এদেশে কেউ গৃহহীন থাকবে না :দ্রুত এগোচ্ছে প্রশংসনীয় উদ্যোগ

  • ৮-Oct-২০১৯ ১০:২৫ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বসতি নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের এই উন্নতি নজর কেড়েছে বিশ্বদরবারের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার সবার জন্য আবাসন গড়ে দেওয়ার জন্য যে নির্বাচনী অঙ্গীকার দিয়েছিলো তার বাস্তবায়নে কাজ চলেছে দ্রুতগতিতে। দেশের বিত্তবান, মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, এমনকি যাদের কোনো কিছু নেই অর্থাৎ যারা ভাসমান বস্তিবাসী তাদের জন্যও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ ধারণাকে কার্যকর করে নাগরিক সুবিধা সকল মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যও ঐকান্তির প্রচেষ্টা রয়েছে সরকারের। যার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে বাসযোগ্য, পরিবেশসম্মত আধুনিক আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। গত সোমবার বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী অ্যাড. শ. ম রেজাউল করিম বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার মনে করে সকলের জন্য আবাসন, কেউ থাকবে না গৃহহীন। এটি ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকারও।’ 

গরিবের বন্ধু বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও হতদরিদ্র মানুষের কল্যাণে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে। সরকার হাওর এলাকার মানুষের বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসনে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। গৃহহীনদের জন্য আরো গৃহনির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করছে। এসব কথা উল্লেখ করে গত শনিবার দুপুরে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে ‘জমি আছে ঘর নেই’ প্রকল্পের আওতায় গৃহহীনদের মধ্যে ঘরের চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, এ দেশে কেউ গৃহহীন থাকবে না। এ সময় তিনি ১৯৮টি পরিবারের প্রধানদের হাতে ঘরের চাবি তুলে দেন। রোববার সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার, চাঁদপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম হাজীগঞ্জে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ ‘যার জমি আছে, ঘর নেই’ পরিদর্শন ও ঘর প্রদানকালে বলেছেন, ‘এদেশে কেউ গৃহহীন থাকবে না। গৃহহীন সকল পরিবারকে জননেত্রী শেখ হাসিনার আশ্রয়ণ তহবিল থেকে গৃহ প্রদান করছেন।

শ ম রেজাউল করিম বলেছেন, ‘শুধু ইট-সুরকির দালান দিয়ে নগর গড়ে তোলা সরকারের লক্ষ্য নয়, বরং সব নাগরিকের জন্য পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব আবাসন নিশ্চিত করা সরকারের অঙ্গীকার। এ আলোকে ‘পরিকল্পিত নগর, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন’-এ ভিশনকে সামনে রেখে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তুলতে সরকার তথা গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে সরকারি অব্যবহৃত জমিতে সুউচ্চ ভবন নির্মাণ, পুরাতন/পরিত্যক্ত ভবন অপসারণ করে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ, জমি থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে বিভিন্ন আবাসিক প্রকল্প গ্রহণ, পরিবেশবান্ধব টেকসই আবাসন নিশ্চিতে আবাসিক ভবনগুলোয় স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সোলার প্যানেল, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রভৃতি বিষয় সংযুক্ত করা, ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনায় (মাস্টার প্ল্যান) বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয় আবাসনের জন্য ভূমির প্রস্তাবনা, অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিচ্ছিন্ন আবাসনের পরিবর্তে গুচ্ছ গুচ্ছ আবাসন নীতিমালা প্রণয়ন, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ব্লকভিত্তিক নির্ধারিত উচ্চতায় পরিকল্পিত ভবন নির্মাণ প্রকল্প।’

বর্তমানে সরকারের চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বাস্তবায়নাধীন পূর্বাচল নতুন শহর, উত্তরা তৃতীয় পর্বে উত্তরার ১৮নং সেক্টরে ২১৪ একর জমিতে ১৫ হাজার ৩৬ ফ্ল্যাট নির্মাণ, ঝিলমিল রেসিডেন্সিয়াল পার্কে ৮৫টি বহুতল ভবনে ১৩ হাজার ৭২০টি ফ্ল্যাট নির্মাণ, গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন, কুড়িল-পূর্বাচল লিঙ্ক রোডের উভয় পার্শ্বে (কুড়িল হতে বালু নদ পর্যন্ত) ১০০ ফুট চওড়া খাল খনন ও উন্নয়ন, হাতিরঝিল প্রকল্পের দূষিত পানি পরিশোধন, উত্তরা লেক উন্নয়ন, ঢাকার গুলশান, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া ও ধানম-ি এলাকার ৯টি পরিত্যক্ত বাড়িতে বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ প্রকল্প। গণপূর্ত অধিদফতরের বাস্তবায়নাধীন ঢাকার বেইলি রোডে মন্ত্রীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ (মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট-৩), মাদারীপুরে সরকারি অফিসগুলোর জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ, ঢাকার মালিবাগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৪৫৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণ, ঢাকার আজিমপুরে বিচারকদের জন্য বহুতলবিশিষ্ট আবাসিক ভবন নির্মাণ, ঢাকা শহরে গুলশান, ধানম-ি ও মোহাম্মদপুরে ২০টি পরিত্যক্ত বাড়িতে ৩৯৮টি সরকারি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ, গোপালগঞ্জে বহুতলবিশিষ্ট সমন্বিত অফিস ভবন নির্মাণ এবং জিগাতলায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২৮৮টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর ‘এফ’ ব্লকে ৯০০টি আবাসিক ফ্ল্যাট, মিরপুর ১৫নং সেকশনে সরকারি/আধাসরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ‘জয়নগর’ ৫২০টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ, লালমাটিয়া নিউ কলোনিতে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ১৩২টি (সংশোধিত ১৫৩টি) আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ, মিরপুর ৯নং সেকশনে ১০৪০টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প।

এছাড়া সম্প্রতি গণপূর্ত অধিদফতরের মাধ্যমে ২ হাজার ৭৮৮টি ফ্ল্যাট নির্মিত হয়েছে বিধায় ঢাকা শহরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সুবিধা ৮ থেকে ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে ঢাকা শহরে আবাসিক ভবন নির্মাণের আরও ১৩টি প্রকল্প বাস্তবায়ন চলমান আছে। চলমান প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মাণাধীন রয়েছে ৬ হাজার ৫৯৪টি ফ্ল্যাট। এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে ঢাকা শহরে আবাসন সুবিধা ১০.৬৪% হতে ১৫.১০%-এ উন্নীত হবে। গণপূর্ত অধিদফতর র্কর্তৃক বাস্তবায়িতব্য আরও ৮টি প্রকল্প পাইপলাইনে আছে। এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ঢাকা শহরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সুবিধা ১৫.১০% থেকে ২১.১৮%-এ উন্নীত হবে। আবাসন সুবিধা ৪০%-এ উন্নীত করতে আরও ২৮ হাজার ১৩টি ফ্ল্যাট প্রয়োজন হবে। পুরনো ভবন ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে এ লক্ষ্য পূরণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ইতোমধ্যে রাজউক, চউক ও জাগৃকসহ মন্ত্রণালয়াধীন সব উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সেবা সহজীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবন নির্মাণ অনুমোদনের সময় ১৬৫ দিনের স্থলে ৫৩ দিনে নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজউক ও চউকের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে পূর্বে ১৬টি সংস্থার কাছে যেতে হতো। অপ্রয়োজনীয় প্রতীয়মান হওয়ায় ১২টি সংস্থা রহিত করে দিয়েছে সরকার। ভূমির ছাড়পত্র ও নামপত্তনের সময়সীমা ৭ দিন করা হয়েছে। জনদুর্ভোগ লাঘবে এটা একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এর পাশাপাশি রাজউক-চউকের সব সেবা সম্পূর্ণ অটোমেশন পদ্ধতিতে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। সরকারি আবাসন পরিদফতরে বাসা বরাদ্দের আবেদন অনলাইনে গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সেবা সহজীকরণ ও সেবাগুলো অনলাইনে প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

কিছুদিন আগে সোনারগাঁওয়ে দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ঢাকা মহানগরীর আধুনিকায়নে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘রাজধানীর বস্তিগুলো বহুতল ভবনে প্রতিস্থাপিত হবে, যাতে করে নগরবাসী উন্নত স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে জীবন-যাপন করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘রাজধানীতে কোনো বস্তি থাকবে না। এর স্থলে ২০ তলা করে ভবন গড়ে তোলা হবে। এখন যেমন বস্তিবাসীরা ভাড়া দিয়ে থাকেন তেমনি তখন তারা ওসব ভবনেও দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং মাসিক ভিত্তিতে ভাড়া দিয়ে বসবাস করবেন।’ তিনি বলেন,

‘প্রতিদিন নানা প্রয়োজনে দরিদ্র মানুষকে রাজধানীতে আসতে হয়। আবার আমাদের দৈনন্দিন কাজেও এই শ্রমিক শ্রেণির প্রয়োজন পড়ে। তারা যেন একটু শান্তিতে বসবাস করতে পারে সেজন্যই তাদের বসবাসের জন্য একটু ভালো পরিবেশের দরকার।’ এ সময় তিনি বলেন, ‘কেবল অবস্থাসম্পন্নদের জন্যই নয়, আমাদের উন্নয়ন সকলের জন্য।’ জানা যায়, ৩ হাজার ৩৭৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প ২০২০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে। ২৪ হেক্টর জমির ওপর এই প্রকল্পে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনের মাধ্যমে ৫০ লাখ নগরবাসীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
 

Ads
Ads