ছেলেকে নিয়ে পীর হাবিবুর রহমানের আবেগঘন স্ট্যাটাস

  • ১০-Sep-২০১৯ ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

বাবা,
অন্তর
মহান আল্লাহর কাছে তোমার ভবিষ্যৎ সমর্পন করে তোমাকে শুভ বিদায় জানালাম।তুমি দীর্ঘ আকাশপথ ভ্রমন শেষে যখন নিউক্যাসল এয়ারপোর্টে নামবে তখন সেখানকার সময় দুপুর ১২টা পাঁচ মিনিট। ঢাকায় সন্ধ্যা নামবে। মাঝখানে দুবাই তোমার যাত্রাবিরতি। ততক্ষন তোমার পরিবার উদ্বেগে থাকবে। এটাই জাগতিক জীবনের  গভীর এক মায়া। এক অদ্ভূত আত্নিক টান। আল্লাহ মহান ও দয়াময় তোমাকে সহিসালামতে গন্তব্যে পৌঁছাবেন এবং তুমি তার অসীম করুনায় আমার আত্নবিশ্বাসকে জয়ী করে সফলতার সাথে লেখাপড়া শেষ করে ফিরে আসবে।

প্রিয় অন্তর,
বিদায়কালে তুমি কাঁদছিলে, তোমার মা চাচী বোন ভাইও কাঁদছিলো।তার আগে তুমি সুনামগন্জে সবার ভালোবাসায় অশ্রুসিক্ত হয়ে এসেছো।মিসবাহ তোমাকে শিশুকাল থেকেই আদর ও প্রশ্রয় দিয়েছে, গভীর স্নেহে। তাই তুমি তাকেও জড়িয়ে ধরেছো ভীষন আস্হা নির্ভরতায়।
আমি কেবল নিঃশব্দ বেদনা ও বুকটাজুড়ে গভীর ক্রন্দন অনুভব করেছি। ভারি পাথরের চাপ যেনো বোবা করে রেখেছিলো। পৃথিবীর সকল মা ও বোনদের গভীর মায়া মমতা বড় বেশী আবেগময় দৃশ্যমান। তেমনি সকল পিতার স্নেহ ও মমতা যতোই গভীর হোকনা কেনো তা ততোই নিঃশব্দ ও নিরব। তা কেবল বুঝা যায়,বুঝানো যায়না।
 
বাবা
অন্তর,
মনে হয় এইতো সেদিন তুমি জন্মেছিলে!আমার কাছে এখনো সে এক মহা জাগতিক সূখ ও বিস্ময়! কতো বুকে পিঠে কোলে কাধে চড়িয়েছি, কতো খেলেছে,মজা করেছি! তবু মনে হয় তোমাকে তোমার প্রাপ্য সময় আমার অনেক দেয়া হয়নি! একজন পেশাদার রাজনৈতিক রিপোর্টার হিসেবে জীবন যেমন আমার নিয়ত যুদ্ধের তেমনি কাজটি ছিলো নেশার মতোন ইবাদত।মধ্যরাত পার করা আমি ঘরে ফিরে দেখেছি তোমার ঘুমন্ত চাঁদমুখ।তুমি ভোরে যখন জেগেছো, আমি তখন ঘুমে! আবার যখন বেলা করে ঘম থেকে উঠে বের হচ্ছি তখন তুমি ঘুমে। দিনে দিনে বেড়ে ওঠেছো তুমি, তোমাকে হয়তো আরো সুন্দর পরিবেশ দিতে পারতাম কিন্তু পারিনি। তবে তোমার স্বাধীনতা ও বায়নাপূরনে আমি সর্বোচ্চ দেবার চেষ্টা করেছি।ওলেভেলে একবার হোচট খাবার পর ঘুরে দাঁড়িয়ে যেভাবে তুমি আইনে গ্রাজুয়েশন নিয়ে বারএটল পড়ার সূযোগ পেয়েছো সে তোমার অভূতপুর্ব অর্জন।আমি আশাবাদী তুমি এবারও সফল হয়ে ফিরে আসবে। তাই তোমার এ বিদায় জগৎ সংসারে আনন্দের হলেও কার্যত পিতার সাথে জাগতিক জীবনে নিয়মের ছকে বাধা বিচ্ছেদের সূচনাপর্বও বলা যায়। ফিরে এসে তুমি তোমার পেশাদারিত্বের জায়গায় সততার সাথে লড়াই করে মেধা ও যোগ্যতায় নিজের জীবন ও জগৎ আলোকিত করবে এটাই আমার আশা। একদিন তোমারও ঘর হবে সংসার হবে সন্তান হবে, পিতা হবে তখন আমাকেই নয়, তাবৎ পৃথিবীর বাবাদের মনের খবর জানবে। তোমার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আমি বেঁচে থেকে সুখীমনে উপভোগ করতে চাই।

অন্তর,
তোমাকে নিয়ে আকাশে যখন অ্যমিরেটসের উড়োজাহাজ উড়ছে, তখন আমি তোমাকে ঘিরে নস্টালজিক হচ্ছি। আমার পরিবারে আমাদের পরের প্রজন্মের তুমিই প্রথম বাড়ি আলোকিত করেছিলে। সবার উজার করা আদর যেমন পেয়েছো, তেমনি তুমি তোমার প্রানবন্ত কোমল মন নিয়ে সবাইকে ভালোবাসায় ধরে রেখেছো, পরিবার আত্নীয় ও মানুষমুখী, বন্ধুবৎসল তোমার চরিত্র আমাকে মুগ্ধ করেছে। তোমাকে একবার কড়া শাসন করতে গিয়ে আমি খুউব কষ্ট পেয়েছি, বাবাদের কষ্ট আড়ালেই থাকে। তবু তোমাকে মহান সসব মানুষের উদাহরন দিয়ে বারবার পাঠ দিয়েছি, মাতৃভক্ত বা মাকে সূখী করা সন্তানরাই বড় হয়। তুমি মানুষকে সম্মান করার ভালোবাসার যে শক্তি অর্জন করেছো, সেটি বাড়াবে হারাবেনা।

আমার
অন্তর,
তোমাকে ভালোফলাফলের চাপ কখনো দেইনি আমি। বলেছি একজন আত্নমর্যাদা সম্পন্ন আদর্শিক মানুষ হও, ভালো মানুষ।আর জীবনে কি হয়েছো সেটি বড় কথা। জগৎবিখ্যাত মানুষদের জীবনের গল্প শোনিয়েছি, জানতে বলেছি।

পারিবারিক পাঠশালা তোমাকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, অসাম্প্রদায়িক গনতান্ত্রীক মনোভাব সম্পন্ন এক রাজনৈতিক সচেতন তরুনে পরিনত করেছে।তোমার সাথে আমার রাজনীতির সেকাল একাল, সমাজ, বিশ্বরাজনীতির আলোচনা থেকে ইউরো ফুটবল হয়ে ক্রিকেট দুনিয়ার গল্পগুলি মিস করবো। আমাদের প্রখর সেন্স অব হিউমার নিয়ে প্রতিটি আড্ডা ছিলো আনন্দময়।

অন্তর,
ভদ্র বিনয়ী একজন শিক্ষিত মানুষ হবার দরোজায় তুমি প্রবেশ করেছো।দুনিয়া তোমার সামনে।কত দেশের কত মানুষ ও সংস্কৃতির সাথে তোমার পরিচয় ঘটবে,নিজের সংস্কৃতি পারিবরিক মূল্যবোধ সামাজিক রীতি ধরে যতোটা উত্তম ততোটা আহরন করো।আর পাঠ্যসূচীর বাইরে দুনিয়াকে জানার জন্য ব্যাপক পড়াশোনা ও মানুষ থেকে পাঠ নিতে শেখো।

তোমাকে আরো বলেছি, পড়াশোনার সময়টাতেই অভিজ্ঞতা অর্জন করো জীবনের।এবং জীবনকে গড়ো। তোমাকে অনেকবার বলেছি গল্পে, আমাদের আট ভাইবোন নিয়ে বাবা-মার টানাপোড়েনের সংসার হলেও আমরা সুখী ছিলাম। তোমার দাদা দাদী আল্লাহর কাছে নিজেদের সমর্পন করে সহজ সরল পবিত্র মানুষ হিসেবে, আমাদেরকে অসাম্প্রদায়িকতার পাঠ দিয়েছেন। নিজেরাও সবাইকে আত্নিকবাধনে জড়িয়েছেন। আর আমরা কখনো আত্নমর্যাদা হারিয়ে পথ চলতে শিখিনি, স্বার্থের জন্য ব্যক্তিত্ব রুচি আভিজাত্য বিসর্জন দেইনি, তুমিও দেবেনা।

অন্তর
তোমার দাদু বলতেন, জীবন বড় কঠিনরে বাবা।সত্যি কঠিন। জীবন এক যুদ্ধ ক্ষেত্র আদর্শিক নীতিবান ব্যক্তিত্ববোধ সম্পন্ন মানুষদের জন্য।মহান ব্যক্তিদের জীবনী থেকে সেই পাঠ তোমাকে দিয়েছি, দিতে চেষ্টা করেছি। আমরা তবুও শৈশব কৈশোরে আদর্শিক সমাজ ও মহান মানুষদের পেয়েছি। তোমাদের দূর্ভাগ্য, অশান্ত বিশ্বে তোমাদের সামনে আইডলের বড় অভাব। একটা সুবিধাবাদী নষ্ট আদর্শহীন সমাজে বড় হয়েছো, এটাও অভিজ্ঞতা।তাইতো বলি, পড়াশোনা করে সফল হয়ে ফিরে এসে তুমি কঠিন পথেই নিজেকে প্রতিষ্টিত করো লোভ মোহের উর্ধ্বে ওঠে। তুমি তোমার দেশ ও মানুষের জন্য ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ কখনোই হারিওনা। আমার স্বপ্নের চেয়ে বড় হও বাবা। শরীরের যত্ন নিও।

আমার অনেক যন্ত্রনা কষ্ট ও দুঃসময়ে তুমি আমার কি যে শক্তি ছিলে শিশুকাল থেকে, বুঝাতে পারবোনা। বাবা, তুমি সফল হয়ে আরও বড় শক্তিই নয়, ছায়া হয়ে ফিরে আসো।
 

Ads
Ads