দুর্নীতি বিরোধী শুদ্ধি অভিযান, আওয়ামী লীগকে আরো শক্তিশালী করবে

  • ১৬-Oct-২০১৯ ০৭:১৬ অপরাহ্ন
Ads

:: স্বপন দাস ::

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে জন্ম নেয় প্রথমে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ও পরে মুসলিম আওয়ামী লীগ পরিবর্তন হয়ে হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সেদিনের সেই মহেন্দ্র ক্ষনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান প্রমুখ এই নতুন দলটি প্রতিষ্ঠায় অগ্রনী ভ’মিকা পালন করেন। 

অবশ্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান’এর এই দল গঠনের পিছনে ছিল বাংলাদেশকে স্বধীন করা। আর এজন্যেই তিনি ১৯৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে সিরাজদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে অস্তগামী স্বাধীনতার সুর্য্যকে উদিত করার স্বপ্নকে লালন করে এই দল গঠন করেন। যার বাস্তবরূপ তিনি দিয়েছিলেন ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের মধ্য দিয়ে। তার পর স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপ্ন দেখেন, স্বাধীন বাংলাদেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার।

তিনি যখন এই প্রত্যয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ধংশস্তুপে পরিণত হওয়া দেশকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ঠিক তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট তাঁকে স¦পরিবারে হত্যা করা হয়। 

হত্যাকারিদের পরিকল্পনা ছিল সুদুর প্রসারি। শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা নয়,তার আদর্শকেও হত্যা করা। হত্যাকারিদের উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে হত্যার অপচেষ্টা। কিন্তু এ দেশে তা সম্ভব হয়নি, কখনও হবেনা। যার জলন্তরুপ বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ফিরে আসার ঘটনা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেক আশির্বাদ। ফিরে আসার আগেই সর্বসম্মতিক্রমে শেখ হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতি নির্বাচিত করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। 

সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে দেশে ফেরার পর ২০০৪ এর ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া, ২০০৮ ১১ জুন ১১ মাস পর তিনি কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠ থেকে  মুক্তি পেয়ে নানা চড়াই উৎড়াই পেড়িয়ে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে নির্বাচিত হয় এবং ২৩ জুন ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সেই ঐতিহাসিক ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে শুরু করেন, বঙ্গবন্ধুর স¦প্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজ। এরপরের ইতিহাস সবারই জানা। দেশ ও জনগণের কল্যাণে অভূতপূর্ব অবদান রাখায় দেশের মানুষ তাকে পরপর টানা তিনবারসহ মোট চারবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিষ্ঠান শেখ হাসিনাকে বিভিন্ন ডিগ্রি এবং পুরস্কার প্রদান করে বাংলাদেশকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আজকের এই উত্তরণ - যেখানে রয়েছে এক বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়ার ইতিহাস, সরকারের রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের এটি একটি বড় অর্জন।

এটি সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাহসী এবং অগ্রগতিশীল উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের ফলে যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কাঠামোগত রূপান্তর ও উল্লেখযোগ্য সামাজিক অগ্রগতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে দ্রুত উন্নয়নের পথে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় জন্মের ৫০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ দ্রুতগতিস¤পন্ন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মতো সফলতা সম্ভব হয়েছে  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্ব, দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা, এমডিজি অর্জন, এসডিজি বাস্তবায়নসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা, কৃষি, দারির্দ্রসীমা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, রপ্তানীমূখী শিল্পায়ন, ১০০ টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পোশাক শিল্প, ঔষধ শিল্প, রপ্তানী আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচক। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর, ঢাকা মেট্রোরেলসহ দেশের মেগা প্রকল্পসমূহ। 

কিন্তু সেই উন্নয়নের যাত্রায় আজ ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে আওয়ামী লীগ। নিজ দল, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলোর কিছু নেতার দুর্নীতি অপরাধ ম্লান করে দিচ্ছে এতো অর্জন। যা দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে চাপা ক্ষোভ তৈরি করেছে এবং আওয়ামী লীগকে ফেলে দিয়েছে এক চরম দুরাবস্থায়। 

এ অবস্থায় দলীয় প্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনা গত ২৪ সেস্টেম্বর’১৯ দলীয় ফোরামে দল ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের দুর্নীতির ব্যাপারে বক্তব্য দেয়ার পর  থেকে দল ও অঙ্গ সংগঠনগুলোয় চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকা বড় নেতাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) অভিযান শুরু করে। যুবলীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের নিয়ন্ত্রিত অবৈধ ক্যাসিনোসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও অভিযান চালানো হয়েছে। এরই মধ্যে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে নৃশংস হত্যা ঘটনায় বুয়েট শাখা ছাত্র লীগের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়টি দলকে আরো বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়। 

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান শেষে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন গত ৯ অক্টোবর বুধবার। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কে কোন দল করে সেটা দেখা হবেনা,অপরাধী অপরাধীই। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক হলে অভিযান পরিচালনার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। 

দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের কারণ ব্যাখ্যা করে শেখ হাসিনা আরও বলেন, "এটা করতে হবে এই জন্যে, আমরা দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য। উন্নয়নের জন্য আমরা প্রকল্প তৈরি করছি। অর্থ বরাদ্দ করছি, কাজ হচ্ছে। আমরা চাই তার প্রতিটি পাই পয়সা যেন যথাযথভাবে ব্যবহার হয়। আর সেখানে যদি কোন অনিয়ম হয়, উন্নয়র তো ক্ষতিগ্রস্থ  হবে। 

আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন নিয়ে এবার হার্ড লাইনে দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিজের মতো করেই প্রধানমন্ত্রী সাজাতে চান মূল দল ও সহযোগী সংগঠনকে। ক্যাসিনো কান্ডে জড়িয়ে যারা বিতর্কিত হয়েছেন কেউ ঠাঁই পাচ্ছেন না যুবলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগে। সহযোগী ও মূল দল আওয়ামী লীগের পদ-পদবিতেও সিন্ডিকেটের ব্যাপারে জিরো টলারেন্সে শেখ হাসিনা। ঠাঁইপাচ্ছেন না অনুপ্রবেশকারীরা। নেপথ্যে যদি কেন্দ্রীয় নেতারা সুপারিশ করেন তারাও চিহ্নিত হবেন দলের হাইকমান্ডের কাছে। লীগের কোনো নেতাই এই অভিযান স¤পর্কে জানেন না। এমন পরিস্থিতিতে সবাই তাকিয়ে আছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলমান দুর্নীতি বিরোধী শুদ্ধি অভিযানকে আগামী দিনে আওয়ামী লীগকে আরো শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন দল ও জনগন। ঐতিজ্যের সেই আওয়ামী লীগকে সুস্থ ধরায় ফিরিয়ে আনার জন্যে কলুষমুক্ত বিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ দেখতে চান দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা। দুর্নীতি, অপকর্ম আর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সঙ্গে জড়িতরা দলে আর যেনো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে তেমনটিই প্রত্যাশা তাদের। তাই  চলমান অভিযানে খুশি দলের তৃণমুলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। 

দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা জানান, দলের নাম ভাঙিয়ে অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করা, আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয়ে ক্ষমতার দাপট দেখানো ও বলয় তৈরি করে রাজনীতি করা কথিত নেতাদের লাগাম টেনে ধরতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের সর্বস্তরে শুদ্ধি অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি দলকে পরিশুদ্ধ করে জনগণের কাছে আওয়ামী লীগকে জনপ্রিয় সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। তারা বলেন, দলীয় সভাপতির এ উদ্যোগ সবার জন্য কড়া সতর্কবার্তা। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা খুব গর্ব করেই বলে বেড়াচ্ছেন- এই বলে যে- আমরা ক্যাসিনো লীগ না। আমরা আওয়ামী লীগ। 

Ads
Ads