নিষ্পাপ শিশুর প্রতি নৃশংসতা বন্ধ করতে হবে

  • ১৭-Oct-২০১৯ ১০:০৩ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

শিশুরা হচ্ছে আদরণীয়। নিষ্পাপ। শিশুদের দেখলে এক ধরনের মায়া জন্মে। জগতের অন্য অনেক না পাওয়া, হতাশা ভুলিয়ে দেয় শিশুর অমলিন হাসি। সেই শিশুরা যখন নির্মম নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয় এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে। এ কথা সত্য, ইদানীং মানুষের আক্রোশ ও জিঘাংসা অতিমাত্রায় বেড়ে গেছে; যার নিষ্ঠুর শিকার হচ্ছে কোমলমতি শিশু। বেশিরভাগ সময় তাদের নির্যাতন করা হচ্ছে এবং নির্যাতনের পর হত্যা করা হচ্ছে। অভাব হাহাকার-হতাশায় মা-বাবাও নিজের সন্তানকে হত্যা করছে অবলীলায়। এটা অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজেরই এক ভয়াবহ চিত্র।

দেশে আইনের শাসন না থাকা অর্থাৎ বিচারহীনতার প্রবণতা বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা ও দায়িত্বহীনতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মানুষের মধ্যে এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে। একটি রাষ্ট্রে যখন অযাচিত রাজনৈতিক প্রভাব বেড়ে যায়, তখন সমাজের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করতে থাকে। আর যখন রাজনৈতিক প্রভাব বেড়ে যায়, তখন অপরাধকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও চাপ প্রয়োগে সমর্থ হয়। আর এতে অপরাধ করলে শাস্তি হবে না এমন একটা মানসিকতার সৃষ্টি হয়। বর্তমানে আমাদের সমাজে এ বিষয়গুলো ভয়াবহ আকারে রূপ নিয়েছে। শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনা আজ আমরা মুখ বুজে মেনে নিচ্ছি। সমাজের মানুষ হিসেবে আমরা কখনো ভয়ে, কখনো দায়বদ্ধতার অভাবে প্রতিবাদ, প্রতিকার ও প্রতিরোধে এগিয়ে আসছি না। অপরাধীর সংখ্যা সীমিত হলেও প্রতিরোধ বা প্রতিবাদীর সংখ্যা আরও কম হওয়ায় এসব ঘটনা ঘটেই চলেছে। এছাড়া সব সমাজে সবল শক্তিশালীরা সব সময় দুর্বল দেহের মানুষের ওপর নির্যাতন চালায়।

এবার সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে তুহিন (৫) নামে এক শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর গাছের সঙ্গে মরদেহ ঝুলিয়ে রেখেছে ঘাতকরা। ঘাতকরা শিশুটির লিঙ্গ ও কান কেটে নিয়ে গেছে। গত রোববার দিনগত রাত ৩টার দিকে উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের কাজাউড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত তুহিন ওই গ্রামের আবদুল বাছিরের ছেলে। গত রোববার রাতের খাবার খেয়ে পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়েন। রাত ৩টার দিকে তুহিনের চাচাতো বোন ঘরের দরজা খোলা দেখে ডাকাডাকি শুরু করেন। এ সময় পরিবারের সদস্যরা ঘুম থেকে উঠে দেখেন তুহিন ঘরে নেই। অনেক খোঁজাখুঁজি করে বাড়ি থেকে একটু দূরে মসজিদের পাশে একটি গাছের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ পায়। এ সময় তার পেটে দুটি ছুরি বিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। খবর পেয়ে সকালে দিরাই থানাপুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিশু তুহিনের মরদেহ উদ্ধার করে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জানা যাচ্ছে যে তুহিনের পিতাসহ স্বজনরাই তার খুনি। নিজেকে হত্যামামলা থেকে বাঁচাতেই সন্তানকে বলি দেওয়া। পিতার কোলেও শিশু নিরাপদ নয়- এ কোন ঘোর অমানিশার কাল এলো ভাবতে হবে সমাজ বিশ্লেষকদের।

বিগত দু-দশকে শিশু সুরক্ষায় বাংলাদেশে আইনি কাঠামো শক্তিশালী হয়েছে; নেওয়া হয়েছে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ। কিন্তু সামগ্রিক বিবেচনায় ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণে স্পষ্টত শিশুর প্রতি সহিংসতার দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। বরং ভয়াবহতা ও নৃশংসতা বেড়েছে। শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচারের সাম্প্রতিক দৃষ্টান্তের পরও দেখা যাচ্ছে নির্যাতন চলছেই। বিশেষ করে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন করে হত্যার ঘটনা সমাজকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে শিশুরা অবলীলায় হত্যাকা-ের শিকার হচ্ছে। এই নৃশংসতার অবসান হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য নতুন করে ভাবতে হবে কেন এক শ্রেণির মানুষ এতোটা বিকারগ্রস্ত হয়ে শিশুহত্যায় মেতে উঠলো।

সভ্য সমাজে শিশুর প্রতি মানবিক আচরণ করা হয় সেখানে হত্যা, খুন অপহরণ, ধর্ষণ তো দূরের কথা। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও শিশুহত্যা নিষেধ। কিন্তু আমাদের সমাজে কেন এসব ঘটছে সেটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।

শিশুরা নিরীহ ও দুর্বল। এ জন্য সহজেই তারা টার্গেটে পরিণত হয়। আমাদের নির্যাতিত শিশু ও তার পরিবারের পাশে থেকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তাই ইউনিসেফের ভাষায় বলতে হয়, ‘শিশুদের, বিশেষত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আর্থিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে সবার সম্মিলিত উদ্যোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ শিশুর সুষ্ঠু শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং সামাজিকীকরণে বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। সবার আগে প্রতিটি পরিবার থেকে শিশুর প্রতি মানবিক আচরণ করার চর্চা করতে হবে। এ কাজে বয়োজ্যেষ্ঠ ও অভিভাবকদেরই দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। সর্বোপরি পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনকে সুদীর্ঘ এবং শক্তিশালী করতে হবে। এক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশিত।

Ads
Ads