এরশাদের চিরবিদায় শূন্যতায় ভুগবে রাজনৈতিক অঙ্গন

  • ১৪-Jul-২০১৯ ০৯:৪১ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

‘নতুন বাংলাদেশ গড়ব মোরা, নতুন করে আজ শপথ নিলাম। নবজীবনের ফুল ফোটাবার, প্রাণে প্রাণে আজ দীক্ষা নিলাম।’ ব্যাকগ্রাউন্ডে সাবিনা ইয়াসমীন আর এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠের সাড়া জাগানিয়া সেই গানের কথা মনে আছে? যে গানের গীতিকার দেশের ক্রান্তিলগ্নে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ আবদুস সাত্তারের সরকারকে হটিয়ে বেতার ও টেলিভিশনে প্রচারিত ভাষণে বলেছিলেন, ‘জনগণের ডাকে সাড়া দিতে হইয়াছে, ইহা ছাড়া জাতির সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না।’ রাস্তাঘাট, সেতু, বেড়িবাঁধ তৈরিসহ দেশের সার্বিক উন্নয়নে যিনি একক সিদ্ধান্তেই বুক পানি করে হেঁটেছিলেন। যিনি অনেক ইতিহাসের সাক্ষী আবার অনেক ইতিহাসের নির্মাতা! তিনি গতকাল সকালে চিরবিদায় নিয়েছেন। ‘৮৮র বন্যায় যিনি স্রোতবহুল পানিতে নেমে জনদুয়ারে গিয়ে গিয়ে ত্রাণ বিলিয়েছিলেন সেই পল্লীবন্ধু, সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রপতি বর্ষীয়ান রাজনীতিক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের চিরবিদায়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো। বর্ষীয়ান নেতা এরশাদবিহীন রাজনৈতিক অঙ্গন শূন্যতায় ভুগবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

বাংলাদেশের রাজনীতির বর্ণিল চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম ঈর্ষান্বিত একটি চরিত্র ৮৯ বছর বয়সী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। রাষ্ট্রপরিচালকের আসনে গদিনশিন হওয়ার ৪ বছরের কাছাকাছি পৌঁছে একটি রাজনৈতিক দলের অভাব বোধ করেন এবং ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি তৈরির মাধ্যমে রাজনীতিক হয়ে ওঠেন। ক্ষমতায় আসা থেকে শুরু করে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে তার সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজনীতিতেও হয়ে ওঠেন দুর্লভ দৃষ্টান্তের এক ব্যক্তিত্ব। ১৯৯০-এর ডিসেম্বরে রাষ্ট্রনায়ক থেকে সরে দাঁড়ালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের সরকার তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে জেলে ভরে দেয়। খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকারের দায়ের করা অনেক মামলার একটিতে দণ্ডিত হয়ে সাজা ভোগ করতে থাকেন। পরে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার এরশাদকে সব মামলায় জামিন দিয়ে জাতীয় সংসদে বসার সুযোগ করে দেয়। এরপর থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেপরে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের কাছেই তিনি একটি ফ্যাক্ট হয়ে ওঠেন। ২০০৫ সালে জোট বদল করলেও সঠিক সংঘবদ্ধতার বিশুদ্ধ পথ খুঁজে পান ২০০৭ সালের এক-এগারোর কিছু আগে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এরশাদ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটে অংশীদার হন এবং সেই থেকে তার দল দেশ উন্নয়নের পক্ষেই কাজ করে যাচ্ছে। 

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সংসদে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের গঠনমূলক ভূমিকার কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। সাবেক জীবনসঙ্গী এরশাদকে উদ্দেশ করে বিদিশা এরশাদ ফেসবুকে আবেগঘন স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘আমিও আজমির শরিফে, আর তুমিও চলে গেলে। আবার হয়তো দেখা হবে অন্য এক দুনিয়ায়।’ তার মৃত্যুতে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে শোক। তিনি যে শুধুই রাজনীতিক ছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন কবিও। রাষ্ট্রপরিচালনার পাশাপাশি তার কবিতা প্রকাশ পেতে দেখা গেছে পত্রপত্রিকায়। তার আমলে এদেশ ছিল কবি-সাহিত্যিকদের জন্য স্বর্ণযুগ। ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যে তার প্রথম কবিতাগ্রন্থ, ‘কনক প্রদীপ জ্বালো’ প্রকাশ পায়। বঙ্গভবনে নিয়মিত বসত কবিতার আসর। তিনি ‘এশীয় কবিতা উৎসব’সহ কবি ফজল শাহাবুদ্দীন নেতৃত্বাধীন ‘কবিকণ্ঠ’র পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। কবি-সাহিত্যিকদের নানা সময়ে নানাবিধ সহযোগিতার হাতও বাড়াতে দেখা গেছে তাকে। ১৯৮৯ সালে একটি উৎসবে যোগ দিতে বাংলাদেশে এসেছিলেন ইংল্যান্ডের সেসময়ের সবচেয়ে খ্যাতিমান কবি টেড হিউজ। এর আগে কবিতায় কোনো সরকারকে এতটা উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি। তিনি রাজনীতিক, রাষ্ট্রনায়কের পাশাপাশি প্রেমিক-কবি ছিলেন। তাই তো জাপার এক সভায় প্রস্থানরত স্ত্রী রওশনের হাত ধরে থামিয়ে তারই লেখা একটি কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি- ‘নিঃসঙ্গ ধূসর বিশাল এক অন্ধকারে/আমি জেগে আছি/কোথায় উষার জ্যোতি/কতদূর আলোর মৌমাছি?’ শুনিয়ে বলেন ‘রওশন তুমি আমার আলোর মৌমাছি।’

বারবার সিদ্ধান্ত বদলসহ বিভিন্ন কারণে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সমালোচিত হলেও অনেকেই তার শাসনামলে হওয়া উন্নয়নমূলক কাজের প্রশংসাও করেন। শুধু রাজনীতিতেই নয়, সবখানেই পেছন ফিরে তাকালেই ব্যক্তির প্রশংসা-নিন্দা কিংবা আলোচনা-সমালোচনা থাকতে দেখি। কারণ, যেকোনো বিষয়েই আমরা পোস্টমর্টেম করে বোঝার চেষ্টা করি আমরা যা চেয়েছি, তা পেয়েছি কিনা। যারা চেয়ে কিংবা না চেয়েও পেয়ে যান, তারা আনন্দে ভাসেন; প্রশংসা করেন। বাকিরা নিন্দা, সমালোচনার অন্ন রাঁধতে শুরু করেন। তবে সদ্যবিদায়ী বর্ষীয়ান রাজনীতিক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের চলে যাওয়াকে নিন্দা-সমালোচনার ঊর্ধ্বে রেখে বলতেই হয় তার চিরবিদায় রাজনৈতিক অঙ্গনে শূন্যতার সৃষ্টি করল।

Ads
Ads