শনিবার ২ মার্চ ২০২৪ ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০

শিরোনাম: বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডে সংবাদকর্মীর মৃত্যু    স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ দাবানলে জ্বলছে টেক্সাস    ছাত্রদলেরে নয়া কমিটি ঘোষণা    বেইলী রোডে অগ্নিকান্ডে নিহতদের মধ্যে যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে     নতুন মন্ত্রিসভায় ডাক পেলেন যারা    বেইলি রোডের আগুনে দগ্ধদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেন প্রধানমন্ত্রী    বেইলি রোডে আগুন: মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৫ জন   
https://www.dailyvorerpata.com/ad/Inner Body.gif
মানুষের নিষ্ঠুরতা থেকে রেহাই মেলেনি মহানবীর
নঈম নিজাম
প্রকাশ: রোববার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৪, ২:২২ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

যে ক্ষতি আমি নিয়েছিলাম মেনে, সেই ক্ষতি পূরণ করতে কেন এলে, কী খেলা তুমি নতুন করে যাবে আবার খেলে...। মান্না দে’র গাওয়া গানটা শুনছিলাম। সৃষ্টির পর থেকে মানুষ পরস্পরের ক্ষতি করে আনন্দ পায়। পৃথিবীর প্রথম মানব আদম (আ.)-এর সন্তানরা একজন আরেকজনকে খুন করে লাশ লুকিয়েছিল। সারা জীবন যাকে বন্ধু ভাববেন তিনিই আপনার ক্ষতি করবেন সবার আগে। পৃথিবী এখন যুদ্ধমুখী। শান্তি-স্বস্তি কোথাও নেই। দাঙ্গাহাঙ্গামা মানুষের বিকৃত আনন্দ অথবা রাগের অংশ। মহাত্মা গান্ধী ভারত স্বাধীন করার পরই হত্যার শিকার হন। দেশটা স্বাধীন করার পর আমাদের জাতির পিতাকে হত্যা করেছিল খুনিরা। দুনিয়ার সেরা মানুষই নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিলেন।

এক গাভির বাছুর তার মায়ের কাছে প্রশংসা করছিল মানুষের। সদ্যপ্রসবিত বাছুর দেখল তার মায়ের সেবাযত্ন করছে স্বয়ং বাড়ির গৃহকর্তা। কাজের লোকজন তো আছেই। সবাই সারাক্ষণ গাভিকে খাবার দিচ্ছে। যত্ন করছে। হাত বুলিয়ে দিচ্ছে শরীরে। সাবান-শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করাচ্ছে। দুনিয়ায় সদ্য আসা বাছুরটি মুগ্ধ হলো। দুনিয়ার মানুষের এমন সুন্দর ব্যবহার তাকে আপ্লুত করল। তারপর বাছুর মাকে বলল, দেখ মানুষ কত ভালো। আমাদের সেবা করছে। যত্ন করছে। তোমাকে তিন বেলা ঘাস দিচ্ছে। খইল খাওয়াচ্ছে। পুষ্টিকর সব খাবার দিচ্ছে। আমাকেও আদর করছে। মানুষ অনেক ভালো। বাছুরের কথা শুনে মা-গরুর চোখে পানি চলে এলো। বাছুর বলল, তুমি কাঁদছ কেন? আনন্দে কি তোমার চোখে পানি? জবাবে গাভিটি বলল, বাবারে! দুনিয়ায় মাত্র এলি। তোয়াজ আর চাটুকারিতার প্রথম অধ্যায় দেখলি। খারাপটা দেখলে তোর মনের ভাব কী হবে তা ভেবে কাঁদছি।

কিছুদিন পর টের পাবি মানুষ কত ভয়াবহ। দুনিয়াদারি কতটা কঠিন। সব সেবাযত্ন হচ্ছে তোকে বঞ্চিত করে দুধ নেওয়ার জন্য। তোর পাওনা দুধ থেকে তোকে বঞ্চিত করছে। তোকে আটকে রেখে সকালবিকাল দুধ নিয়ে নিচ্ছে। নিজেরা সবটুকু নিয়ে সামান্য দিচ্ছে।

বাছুর অবাক হলো। মায়ের কথা শেষ হয়নি। তার পরও বলল, যখন বড় হবি তখন দেখবি বাকি ভয়াবহতা। মানুষের মিষ্টি কথায় তুষ্ট হওয়ার কিছু নেই। তোর আগে এ দুনিয়ায় এসেছিল তোর ভাইটি। তোর ভাইটিকে তারা লালনপালন করল। বড় হওয়ার পর বিক্রি করল বাজারে। খালাসিরা বাজার থেকে তোর ভাইকে কিনল। তারপর জবাই করল। চামড়া বিক্রি করল লেদার ফ্যাক্টরিতে। সেই চামড়া দিয়ে বানাল জুতা। আর মাংস, হাড় একসঙ্গে কেটে কেজি দরে বিক্রি করল। কলিজা, ফুসফুস, মগজ বিক্রি করল আলাদা। খাবার তালিকায় মানুষ এনেছে পশুর নাড়িভুঁড়িও। সেগুলোও তারা বেচাকেনা করে। তারপর সেই নাড়িভুঁড়িও খায়। মানুষের ভয়াবহতার বর্ণনা পেয়ে বাছুরটি মন খারাপ করল। তারপর প্রশ্ন করল, মানুষ পশুদের ওপর এমন বর্বরতা কেন করে? জবাবে মা বলল, শুধু পশু নয়, অন্য প্রাণীদের সঙ্গেও মানুষ এমনই করে। এমনকি মানুষ ছাড়ে না নিজেদের জাতিকেও। মানুষ হত্যা করে মানুষকে।

মানুষ জানে কেয়ামতের দিন কেউ কারও নয়। সেদিন মানুষ পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবে। পালিয়ে যাবে আপনজন ছেড়ে। চেষ্টা করবে শুধু নিজেকে রক্ষা করতে। চিৎকার করতে করতে বলবে, আমাকে বাঁচাও। আমাকে বাঁচাও। ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি। তার পরও কেউ কারও পাশে দাঁড়াবে না। যার যার চিন্তায় অস্থির থাকবে। মানুষের এ কষ্ট সহ্য করতে পারবেন না একজন। তিনি হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি ছুটে আসবেন। দাঁড়াবেন নিজের উম্মতের পাশে। আল্লাহর কাছে হাত পাতবেন নিজের অনুসারীদের রক্ষা করতে। আর বলবেন, ইয়া উম্মতি ইয়া উম্মতি। হাশরের মাঠে শয়তানকেও দেখা যাবে। শয়তান তখন নিজের সাফাই দেবে। মানুষ তাকে দায়ী করলে নিজের ব্যাখ্যা তুলে ধরবে। শয়তান মানুষকে বিপথগামীর জন্য সবার কম ইমানকে দায়ী করবে। আল্লাহ সেদিন দুনিয়ার মানুষের ন্যায়-অন্যায়ের বিচার করবেন। স্থাপন করবেন ন্যায়বিচারের জন্য মানদন্ড। কারও প্রতি অবিচার হবে না। দুনিয়ায় যে যতটা ভালো কাজ করেছে এবং নিজেকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে রেখেছে সে মূল্যায়ন পাবে। সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। যারা আরশের ছায়া পাবে না, তাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ। তার পরও একটা আশার আলো আছে মুসলমানের জন্য। শেষ ভরসাস্থল হয়ে মহানবী লড়বেন তাঁর উম্মতের জন্য। অথচ সেই নবীও দুনিয়ায় শান্তি পাননি। তাঁর ওপর বারবার আঘাত হানা হয়। হত্যার চেষ্টা করা হয়। সে অবস্থান থেকে নিজেকে রক্ষা করতে নবীজি (সা.) হিজরতে চলে যান মদিনায়। মক্কার মানুষ আল্লাহর প্রিয় নবীকে অপদস্থ করলেও মদিনাবাসী আনন্দের সঙ্গে তাঁর পাশে দাঁড়ায়।

মক্কায় এক ভয়াবহ অরাজকতার সময় জন্ম নেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি শান্তির বাণী নিয়ে এলেন দুনিয়ায়। কিন্তু মানুষের ভয়াবহতা জানতেন বলে ইসলামের ডাক দিতে তাঁকে ৪০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। মহানবী (সা.) ৬১০ খ্রিস্টাব্দে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়ত লাভ করেন। তিনি আল্লাহর অনুসারী হতে সবাইকে দাওয়াত দেন। সে আহ্বান রাখার পর সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা আসতে থাকে আপনজনদের কাছ থেকে। নিজের বংশের লোকজনও তাঁকে ছাড় দেয়নি। কঠিন পরিস্থিতি অনুধাবন করেই প্রথম তিন বছর নবীজির ধর্ম প্রচারে গোপনীয়তা ছিল। পরে তিনি সাফা পাহাড় থেকে প্রকাশ্যে সবাইকে ইমানের পথে আসার আহ্বান জানান। এতে ক্ষুব্ধ হয় কাছের মানুষ। তারা নবীজির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়। নবীজিকে হত্যার পরিকল্পনা আঁটে। তারা বুঝল মানবতার মহানায়ক মুহাম্মদ (সা.) জীবিত থাকলে দলে দলে মানুষ তাঁর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে মুসলমান হবে। কোনোভাবে তা ঠেকানো যাবে না। আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে দুনিয়ার মানুষ। কারণ জন্মের পর থেকে নবীজি ছিলেন মানুষের কাছে বিশ্বস্ততার প্রতীক।

মক্কার সব গোত্রের শক্তিশালী প্রধানরা নবীজির বিরোধিতা শুরু করল। তারা সমবেত হয় আবু জাহেলের আমন্ত্রণে। বৈঠকে আলাপ করল কীভাবে ইসলামের এগিয়ে চলা থামানো যায়। বৈঠকে সোচ্চার ভূমিকায় ছিল আবু জাহেল। তার সাফ কথা, কোনোভাবেই ইসলামের প্রচারকারীকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। যে কোনোভাবে তাঁকে সরাতে হবে। তার যুক্তি ছিল, মুহাম্মদ (সা.) জীবিত থাকলে তাঁর উম্মতের সংখ্যা বাড়বে। আর উম্মতের সংখ্যা বাড়লে আবু জাহেলদের দিন শেষ। সবকিছু থামাতে হলে আল্লাহর নবীকে চিরতরে সরিয়ে দিতে হবে। কীভাবে তাঁকে শেষ করা হবে সে আলোচনা হলো। আবু জাহেল প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে যুবক বাছাই করল। অস্ত্র চালনায় এ তরুণদের কোনো তুলনা ছিল না। সিদ্ধান্ত দিল বলশালী যুবকের সবাই একযোগে মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর হামলা করবে। সমবেত সবাই এতে সমর্থন করল। তারা বলল, সঠিক সিদ্ধান্ত। বাছাই করা যুবকদের বলা হলো জীবিত বা মৃত মুহাম্মদ (সা.)-কে দারুন নদওয়ায় (নদওয়া ঘর) হাজির করতে হবে। কারণ বৈঠকটি হচ্ছিল সেখানে। যে যুবক নবীজিকে হত্যা করতে পারবে, তাকে ১০০ উট পুরস্কার দেওয়া হবে। যুবকরা হাতে হাত রেখে শপথ নিল, রাতেই নবীজির ঘরে হামলা করবে। তারা চিরদিনের জন্য শেষ করে দেবে আল্লাহর নবীকে। আবু জাহেল খুশিমনে অপেক্ষায় থাকল মহানবীর কফিনের।



কাফেরদের ভয়াবহ পরিকল্পনার কথা আল্লাহ জানিয়ে দেন রসুল (সা.)-কে। ওহির মাধ্যমে নবীজি পান হিজরতের আদেশ। আল্লাহ বলেছেন, ‘হে নবী! মক্কার মানুষ আপনাকে চায় না। অন্যদিকে মদিনার মানুষ আপনার জন্য সীমাহীন আগ্রহে প্রতীক্ষা করছে। আপনি হিজরত করে মদিনায় চলে যান।’ এ নিয়ে সুরা আনফালে (আয়াত ৩০) স্পষ্ট বলা আছে, ‘স্মরণ কর, কাফেররা তোমাকে বন্দি বা হত্যা করার জন্য কিংবা নির্বাসিত করার চক্রান্ত করে; তখন আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করেন। আর আল্লাহ শ্রেষ্ঠতম কৌশলী।’ নবীজি তাঁর বিরোধী কাফেরদের ধ্বংস চাইতে পারতেন আল্লাহর কাছে। তিনি তা চাইলেন না। আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে মদিনার পথে বেরিয়ে পড়েন। তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন আবু বকর (রা.)। মক্কা ত্যাগের আগে মহানবী তাকালেন চারদিকে। তারপর বললেন, ‘হে মক্কা! খোদার কসম, তুমি আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় শহর, আমার প্রতিপালকের কাছেও বেশি পছন্দের শহর তুমি। যদি তোমার অধিবাসীরা আমাকে বের করে না দিত, আমি কখনো বের হতাম না।’ (তিরমিজি-৩৯২৫) ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর নবীজি মক্কা ত্যাগ করেন। ২৩ সেপ্টেম্বর মদিনার নিকটবর্তী কুবায় পৌঁছান। এ খবরে মদিনাবাসীর মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। তারা দিনরাত অপেক্ষা করতে থাকে তাদের প্রিয় নবীর জন্য। ২৭ সেপ্টেম্বর এ অপেক্ষার অবসান হয়।

অবশেষে সব প্রতিকূলতা পায়ে মাড়িয়ে নবীজি মদিনায় পৌঁছালেন। মদিনাকে আল্লাহর নবীর বেছে নেওয়ার অনেক কারণ ছিল। ৬২১-২২ খ্রিস্টাব্দে একদল মদিনাবাসী মক্কায় এসে নবীজির কাছ থেকে বাইয়াত নেন। তাঁরা তখন শপথ নিয়েছিলেন, ইসলামের প্রচারে তাঁরা জীবন দিয়ে আল্লাহর নবী (সা.)-কে রক্ষা করবেন। কুরাইশ বংশের কোনো চক্রান্ত তাঁকে শেষ করতে পারবে না। ভৌগোলিকভাবে মদিনা ছিল তিন দিক থেকে পাহাড়, খেজুর গাছ বেষ্টিত নিরাপদ স্থান। মদিনাকে বেছে নেওয়ার এটাও আরেকটি কারণ ছিল আমাদের নবীজির। ভরদুপুরে নবীজি যখন পৌঁছালেন তখন কড়া রোদ উপেক্ষা করে মদিনাবাসী খোলা আকাশের নিচে অপেক্ষায়। একনজর দেখা, তাঁকে কাছে পাওয়ার সেই অপেক্ষার অবসান হলো। বাঁধভাঙা মানুষের স্রোত বেরিয়ে এলো শরীর পোড়ানো তীব্র রোদ, গরম উপেক্ষা করে। সবাই নবীজিকে পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল আল্লাহর কাছে। ইসলামের প্রধানকে একদল মানুষ মক্কা থেকে বের করে দিল, মদিনায় আরেক দল গ্রহণ করল তাঁদের প্রাণের অতিথি হিসেবে।

মহানবী (সা.)-কে একদল মানুষ ছাড় দেয়নি। আরেক দল গ্রহণ করেছিল। বড় অদ্ভুত মানুষের সবকিছু!

লেখক: সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
http://www.dailyvorerpata.com/ad/Vorer-pata-23-12-23.gif
http://www.dailyvorerpata.com/ad/bb.jpg
http://www.dailyvorerpata.com/ad/Screenshot_1.jpg
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]