নতুন করে ঋণ পেতে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের সাথেও বৈঠক করেছিলেন সেলিম প্রধান!

  • ২-Oct-২০১৯ ০৬:৫৫ অপরাহ্ন
Ads

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

র‌্যাবের ভাষ্যমতে, জোট সরকারের আমলে হাওয়া ভবনের দোর্দ- প্রভাবশালী বিতর্কিত ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন সেলিম প্রধান। এক জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগের সরকারের সময়ও ক্ষমতার কাছাকাছিই ছিলেন তিনি। এ সময়ে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি আরও বেড়েছে। সব সময় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা সেলিম দীর্ঘদিন জাপানে ছিলেন। সেখানে এক নারীকে বিয়ে করেন। স্ত্রীর টাকা আত্মসাৎ করেই কোটি টাকার মালিক হন।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংকপাড়ায়ও বেশ প্রভাব ছিল সেলিম প্রধানের। জাপান-বাংলাদেশে সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পেপার্স লিমিটেডের (জেবিএসপিপিএল) নামে রূপালী ব্যাংক থেকে ১০৭ কোটি টাকা নিয়ে খেলাপি হন। কিস্তির টাকা চাইলেই কর্মকর্তাদের ক্ষমতার প্রভাব খাটাতেন।

সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে কয়েকবার রূপালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও লোকাল অফিসও ঘুরে গেছেন। ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় খেলাপি হলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। অবশ্য ২০১৭ সালে জাতীয় সংসদের প্রকাশিত শীর্ষ খেলাপির তালিকায় নাম আসায় সেলিম প্রধান ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদন করেন। এ সময়ও জবরদস্তি করেছেন কর্মকর্তাদের সঙ্গে। প্রয়োজনীয় ডাউনপেমেন্ট না থাকা সত্ত্বেও তার খেলাপি ঋণ নবায়নের অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া যৌথ বিনিয়োগে বন্ধু জাপানি বিনিয়োগকারীর ১০৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ আত্মসাতের চেষ্টাও করেন সেলিম। গতকাল সেলিম প্রধানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের আমলে মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে একটি হত্যার ঘটনায় আসামি হওয়ার পর জাপান পালিয়ে যান সেলিম। ওই সময় জাতীয় পার্টির ঢাকা মহানগরীর কয়েক প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তার বেশ সখ্য ছিল। সেই সূত্র ধরেই দেশ ছাড়েন। সেখানে বিত্তশালী এক জাপানি নারীকে বিয়ে করেন। এক সময় ওই জাপানি নারীর অর্থ আত্মসাৎ করে দেশে ফেরেন। তার পর ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত হন। জড়ান জনশক্তি রপ্তানির সঙ্গে।
থাইল্যান্ডের একটি সূত্র জানিয়েছে, পাতায়ায় এক রাশিয়ান নারীকে বিয়ে করেন সেলিম। ওই সংসারে তার একটি ছেলেসন্তান আছে। তার বাংলাদেশি স্ত্রীও পাতায়ায় থাকেন। এ সংসারে তার কোনো সন্তান নেই।

জানা গেছে, সাবেক এক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পালকপুত্রের সঙ্গে পাতায়ার জন্থিয়ান বিচের নাগাওয়ারিতে একটি বাংলো রয়েছে। ওই বাংলোর দাম প্রায় ৯ কোটি টাকা। ব্যক্তিগতভাবে তিনি আরও দুই বাংলোর মালিক। সব মিলিয়ে শুধু বাংলো খাতেই তার বিনিয়োগ আছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। ওই বিচের পাহাড়ের ওপর তার একটি রাশিয়ান নাইট ক্লাবও ছিল। সেখানে অত্যাধুনিক ৪/৫টি গাড়ি হাঁকান। পাতায়ায় স্পিডবোট এবং জাহাজভাঙার ব্যবসায়ের অংশীদারদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে তার বিরুদ্ধে ৩টি মামলা হয়।

একটি সূত্র বলছে, ক্ষমতাসীন দলের একটি প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে রয়েছে তার দহরমমহরম। এ ছাড়াও জাতীয় পার্টির এক নেতা, যিনি মোহাম্মদপুর এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন; তার বেশ ঘনিষ্ঠ সেলিম প্রধান। মূলত সব সময় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করেন।

এদিকে একাধিক সূত্র জানায়, গত বছরের ডিসেম্বরে বিশেষ ছাড়ে সেলিম প্রধানের খেলাপি ঋণ নবায়নে অনুমোদন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে তাকে ১ বছর গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হয়। অর্থাৎ চলতি বছর ব্যাংকের কোনো অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। আগামী বছর জানুয়ারি থেকে তার কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। আগামী ২০২২ সাল পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবেন তিনি।

রূপালী ব্যাংক সূত্র জানায়, সেলিম প্রধানের অনুমোদিত ঋণসীমা ছিল ৫৯ কোটি টাকা। কিন্তু তার কাছে ব্যাংকের পাওনা ১০৭ কোটি, অনুমোদিত সীমার দ্বিগুণেরও বেশি। রূপালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে সীমার প্রায় দ্বিগুণ ঋণ দেয়।

কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেলিম প্রধান সব সময় সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে ব্যাংকের শাখায় আসতেন। সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বলে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছেন। একাধিকবার তিনি সশস্ত্র অবস্থায় ব্যাংকে গিয়েছেন বলে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

এদিকে কোম্পানি প্রতিষ্ঠার জন্য সেলিম প্রধানের জাপানি বিনিয়োগকারী বন্ধু ইউতাকার কাছ থেকে ১ কোটি ২৫ লাখ ডলার দেশে আনেন। স্থানীয় মুদ্রায় ১০৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা রূপালী ব্যাংকে ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ সুদে মেয়াদি আমানতে রাখা হয়। ওই টাকার লভ্যাংশ চেয়ে জাপানি বিনিয়োগকারী চেষ্টা করেও পাননি। শেষ পর্যন্ত ওই অর্থ ফেরত চেয়ে মামলা করেন জাপানি বিনিয়োগকারী। উচ্চ আদালত জাপানি নাগরিককে অর্থ ফেরত দিতে রায় দিয়েছেন বলে জানা গেছে। ওই জাপানি অর্থ ফেরতের বিষয়ে ব্যাংকের বোর্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।

খেলাপি হওয়ার পর ঋণ পুনঃতফসিল ও নতুন করে ঋণ পেতে সেলিম প্রধান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তিনি অর্থমন্ত্রী ও গভর্নরকে একাধিক চিঠিও দেন। একাধিক চিঠিতে কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম লেখেন। ওই সময় কোনো ডাউনপেমেন্ট ছাড়াই ৩ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ নবায়নের আবেদন করেন। সঙ্গে আরও ১২০ কোটি টাকা ঋণের আবেদন করেন রূপালী ব্যাংকে। অবশ্য ঋণ পুনঃতফসিল করলেও নতুন ঋণ দেয়নি ব্যাংকটি।

জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপার্স লিমিটেড ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে জাপান ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে যাত্রা করে। ২০০৯ সালের মার্চে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের চেক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনদসহ বিভিন্ন নিরাপত্তাসামগ্রী ছাপা শুরু করে। ২০০৯ সালের প্রাইম ব্যাংকের ১০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে সেলিম প্রধানকে ঋণ দেওয়া শুরু করে রূপালী ব্যাংক।

আটক হওয়ার পর তার ব্যাংক হিসাব জব্দ ও তলব করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। ব্যাংকগুলোয় পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, সেলিম প্রধানের (পিতা হান্নান প্রধান, মাতা হাসিনা বেগম) নামে কোনো হিসাব অতীতে বা বর্তমানে পরিচালিত হয়ে থাকলে তার যাবতীয় তথ্য (হিসাব খোলার ফরম, কেওয়াইসি, ট্রানজেকশন, প্রোফাইল, শুরু থেকে হালনাগাদ বিবরণী) জরুরি ভিত্তিতে জানাতে হবে। তার এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো আগামী ৩০ দিনের জন্য ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) থাকবে।

Ads
Ads