যে কারণে ঝুলে আছে বর্ষবরণে যৌন হয়রানির মামলা

  • ১৪-Apr-২০১৯ ০৭:০৭ অপরাহ্ন
Ads

 

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

চার বছর আগে ২০১৫ সালের পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাকায় যৌন হয়রানির ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি সাক্ষীর অভাবে ঝুলে আছে। ওই ঘটনায় পুলিশ সিসি টিভির ফুটেজ দেখে আটজন যৌন নিপীড়ককে শনাক্ত করেছিল। তবে তাদের মধ্যে শুধু মো. কামাল নামে একজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। অন্য আসামিদের নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় পরবর্তীতে কামালকে একমাত্র আসামি করে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। আর অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয় ৩৪ জনকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ১৯ জুন এ মামলার বিচার শুরু হলেও রাষ্ট্রপক্ষ এখন পর্যন্ত ৩৪ জন সাক্ষীর কাউকেই আদালতে হাজির করতে পারেনি। ফলে ঝুলে আছে আলোচিত এ মামলার বিচার। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ৮-এ বিচারাধীন আছে।

জানা গেছে, আদালত এ মামলায় একের পর এক তারিখ ধার্য করলেও ট্রাইব্যুনালে কোনও সাক্ষীকে হাজির করতে পারছে না রাষ্ট্রপক্ষ। ফলে মামলার বিচার কাজ শুধু অভিযোগ গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি রেজাউল করিম বলেন, ‘আদালতে সাক্ষী না আসায় মামলাটি ঝুলে আছে। সাক্ষীদের হাজির করার জন্য প্রতি তারিখে আদালত থেকে সমন জারি করা হয়। কিন্তু পুলিশ সাক্ষীদের হাজির করতে পারছে না।’ রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সর্বাত্মক গুরুত্ব দিয়ে মামলাটি পরিচালনা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসটি এলাকায় ভিড়ের মধ্যে কয়েকজন নারীকে যৌন নিপীড়ন করা হয়। ওই ঘটনায় ভুক্তভোগীদের কেউ মামলা না করায় শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা দায়ের করেন। পরে শাহবাগ থানার পুলিশ মামলাটির তদন্তভার ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।

মামলা দায়েরের এক মাস পর ২০১৫ সালের ১৭ মে ভিডিও দেখে আটজন যৌন নিপীড়ককে শনাক্ত ও তাদের ছবি পাওয়ার কথা জানান তৎকালীন পুলিশ প্রধান একেএম শহীদুল হক। শনাক্ত করা ব্যক্তিদের ধরিয়ে দিতে এক লাখ টাকা করে পুরস্কারের ঘোষণা দেয় পুলিশ। কিন্তু তাদের নাম-ঠিকানা না পাওয়ার অজুহাতে ২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের এসআই দীপক কুমার দাস আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। চূড়ান্ত ওই প্রতিবেদনটি গ্রহণ করে ট্রাইব্যুনাল। পরে আসামিদের মধ্যে একমাত্র মো. কামাল (৩৫)-কে গ্রেফতার করতে পারে পুলিশ। তাকে প্রথমে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে মামলাটি পুনঃতদন্তের আবেদন করা হয়।

২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার তিন নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলাটি পুনঃতদন্তের আদেশ দেন। এরপর পুনঃতদন্ত শেষে ২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর পিবিআইয়ের পরিদর্শক আব্দুর রাজ্জাক একমাত্র আসামি কামালকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। ২০১৭ সালের ১৯ জুন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ওই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।  সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য এ মামলার পরবর্তী তারিখ আগামী ১৭ জুন ধার্য করেন আদালত।

অভিযোগ গঠনের আদেশে বিচারক উল্লেখ করেন যে, ‘২০১৫ সালের ১৪ এপ্রিল সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ছয়টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে যে কোনও সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় আপনি আসামি মো. কামাল পহেলা বৈশাখ ১৪২২ উদযাপন উপলক্ষে হাজার হাজার নারী পুরুষের উপচে পড়া প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে অজ্ঞাতনামা মেয়েদের শরীরে হাত দিয়ে শ্লীলতাহানি ঘটান।’ জানা গেছে, অভিযুক্ত কামাল বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে সাক্ষীদের বিষয়ে উল্লেখ করেন, মামলাটি তদন্তকালে একাধিকবার ঘটনাস্থল গিয়ে প্রত্যক্ষ সাক্ষী, ভিকটিমদের সন্ধান করা হয়। একইসঙ্গে আসামিদের সন্ধান ও গ্রেফতারের সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়। কামাল ব্যতীত অন্য কোনও আসামির সন্ধান পাওয়া যায়নি। আট আসামির জন্য এক লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা এবং তা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রচার করা সত্ত্বেও আসামিদের নাম-ঠিকানা ও সন্ধান পাওয়া যায়নি। বাকি সাত আসামির সন্ধান পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হবে।’

এ মামলার সাক্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লিটন নন্দীর জবানবন্দিতে ওই দিনের যৌন হয়রানির ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়—২০১৫ সালের ১৪ এপ্রিল বিকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘ওইদিন সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে দেখতে পাই পাঁচটি গ্রুপে বখাটেরা নারীদের লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করছে। প্রতিহত করার জন্য আমি ও আমার সঙ্গীরা এগিয়ে যাই। রাজু ভাস্কর্যের পূর্ব পাশে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের তিন নম্বর গেটের সামনের রাস্তার ওপরে বখাটেরা একটি মেয়ের শাড়ি খুলে ফেলে এবং ব্লাউজ ছিঁড়ে ফেলে। তখন আমরা বখাটেদের কিলঘুসি মেরে তাড়িয়ে দেই। মেয়েটিকে তার শরীর ঢাকার জন্য আমার পাঞ্জাবি খুলে দেই। এভাবে বিচ্ছিন্নভাবে বখাটেরা মেয়েদের যৌন নিপীড়ন করে।’

আসামি পক্ষের আইনজীবী আনিসুর রহমান বলেন, ‘কামাল সেখানে হাঁটাহাঁটি করতে যায়। সেখানে যে কোনও ঘটনা ঘটছে, সে বিষয়ে কামাল কিছুই জানতো না। সে হেঁটে আসছিল। ফলে তার ছবি ওই ভিডিও ফুটেজে এসেছে। এরপর তদন্ত কর্মকর্তা তাকে গ্রেফতার করেছে। ভিডিও ফুটেজে এমন কিছু আসেনি যে, সে কাউকে ধরছে, টানছে বা শ্লীলতাহানি করেছে। ভিডিও ফুটেজে তার ছবি আসার কারণে তাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে।’ সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

Ads
Ads