতীয় সংসদে থাকার নৈতিক ভিত্তি হারিয়েছেন। ১৪ দলে থেকে এসব কথা বলার আগে উনাদের উচিত ছিল জোট থেকে পদত্যাগ করা। উনার এসব কথার উদ্দেশ্য কী? এসব কথায় তো বিএনপি-জামায়াত লাভবান হবে।’

এই সব ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ও যাদেরকে তিনি আপন করে নিতে চেয়েছিলেন তাদের কমজোর মন্তব্য খুব বেশি সহযোগী হয়নি বলে শনিবারের বক্তব্য নিয়ে এক বিবৃতিতে মেনন গতকাল বলেছেন, ‘বক্তৃতায় আমি বলেছি, স্বাধীনতা উত্তরকাল থেকে এ যাবত জিয়া-এরশাদ-বিএনপি-জামায়াত আমলের ধারাবাহিক অনিয়ম অব্যবস্থাপনা ও ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটেছে। বিভিন্ন সময় আমি প্রার্থী হিসেবে এ সকল ঘটনার সাক্ষী।’ ‘আমি বলেছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মিলে ভোটাধিকার ও ভোটের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে আমরা যে লড়াই করেছি তা যেন বৃথা না যায়, সেজন্য নির্বাচনকে যথাযথ মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে হবে।’ মূলত রাশেদ খান মেননের বিভ্রান্তিমূলক এই সব কর্মকাণ্ডে রয়েছে ষড়যন্ত্রের গন্ধ।

Ads
Ads