শর্ষের ভূত মরে না!

  • ৬-Oct-২০১৯ ১০:১৯ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

শর্ষের ভূত খোলস বদলায়। খোলস বদলে তারা আরও শক্তিশালী হয়। এমনই সব ভূত বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও পাকাপোক্তভাবে স্থান গেড়ে নিয়েছেন। যুগ যুগ ধরে তাদেরকে অনেকেই ইন্ধন দিয়েছেন। ডেকে নিয়েছেন দলে। প্রশাসনের সাদা চোখ তখন বন্ধ ছিল। তাদের বন্ধ চোখের সম্মুখে তাদেরই কাজে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে দফতরের নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করতে দেখা গেছে কোনো কোনো ভূতকে। অবশেষে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই শক্তিশালী ওঁঝার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার পরই একের পর এক গ্রেফতার হতে থাকেন শর্ষের ভূত। যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার পর গ্রেফতার হন যুবলীগের সমবায় সম্পাদক হিসেবে পরিচয়দানকারী নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি জি কে শামীম। যিনি বিএনপির প্রভাবশালী নেতা মির্জা আব্বাসের ঘনিষ্ঠপ্রতীম। আর গতকাল ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ক্যাসিনো ওয়র্ল্ডের মুকুটহীন সম্রাট গ্রেফতারের পর আরও বেশি আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। দুই যুগ আগ যে কিনা ছিলেন ওয়ার্ডের একজন সাধারণ নেতা। কিন্তু জনমনের প্রশ্ন এই সব ভূতকে লালনপালন করে বড় করলেন, তারা কোন ভূত? শর্ষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এই সব ভূতের বর্তমান অবস্থান কী? 

ইয়াবা, মদ, অস্ত্র, জুয়া মিলে অনন্য এক আন্ডারগ্রাউন্ড তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশের ক্যাসিনো সম্রাট যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। অস্ত্রবাজি করে, ক্যাডার পুষে অস্ত্রের মুখে চাঁদাবাজির রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসেন। শুধু তাই নয়, রাজধানীতে গড়ে তোলেন ক্যাসিনোরাজ্য। যেখানে গ্লামার গার্লদের দিয়ে নানা অনৈতিক কর্মকা-ও চালানো হতো। গত ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনায় যুবলীগ নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগেও তিনি কয়েকবার যারা এধরনের কাজে লিপ্ত নেতাদেরকে হুশিয়ার করে দিয়ে বলেন, ‘যারা অস্ত্রবাজি করেন, যারা ক্যাডার পোষেণ, তারা সাবধান হয়ে যান- এসব বন্ধ করুন। তা না হলে যেভাবে জঙ্গি দমন করা হয়েছে, একইভাবে তাদেরকেও দমন করা হবে।’ অথচ প্রধানমন্ত্রীর এই হুশিয়ারীকেও তারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়।

মূলত তারা মনে করেছিল, তাদের মদদদাতা কিছু জ্যেষ্ঠ নেতা ও প্রশাসন তাদেরকে পার পাইয়ে দেবে। গত বছরে যখন কাকরাইলের আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর অনুদান থেকে ভাগ বসাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভের মুখোমুখী হন, তখনই সেই সব জ্যেষ্ঠ নেতারাই তাকে আশকারা দিতে প্রধানমন্ত্রীকে আরেকবার সুযোগ দিতে অনুরোধ করেছিলেন। এই সব জ্যেষ্ঠ নেতা কারা? তাদেরকেও খুঁজে বের করার সময় এসেছে। কারণ, তারাই এক সম্রাটকে সম্রাট হতে সহযোগিতা করেছে বলে জনগণের বদ্ধমূল ধারণা। অন্যদিকে বিএনপি থেকে খোলস পাল্টে কীভাবে একজন জিকে শামীম গণপূর্তে টে-ার শামীম হয়ে উঠলো সেটাও দেখভালের বিষয়। এইসব ভূঁইফোড় উঁইপোকাদের দলে টেনে নেয়ার পেছনে যুবলীগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরীরও হাত রয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সূত্রে জানা গেছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে মিরপুরে অনুষ্ঠিত যুবলীগের এক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর শুদ্ধি অভিযানের বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য রাখেন এই নেতা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে যখন র‌্যাব-পুলিশ অভিযান পরিচালনা করছেন তখন তাদের দিকে আঙুল তুলে তিনি বলেন, ‘আমাকে অ্যারেস্ট করবেন? করেন। আমি রাজনীতি করি। ১০০ বার অ্যারেস্ট হব। আমি অন্যায় করেছি। কিন্তু আপনারা কী করেছেন? আপনারা অ্যারেস্ট করবেন। আমি বসে থাকব না। আপনাকেও অ্যারেস্ট হতে হবে। কারণ, আপনি প্রশ্রয় দিয়েছেন।’ এ সময় তিনি গতকাল গ্রেফতার সম্রাট প্রসঙ্গে বলেন, ‘যুবলীগের শ্রেষ্ঠ ইউনিটের শ্রেষ্ঠ সংগঠক ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে।’ এর ঠিক কয়েক দিন আগে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘যুবলীগের সবার আমলনামা আমার হাতে এসেছে। আমি সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলে দিয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রীর এমন কঠোর অবস্থানের পরই র‌্যাব রাজধানীর ফকিরেরপুলে ইয়ংমেনস ক্লাব নামে একটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালায়। সেখানে নারীসহ ১৪২ জনকে আটক করা হয়। ক্লাবের ভেতর থেকে নগদ ২৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বিতর্কিত নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে ধরতে তার গুলশানের ওই বাড়িতে ঘেরাও করে র‌্যাব। পরে প্রায় ৪ ঘণ্টা পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তাকে অস্ত্রসহ আটক করতে সক্ষম হয়। পরে তাকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। আর সম্রাটও ধরা পড়ার পর তাকে গতকাল বহিঃষ্কার করেছে দলটি। ধরা পড়ার পর বহিঃষ্কার যে একটি নাটক তা এখন স্বচ্ছ জলের মতো স্পষ্ট। কারণ, এই সম্রাটকে নিয়েই সাফাই গেয়েছিলেন দলের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক। ১৯৯৩ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম যখন যুবলীগের চেয়ারম্যান ছিলেন তখন ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পান এই সম্রাট। ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েই বেপরোয়া হয়ে উঠতে থাকেন সম্রাট। নিজের ওয়ার্ড সভাপতি লুৎফুর রহমানকে প্রহারের অভিযোগও উঠেছিল তার বিরুদ্ধ। কিন্তু ওই ঘটনায় সম্রাটসহ তিনজনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হলেও পরে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। তারপর থেকে মতিঝিলের ক্লাব পাড়ায় সম্রাটের আনাগোনা বেড়ে যায়। আর ২০০৩ সালে যুবলীগের কাউন্সিলে জাহাঙ্গীর কবীর নানক ও মির্জা আজম দায়িত্ব পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সম্রাটের আসা-যাওয়া বেড়ে যায় বলেও জানা যায়। তখনই ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পান মহিউদ্দিন মহি এবং সাধারণ সম্পাদক হন নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন। সে সময় মহির সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে শাওন নিজের হাত শক্ত করতে সম্রাটকে দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক করেন। পরে শাওনের বিশ্বস্ত হিসেবেই সম্রাট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সাল থেকে ঢাকা সিটি কর্পোরশনের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করতেন।

২০১২ সালে ওমর ফারুক চৌধুরী যুবলীগের চেয়ারম্যান হওয়ার পর সম্রাট ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি হন। সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর তার ‘বেস্টফ্রেন্ড’ আরমানকে সহ-সভাপতি করে নেন তিনি। পরে সম্রাট-আরমান মিলে ঢাকা মহানগর উত্তরের অন্তর্গত মৎস্য ভবন, বিদ্যুৎ বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সকল সরকারি দপ্তরের দরপত্রও নিয়ন্ত্রণ করতেন। 

ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বাদ পরেনি ক্রীড়াঙ্গনও। মতিঝিলে মোহামেডান ক্লাবের অবৈধ ক্যাসিনো বন্ধের পর গত ২৬ সেপ্টেম্বর ক্লাবের ‘ডিরেক্টর ইনচার্জ’ লোকমান হোসেন ভূঁইয়া গ্রেফতার হন। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের অন্যতম পরিচালক লোকমান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডেরও পরিচালক। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় রাজধানীর কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি সফিকুল আলম ফিরোজ। 

মূলত এই সব চরিত্রের পেছনে লুকিয়ে আছে আরও কিছু চরিত্র। শক্ত কিছু হাত। শর্ষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এই সব শক্তিশালী ছায়াভূতকে সামনে এনে শাস্তি না দিলে নতুন করে তৈরি হবে আবারও সম্রাট, খালেদ, শামীম, লোকমান, আরমানের মতো শতো শতো ভূত। আমাদের মনে রাখতে হবে, শর্ষের ভূত কখেনো মরে না।  

Ads
Ads