ডিএসসিসির পশুর হাটের টাকা যাচ্ছে সিন্ডিকেটের পকেটে

  • ১৯-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: কাওসার মাহমুদ ::

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অস্থায়ী পশুর হাটের বিপুল পরিমান রাজস্বের টাকা চলে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন সিন্ডিকেটের পকেটে। রাজস্ব আয়ের বৃহৎ অংশ তাদের হাতে তুলে দিতে সকল দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে ডিএসসিসির কর্মকর্তারা। ফলে করপোরেশন কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হবে।

জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ( ডিএসসিসি)  পুরানো ১৩টি ও নতুন ২টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর জন্য প্রতিবছরের ন্যায় এবারও দরপত্র আহ্বান করে। ডিএসসিসি ৭টি হাটের ইজাড়া দিতে পারলেও সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে বাকি ৮টি হাটের ইজাড়া আটকে যায়।

এসব হাটের জন্য ৩বার দরপত্র আহ্বান করলেও একটি দরপত্রও জমা পড়েনি ডিএসসিসিতে। তাই বাধ্য হয়ে ডিএসসিসি ওই সব হাটে খাস আদায় করার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে ডিএসসিসি প্রায় ৭ কোটি টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হবে। ডিএসসিসির ১৫টি হাটের ইজারা মূল্য ধরা হয়েছে ১২ কোটি ১৮ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৫ টাকা। কিন্তু এখনও ৭টি হাটের ইজাড়া বাবৎ ৩ কোটি ৩৯ লাখ ২৭ হাজার ১৫০ টাকার রাজস্ব আয় হয়েছে। বাকি প্রায় ৮ কোটি ৭৯ লাখ ১০ হাজার ৫২৫ টাকার রাজস্ব আদায় অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

সূত্র জানায়, দরপত্র জমা না পড়া হাট গুলোতে ডিএসসিসি স্থানীয় ব্যাক্তিদের মাধ্যমে খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়। এসব খাস আদায়কারীদের নিকট হতে এককালীন টাকা আদায়ের মাধ্যমে তাদেও অনুকুলে কার্যাদেশ দেয়া হয়। কার্যাদেশ পাওয়া হাটগুলোর মধ্যে ৩২ নং ওয়ার্ড সামসাবাদ মাঠ সংলগ্ন সিটি করপোরেশনের খালি জায়গা এক কোটি পঞ্চান্ন লক্ষ টাকায় খাস আদায়ের দায়িত্ব পেয়েছেন অনির্বাণ যুব সংসদ এর কাইয়ুম নামে এক ব্যাক্তি। হাটটির সরকারী মূল্য ৪ কোটি ১২ লক্ষ ৪৩ হাজার ৮শত ৯৭ টাকা ধার্য ছিল।কমলাপুর ষ্টেডিয়াম ও আশপাশের এলাকা ৩০ লক্ষ টাকায় খাস আদায় করছে লিটিল ফ্রেন্ডস কাবের আমের খান নামে এক ব্যাক্তি। হাটটির সরকারী ধার্য মূল্য ছিল ৪০ লক্ষ ৫০হাজার ১৯৫ টাকা।

শনির আখড়া ও দনিয়া মাঠ সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গায় খাস আদায়ের দায়িত্ব পেয়েছেন ধনিয়া সমাজ কল্যান পরিষদের মোস্তাক আহমেদ ১কোটি ৫লক্ষ টাকায়। এটির সরকারী মূল্য ২ কোটি বিশ লক্ষ টাকা। ধুপখোলা মাঠটি ৩০লক্ষ টাকায় পেয়েছেন সীমান্ত গ্রন্থাগারের মো. হাসান আসকারী। হাটটির সরকারী মূল্য ছিল ৭০লাখ ১৪হাজার টাকা।৪১ নং ওয়ার্ডের কাওয়ার টেক মাঠ দক্ষিণ মুহসেন্দী পঞ্চায়েতের পক্ষে ফরহাদ ভুইয়া বাবু ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে খাস আদায়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। হাটটির সরকারী মূল্য ছিল ৫২লক্ষ টাকা। গোলাপবাগ মাঠটি পেয়েছেন বর্ণালী সংসদের পক্ষে আসরাফুল ইসলাম আশরাফ ৩০লক্ষ টাকার বিনিময়ে।

এ হাটটির সরকারী মূল্য ছিল ৭৪ লক্ষ টাকা।মেরাদিয়া লোহার পুলের পূর্ব অংশ মাঠটি ৫৫লক্ষ টাকায় পেয়েছেন মাদ্রাসা মারকাজুল হকের পক্ষে মোহাম্মদ আলী নামে এক ব্যাক্তি। হাটটির সরকারী মূল্য ছিল ৬৮লক্ষ ২১হাজার ২শত ৭৮টাকা ও আমুলিয়া মডেল টাউন ১৫লক্ষ টাকায় খাস আদায়ের দায়িত্ব পেয়েছে আমুলিয়া সমাজ কল্যান সংসদের পক্ষে মো. হেলাল উদ্দিন। এ হাটটির সরকারী মূল্য ছিল ৩৪লাখ ১৫হাজার টাকা। 

জানা যায়, গত ২৭ জুন আসন্ন কোরবানীর ঈদ উপলক্ষ্যে পশু ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য ডিএসসিসি ১৫টি অস্থায়ী হাটের ইজারা দরপত্র আহ্বান করে। পরে ১০ জুলাই দরপত্রের বাক্সে পড়া খামগুলো খোলে ডিএসসিসির হাটবাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি। তখন ৭টি হাটের বিপরীতে ১৯টি দরপত্রের আবেদন পড়েছিল। সে আবেদনগুলোতে ৭টি হাটের কাক্সিক্ষত দর পাওয়ায় ইজারা নিশ্চিত করে কমিটি। দরপত্র আহ্বানের পর পরই টেন্ডার জমা দেয়ার নির্ধারিত স্থানের আশপাশে এই সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে পাহারাদার নিয়োগ করা হয়।

সিন্ডিকেটের বাইরের কেউ চাইলেও দরপত্র জমা দিতে পারেনি। কেউ দরপত্র জমা দিলেও তা প্রত্যাহারের জন্য নানাভাবে বিভিন্ন  মহল থেকে চাপ আসে। সিন্ডিকেটের বাইরে কেউ টেন্ডার জমা দিতে পারেনি বলে জানান একাধিক ব্যাবসায়ী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গত বছর ডিএসসিসি এলাকায় কোরবানির হাটের ইজাড়ায় অংশ নেয়া একজন বলেন, ‘অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পাড়ি দিয়ে গত বছর সিডিউল জমা দিয়েছিলাম। সেটি টের পেয়ে সিডিউল প্রত্যাহারের জন্য সিন্ডিকেটরা হুমকি ধামকি দেয়। জীবনের ঝুঁকি বিবেচনা করে এবার আর দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নেইনি।’
কয়েকজন ইজাড়া প্রত্যাশী অভিযোগ করে বলেন, হাট ইজাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩টি দরপত্র জমা পড়তে হয়।

সাধারণ ইজাড়াদাররা দরপত্রই কিনতে পারেননি। দু’একজন কিনলেও ভয়ে জমা দেননি বা জমা দেয়ার সুযোগ পাননি। ফলে প্রভাবশালী চক্র পছন্দমতো দর দিয়ে হাটগুলো ইজাড়া নিয়েছে। আবার কয়েকটি হাটের ক্ষেত্রে কোনো দরপত্রই জমা পড়েনি। সেগুলো অতীতের মতো ঈদের আগ মুহূর্তে দলীয় লোকদের দিয়ে পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে সিটি কর্পোরেশনের আয়ের নামে লুটপাট হবে।

তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় ও সিটি কর্পোরেশনের লোকদের সহায়তায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা মিলে একেকটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। কোনো বছরই এই সিন্ডিকেটের বাইরে পশুর হাট ইজাড়া দেওয়া হয় না। অনেক হাটে কাক্সিক্ষত দর বা ইজাড়াদার না পেয়ে খাস আদায়ের জন্য দেয়া হয়। তবে এই খাস আদায়ের টাকা বেশিরভাগই চলে যায় সুবিধাভোগী মহলের পকেটে। ফলে সিটি কর্পোরেশন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আবদুল মালেক বলেন, নিয়ম অনুযায়ী ৩ দফা দরপত্র আহ্বান করে ৭টি হাটের ইজারা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো যে হাটগুলো চূড়ান্ত হয়নি সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত দেবে। তবে সিন্ডিকেটের বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা। তিনি বলেন, নিয়মের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নিয়ম মেনেই শীর্ষ দরদাতাকে হাটের ইজাড়া সম্পন্ন করা হয়েছে। সরকারী মূল্যের ছেয়ে কম মূল্যে খাস আদায়ের দয়িত্ব দেওয়া যায় কি-না? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, এবার অস্থায়ী পশুর হাট হিসেবে খিলগাঁওয়ের মেরাদিয়া হাট, উত্তর শাহজাহানপুরের মৈত্রী সংঘ মাঠ, গোপীবাগের ব্রাদার্স ইউনিয়ন বালুর মাঠ, কমলাপুর স্টেডিয়ামের পূর্ব পাশে খালি জায়গা, হাজারীবাগ মাঠ, লালবাগের রহমতগঞ্জ খেলার মাঠ, কামরাঙ্গীরচর ইসলাম চেয়ারম্যান বাড়ি মোড়, আরমানিটোলা মাঠসংলগ্ন খালি জায়গা, ধূপখোলা ইস্ট অ্যান্ড ক্লাব মাঠ, পোস্তগোলা শ্মশান ঘাট, দনিয়া কলেজ মাঠ, শ্যামপুর বালুর মাঠ এবং সাদেক হোসেন খোকা মাঠ ও আশপাশের খালি জায়গায় হাট বসানোর জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে সংস্থাটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসসিসির একজন কাউন্সিলর বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে খরচ যোগাতে ও নেতা-কর্মীরা সক্রিয় থাকতে কোরবানীর হাট থেকে টাকা আয় করবে। এ জন্য তারা সিন্ডিকেট গ্রুপে সক্রিয় থেকে ইজারায় বাধাগ্রস্থ করছে। ফলে ডিএসসিসি বাধ্য হয়ে ইজারা দিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত খাস আদায়ের মাধ্যমে হাটগুলো থেকে রাজস্ব আদায় করবে। এতে নেতা-কর্মীরা ডিএসসিসিকে নাম মাত্র কিছু অর্থ দিয়ে বিপুল পরিমান অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্ল্যান করছে। সেক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকা চলে যাবে সিন্ডিকেটের কবলে।


 

Ads
Ads