ভার্সিটিতে-ভার্সিটিতে এত কেন আন্দোলন?

  • ২২-Sep-২০১৯ ০৯:৫২ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান :: 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বেশ সরগরম হয়ে উঠেছিল। গত চারদিন ধরে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) উপাচার্য খোন্দকার নাসির উদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছে শিক্ষার্থীরা। এরআগে এ বছরের মে মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল অফিসার নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার ফল বাতিল ও উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়–য়ার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামেন পরীক্ষার্থীরা। এদিকে গতকাল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে সদ্য যোগদানকারী প্রক্টর ড. মাহবুবর রহমানের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ভার্সিটিতে-ভার্সিটিতে এত কেন আন্দোলন? ঘটনার অন্তরালে কেন এত প্রশ্ন? এদিকে এসব আন্দোলনকে লুফে নিচ্ছে স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী শক্তিরা।  

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ থেকে বড় অংকের চাঁদা দাবি করার অভিযোগে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে সরে যেতে হয়েছে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের ভূমিকা নিয়েও অনেক প্রশ্ন উঠেছে। তার পদত্যাগের দাবিতে গত ১৯ সেপ্টেম্বর ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে মিছিল করা হয়। সমাবেশে বক্তারা উপাচার্যকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় আইনে তার বিচার দাবি করেন। সমাবেশে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের কার্যকরী সদস্য রাকিবুল হক রনি বলেন, ‘ছাত্রলীগ নেতারা স্বীকার করেছেন, উপাচার্য তাদের হলে টাকা পৌঁছে দিয়েছেন। জনগণের রক্ত পানি করা টাকার লুটপাট মেনে নেওয়া হবে না। পদত্যাগের মাধ্যমে উপাচার্যকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।’ ভিসিকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ ও ‘অর্থলোলুপ’ আখ্যায়িত করে ভিসির স্বপদে থাকার নৈতিক অধিকার নেই বলে দাবি করেন ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’। আবার ভিসি ফারজানাকে স্বেচ্ছা পদত্যাগে আগামী পহেলা অক্টোবর পর্যন্ত সময়ও বেধে দেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলন, পদত্যাগের জন্য সময় বেধে দেওয়ার পর লজ্জার আর কী বাকি থাকতে পারে? 

জাবির আন্দোলন কাটতে পারলো না, এরই মাঝে বিতর্ক দেখা দিলো গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে নিয়ে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ফাতেমা-তুজ জিনিয়াকে বহিষ্কার করা হলো। কারণ হিসেবে উপাচার্য ড. খন্দকার মো. নাসিরউদ্দীন বলেছেন, ‘ওই ছাত্রী তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করেছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল।’ এদিকে জিনিয়া অভিযোগ করেছেন, ‘তার সাংবাদিকতা এবং ফেসবুক স্ট্যাটাসের জের ধরে তাকে কর্তৃপক্ষ সাময়িক বহিষ্কার করেছে।’ জিনিয়ার অভিযোগের বিষয়টি সবার সম্মুখে ছিল, কিন্তু ভিসির পক্ষে কোনো কি প্রমাণ ছিল? এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে, বিশেষ করে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্ণধার হয়ে তার অবশ্যই প্রমাণ নিয়ে মিডিয়াতেই কথা বলা উচিৎ ছিল। এদিকে আন্দোলন থামাতে না পেরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করলেন। কিন্তু আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হলো। ‘হামলা তিনি করিয়েছেন’ এমন অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে গেলেও দায় কিন্তু তারই থাকে। তিনি হামলা না করিয়ে থাকলেও তার বোঝা উচিৎ ছিল, আন্দোলনের ফায়দা যেন কেউ না নিতে পারে সে জন্য আন্দোলনরতদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এতে নিশ্চয় তিনি প্রশংসিত হতেন, নিচে নেমে যেতেন না। জানা যায়, তিনি শুধু গত এক বছরেই অন্তত ২৭ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের নোটিশের মুখোমুখি করেছেন।

ছাত্রলীগ থেকে শোভন-রব্বানীকে সরিয়ে দেওয়ার পরপরই বেরিয়ে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সম্বন্ধীয় থলের বেড়াল। বিশ্ববিদ্যালয়টির কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের জন্য ছাত্রলীগের ৩৪ নেতাকে চিরকুটের মাধ্যমে ছাত্রত্ব দিয়ে নির্বাচনের সুযোগ করে দেওয়ায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের পদত্যাগের আন্দোলন জেঁকে বসছিল। সেখানে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তরা আন্দোলনকে থামিয়ে দেয়। যদিও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার তথ্য আমদের সামনে ফুটে ওঠে। 

এ বছরের মে মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল অফিসার নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার ফল বাতিল ও উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়ার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামেন পরীক্ষার্থীরা। এ সময় আন্দোলনরত ছাত্ররা ভিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। কিন্তু সেটি সম্ভব না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেন তারা। পরে ওই মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফল বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সুকৌশলে তাদের ইচ্ছামতো ফল প্রকাশ করেছে। লিখিত পরীক্ষায় ৮০০ নিয়োগপ্রার্থীকে পাস করানো হয়েছে। এর ভেতর থেকে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে ২০০ জন পাবেন কাক্সিক্ষত সোনার হরিণ। যেখানে পরীক্ষায় অংশ নেন ৮ হাজার ৫৫১ চিকিৎসক।’ 

এদিকে ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ, শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে ড. মাহবুবর রহমানকে ইসলামী বিদ্যালয়ের প্রক্টর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের ব্যক্তিকে প্রক্টর পদ থেকে না সরালে আমরা আন্দোলন বন্ধ করব না বলে গতকাল ইবি শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। এ বিষয়ে প্রক্টর ড. মাহবুবর রহমান বলেছেন, ‘মাদক ও বহিরাগত মুক্ত ক্যাম্পাস গড়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় ছাত্রলীগের বিদ্রোহী গ্রুপের নেতাকর্মীরা আমার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে। তবে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার বিঘœ ঘটালে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

এছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রক্টরদের নিয়ে নানা স্ক্যান্ডেল রয়েছে। তার বিরুদ্ধে আন্দোলন হতে দেখা গেছে হরহামেশাই। বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অনেক কর্মকা- নানা সময় যে বিতর্ক সৃষ্টি করছে, সে জন্য রাজনীতির প্রভাব বৃদ্ধির বিষয়কে একটা বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। অনেকে বলেছেন, ৫০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চারটি অর্থাৎ ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, যেটি পরে আইন হয়েছে, সে আইনে চলে। এই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেটে ভোটাভুটির মাধ্যমে উপাচার্য হিসেবে তিনজনের নাম প্রস্তাব করলে চ্যান্সেলর হিসেবে রাষ্ট্রপতি সেই তালিকা থেকে একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ করেন। কিন্তু এই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোটিতেই এখন এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত উপাচার্য নেই। বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আলাদা আলাদা আইন আছে। তবে সে আইন অনুযায়ী ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাচনের কোনো প্রক্রিয়া নেই। রাষ্ট্রপতিই উপাচার্য নিয়োগ করে থাকেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক মরিয়ম বেগম বলছিলেন, ‘নিয়োগে যেমন সমস্যা আছে, একইসঙ্গে উপাচার্য হওয়ার পর সেই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টার কারণেও অনেক সময় সংকট তৈরি হচ্ছে। পদের একটা ক্ষমতা আছে। সেই ক্ষমতা আমি তো হারাতে চাইবো না। সে জন্য হয়তো কাজগুলো বিতর্কের পর্যায়ে চলে যায়।’

যে ভিসিরা শুধু তাদের ক্ষমতার আসনটি ঠিক রাখতে গিয়ে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের আহত করাতে পারেন, আর যা-ই হোক তাদের কাছে কোনোভাবেই শিক্ষা ব্যবস্থাপনা নিরাপদ নয়। শিক্ষকদের খুব ভালো করে মনে রাখা প্রয়োজন যে উপাচার্য পদটি সাময়িক। কিন্তু শিক্ষক পরিচয়টি স্থায়ী। 

Ads
Ads