এক মিয়া জাহানেই লন্ড ভণ্ড রেল অপারেশন

  • ১৮-Sep-২০১৯ ০৫:১৯ পূর্বাহ্ণ
Ads

সংকট নিরসনে নিষ্ক্রিয় মন্ত্রণালয়, অবশেষে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা

:: নিজস্ব প্রতিবেদক ::

বাংলাদেশ রেলওয়ে দেশের অন্যতম সরকারি সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান। দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ ট্রেনযোগে যাতায়াত করে থাকে। ইতোমধ্যে রেলপথে যাত্রীসেবা দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত প্রচেষ্টায় অবহেলিত রেলপথের উন্নয়নে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে ২০১২ সালে তিনি রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠন করেন। তারপর থেকে রেলের শুধু উন্নয়ন আর উন্নয়ন। বর্তমানে রেলওয়ের রেকর্ডসংখ্যক প্রায় ২.৫০ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ রেলওয়েকে উন্নত বিশ্বের আদলে গড়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তথা বর্তমান সরকারের আন্তরিকতা সাধারণ জনগণকেও আলোড়িত ও মুগ্ধ করেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, রেলওয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি অপারেশনাল ব্যবস্থার যে উন্নতি করার কথা- তা মোটেও

বাস্তবায়িত হয়নি। বরং অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গত কোরবানির ঈদ থেকে এখন পর্যন্ত রেলওয়ের অপারেশন ব্যবস্থা ও শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে বাণিজ্যিক সক্ষমতা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। রেল সংশ্লিষ্টগণের মতে, রেলওয়ের অপারেশন ও বাণিজ্যিক বিভাগের ব্যর্থতার কারণে সকল অর্জন ও সুনাম বর্তমানে ম্লান হওয়ার পথে। এভাবে চলতে থাকলে রেলওয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে একদিন ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অপারেশন ও বাণিজ্যিক বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে মিয়া জাহান প্রাক্তন রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হকের সময়ে [অতিরিক্ত মহাপরিচালক, অপারেশন] পদে পদায়িত হন। পদায়িত হওয়ার পর মিয়া জাহানের অদক্ষতা, স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি সর্বোপরি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত অসদাচরণের কারণে মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় তখনই তাকে পদ হতে অপসারণ করা হয়েছিল। তবে বর্তমান রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন দায়িত্বভার গ্রহণ করার পরপরই মিয়া জাহান পুনরায় [অতিরিক্ত মহাপরিচালক, অপারেশন] পদে পদায়িত হন। বিষয়টি নিয়ে রেল সংশ্লিষ্টগণের মধ্যে ক্ষোভ ও আর্থিক সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন উদিত হলেও ভয়ে কেউ মুখ খোলেনি।

সাম্প্রতিক সময়ে রেলওয়ের ভয়াবহ শিডিউল বিপর্যয় ও চরম অব্যবস্থাপনার কারণে যাত্রী সাধারণের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। সাধারণ যাত্রীদের নিকট রেলওয়ের সুনাম ক্ষুণ্ণ হওয়ার পাশাপাশি রেলপথমন্ত্রীর প্রশাসনিক দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের উদ্ভব হতে শুরু করেছে। রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেল অপারেশন সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাঠপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য মতে, দ্বিতীয়বার মিয়া জাহান এডিজি [অপারেশন] দায়িত্ব নেওয়ার পর সর্বক্ষেত্রে ধরাকে সরা জ্ঞান করে পথ চলছে। ট্রেনের অপারেশনাল কাজ দুই জোন পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চল এবং ৪টি ডিভিশন থেকে সমন¦য় করে পরিচালনা করার কথা থাকলেও মিয়া জাহান একক সিদ্ধান্তে সব করছেন। তিনি জোনাল জিএম বা সিওপিএসদের তাতে সম্পৃক্ত বা সমন্বয় না করে নিজের খেয়াল-খুশি মতো নানামুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এতে রেল অপারেশনে সৃষ্ট হ-য-ব-র-ল অবস্থা সেই কোরবানির ঈদ থেকে এখনো বিরাজমান।

মাঠপর্যায়ের ক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের মতে, পশ্চিমাঞ্চল রেলের শিডিউল বিপর্যয় এখনো চলমান। উপস্থিত কিছু পলিসি থাকে, বাস্তবে মাঠপর্যায়ের কোনো কিছু না জেনে-বুঝে রেল ভবন থেকে মিয়া জাহান একাই সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে এই বিপর্যয় কোনোভাবেই ঠেকানো যাবে না। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা আরও জানান, যমুনা সেতুতে যে পরিমাণ ট্রেন চলতে পারে মিয়া জাহান তার দ্বিগুণ শিডিউল দিয়ে রেখেছেন। রেলমন্ত্রীর বাড়ি পঞ্চগড়, মন্ত্রীকে খুশি করতে পঞ্চগড়ে অতিরিক্ত ১টি সহ মোট ৩টি (পঞ্চগড়, বনলতা ও বেনাপোল এক্সপ্রেস) নতুন ট্রেনের শিডিউল দিয়ে রেখেছে। যমুনা সেতু ক্রসিংয়ে এই ট্রেনগুলোর অতিরিক্ত সময় ব্যয় হওয়ার কারণে কিছুতেই পশ্চিমাঞ্চল ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় কাটছে না। এসবের ফলশ্রুতিতে স্বাধীনতার পর হতে প্রথমবারের মতো এবারই দীর্ঘ সময় রেলের শিডিউলে ভয়াবহ বিপর্যয় চলছে। দেশের সর্ববৃহৎ ও জনপ্রিয় রুট হিসেবে খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে চলাচলরত ট্রেনসমূহ কমলাপুর স্টেশনের ২ ও ৩নং প্ল্যাটফর্ম হতে ছাড়া হতো, যাতে অতিসহজেই যাত্রী সাধারণ ট্রেনে উঠানামা করতে পারতেন। বর্তমানে মিয়া জাহান চট্টগ্রাম রুটের সকল ট্রেনকে ৭ ও ৮নং প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়ার নির্দেশনা দিলে যাত্রীগণ হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

এতে বাণিজ্যিক রাজধানীর সম্মানিত যাত্রী সাধারণের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। পাশাপাশি টিকিট বিক্রিতেও রয়েছে নানা অনিয়ম। রেল ভবনের কাজ হলো পলিসি নির্ধারণ করা অথচ মিয়া জাহান নিজেই তা কার্যকরের দায়িত্ব নিয়ে রেলওয়েকে এক ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে নিমজ্জিত করছেন। টিকিট বিক্রয় পরিকল্পনায় নানা ধরনের সিদ্ধান্তের কারণে যাত্রীদের ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছে। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় চরম শিডিউল বিপর্যয়ে দেশের প্রায় সব প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রচার করা হলেও রেলপথ মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে দায়ীদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। উল্টো দায় নিজেদের কাঁধে নিয়ে মন্ত্রী ও সচিব জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু সংকট হতে উত্তোরণের জন্য অদ্যাবধি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। রেলওয়ের দায়িত্বশীল সূত্র হতে জানা যায়, যমুনা সেতুর ওপর দিয়ে দৈনিক ২৪টি ট্রেন চলাচলের সক্ষমতা থাকলেও ৪৪টি দৈনিক চলাচল করত। তার পরও অতিরিক্ত বনলতা এক্সপ্রেস, পঞ্চগড় ও বেনাপোল এক্সপ্রেস নামে ৩টি বিরতিহীন ট্রেন চালু করার কারণেই শিডিউল বিপর্যয়ে এই ভয়াবহতা চলছেই। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিকট হতে কোনোরূপ মতামত না নিয়ে এই ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ শিডিউল বিপর্যয়ের মূল কারণ। নতুন আমদানি করা কোচ দিয়ে চলমান ট্রেনগুলোর সক্ষমতা (কম্পোজিশন) বৃদ্ধি করার জন্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাগণ সুপারিশ করলেও মন্ত্রী-সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের ভুল তথ্য দিয়ে মিয়া জাহান নতুন ট্রেন চালু করেন। অথচ বর্তমানে যমুনা সেতুতে সক্ষমতার দ্বিগুণ ট্রেন চলাচল করছে। নতুন রেল সেতু নির্মাণ না হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান সেতুর ওপর দিয়ে নন স্টপ ট্রেন চালু করায় বিভিন্ন স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেন বসিয়ে রাখায় যাত্রীগণ চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। কিছুতেই সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না যাত্রীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের অপারেশন ও কমার্শিয়াল বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার বরাতে আরও জানা যায়, মিয়া জাহান কর্মজীবনে কখনোই দক্ষতার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে কাজ করতে পারেননি। তিনি [ডিসিও, ঢাকা] থাকা অবস্থায় কমলাপুর ও সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের পেনশনের নগদ কয়েক কোটি টাকা চুরির ঘটনা ঘটেছিল। তদন্ত কমিটি সেসময় দায়িত্বে অবহেলার জন্য এই মিয়া জাহানকে তিরস্কারও করেছিল।

ক্যাটারিং সার্ভিস নিয়োগ করা সিসিএমগণের দায়িত্ব হলেও সাম্প্রতিক সময়ে অর্থের বিনিময়ে বিনা টেন্ডারে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনের ক্যাটারিং সার্ভিস জনৈক বাবু (প্রতিষ্ঠান :শরীফ হোটেল) নামে এক ঠিকাদারকে নিয়োজিত করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার নিজ বিভাগে অনেক পদ শূন্য থাকলেও দীর্ঘদিন তা পূরণে কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়নি। পদোন্নতি প্রত্যাশী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এডিজি (অপারেশন) মিয়া জাহান অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে থাকেন। আমরা টাকাও দিতে পারি না, আমাদের পদোন্নতিও হয় না। কোনোদিন হবে কিনা কেউ বলতে পারে না।

বর্তমানে রেলওয়ের উন্নয়ন কর্মকা-ে সিভিল, মেকানিক্যাল, ইলেক্ট্রিক্যাল ও সিগন্যালিংসহ সকল বিভাগ দিনদিন উন্নতির দিকে এগোলেও পিছিয়ে পড়েছে অপারেশন ও বাণিজ্যিক বিভাগ। অথচ অপারেশন ও বাণিজ্যিক বিভাগই সাধারণ জনগণের কাছে রেলওয়েকে উপস্থাপন করে থাকে। এক মিয়া জাহানই এ জন্য এককভাবে দায়ী। অচিরেই অপারেশন ও বাণিজ্যিক বিভাগকে ঢেলে সাজানো না হলে রেলওয়ের উন্নয়নে সরকার গৃহীত মেগা প্রকল্প গ্রহণসহ সকল উন্নয়নই ম্লান হবে বলে সংশ্লিষ্টগণ মনে করেছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে অতিরিক্ত মহাপরিচালক [অপারেশন] মিয়া জাহান কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলেন, ঈদ চলে গেছে, এতদিন পর নতুন করে শিডিউল বিপর্যয়ের কাহিনি বানাবেন না। গত বুধবার সংসদীয় কমিটিতে শিডিউল বিপর্যয়ের এজেন্ডা ছিল মনে করিয়ে দিতেই তিনি কিছুটা চুপসে যান। এ সময় তিনি চটজলদি বলে ওঠেন, সংসদীয় কমিটিতে আমরা পেপার দিয়ে দিয়েছি। শিডিউল বিপর্যয়ে দায়ী কতটুকু, দূরীকরণে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঈদে অতিরিক্ত যাত্রী আর বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর নিকটে দুটি দুর্ঘটনাই শিডিউল বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। তিনি জানান, কোনোভাবেই ট্রেনের ছাদে আর যাত্রী উঠবে না, ইতোমধ্যেই অভিযান শুরু হয়েছে। এটা ধরে রাখতে হবে। এতটুকু বলেই তিনি মুঠোফোনের লাইন কেটে দেন।

মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান বলেন, ঈদে অতিরিক্ত যাত্রী বহন আর বঙ্গবন্ধু সেতুর নিকটে দুর্ঘটনা না ঘটলে শিডিউল বিপর্যয় এতটা হতো না। এ বিষয়ে রেল সচিব মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, গত বুধবার সংসদীয় কমিটির বৈঠকে রেলের শিডিউল বিপর্যয়ের একটি এজেন্ডা উপস্থাপিত হলেও পুরোপুরি আলোচনা হয়নি। রেলের শিডিউল বিপর্যয়ের জন্য তিনি এককভাবে মিয়া জাহানকে দায়ী করতে নারাজ। ঈদে স্পেশাল ট্রেন চালনা এবং বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর আগে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাকেও রেলের শিডিউল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ বলে তিনি মনে করেন। সাম্প্রতিক সময়ে অর্থের বিনিময়ে বিনা টেন্ডারে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনের ক্যাটারিং সার্ভিসে জনৈক বাবু নামে এক ঠিকাদারকে নিয়োজিত করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে মিয়া জাহানের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে রেলসচিব মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি, আমাকে একজন বলেছেন। আমি অবশ্যই তদন্ত করে দেখব। তিনি আরও বলেন, সচিব হিসেবে আমার দরজা সবসময় খোলা। যে কোনো সমস্যার সমাধানে আমরা অনড় রয়েছি।

রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, মিয়া জাহানের ব্যর্থতার চেয়েও শিডিউল বিপর্যয়ের কারণগুলো যৌক্তিক-সিঙ্গেল লাইন। একলাইনে ট্রাপিক অনেক। ডাবল লাইন না হলে এ বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হবে না।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী বলেন, রেলওয়ের সাম্প্রতিক সময়ের শিডিউল বিপর্যয়ে আমরা বিব্রত। বিষয়টি গত বুধবার সংসদীয় কমিটির সভায় আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অচিরেই শিডিউল বিপর্যয় এড়াতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

Ads
Ads