শুক্রবার ১২ আগস্ট ২০২২ ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯

শিরোনাম: ক্রিকেট নাকি বেটিং, সাকিবকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে: পাপন    জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মন্ত্রণালয়কে বিস্তারিত ব্যাখ্যার নির্দেশ    ডলারের কারণে ভোজ্যতেলের দামে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না: বাণিজ্যমন্ত্রী    রাজধানীতে হোটেলে মিলল নারী চিকিৎসকের গলাকাটা লাশ    সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকা সম্পর্কে সরকার কেন তথ্য চায়নি: হাইকোর্ট    জম্মু-কাশ্মীরে সেনা ক্যাম্পে হামলা, ৩ সেনাসহ নিহত ৫    বিশ্বব্যাপী বেড়েছে মৃত্যু-শনাক্ত   
https://www.dailyvorerpata.com/ad/Inner Body.gif
স্মরণের আবরণে মরণেরে যত্নে রাখি ঢাকি
অবন্তি মাহমুদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ জুন, ২০২২, ৪:০১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

স্মরণ করছি আমার নানাভাই হাবিবুর রহমান মিলনকে তার লেখা আমারই সবচেয়ে প্রিয় একটা লাইন দিয়েই।আজকে পাঁচ বছর হল সাথে নেই আমাদের, হিসেবে আসলে বেশিদিন না।

মে-জুন, বছরের মাঝামাঝি এই দুইটা মাস কয়েক বছর ধরে খুব একটা আহামরি লাগে না।আমাকে যারা চিনে তারা সবাই কম বেশি জানে আমি আমার কাছের মানুষদের জন্য সব কিছু নিয়েই উদ্বিগ্ন থাকি সেটার সুবাদেই তাদের সব বিশেষ দিনগুলো মুখস্থ করে রাখি,তো এই মে আর জুন মাস দুইটায় পরপরই আমার ভাই আর বাবার জন্মদিন হওয়াতে আমার উত্তেজনা তুঙ্গে থাকত একটা সময়,কিভাবে কি করব না করব যদিও এখনও থাকে কিন্তু একই সময় মনের ভেতর নাড়া দিয়েই উঠে মাস দুইটা আসলে। কিন্তু কখনও এভাবে লিখে আমি প্রকাশ করতে পারি নি। করোনার এটা একটা ইতিবাচক দিকই যে হাবিজাবি কথিত ব্যস্ততা না থাকায় নিজেকে অনেকটা সময় দেয়া হচ্ছে ফিরে দেখা হচ্ছে জীবনের কাটানো সুন্দর সময়গুলো।

আমার নানাভাই ছিলেন স্বল্পভাষী, সৎ,সাধারণ একজন মানুষ কাউকে নিয়ে এরকম আমি আত্মবিশ্বাসী হয়ে আর কারও সম্পর্কে বলতে পারি না কারণ সবারই ভেতরে  একটা পরিবর্তন আসে কিন্তু এই মানুষটিকে নিয়ে আমি চোখ বন্ধ করে বলতে পারি কারণ আমি তাঁকে একরকমই দেখেছি শেষ দিন পর্যন্ত। আসলে নানাভাইকে নিয়ে যেটাই মনে করি ঘুরেফিরে তাঁর সাথে আমার কাঁটানো শেষ কয়েকটা ঘন্টার কথাই মনে হতে থাকে, তখন রোযা শুরু হওয়ার আর সাত দিন বাকি নানাভাই তখন হাসপাতালে ভর্তি আসলে ওই বছরই এপ্রিল থেকে নানাভাই অসুস্থ হতে শুরু করে তখন থেকে জুন পর্যন্ত মনে হয় একবারের মত বাসায় এসেছিলেন বেশিরভাগ সময় হাসপাতালেই ছিলেন প্রথমে পিজিতে পরে ল্যাব এইডে এটাই শেষ ছিল আর কি। পালাক্রমে সবাই নানাভাই এর সাথে থাকত নানু,খালারা,মামা-মামী আমাদেরকে মাঝে মাঝে নিয়ে যেত তো শেষের দিকে যখন অবস্থা অবনতির দিকেই তখন প্রতিদিনই সবাই যেত কারণ না গেলেই খোঁজ নিতে থাকত নানাভাই কেন আসে নি সেজন্য না কোনো অসুবিধাতে আছে কি না সেজন্য।সারাটা জীবন শুধু নিজের পরিবারের চিন্তায়ই কাঁটাতে দেখেছি নানাভাইকে।আমার এক খালা (আমাদের লোপা) দেশের বাইরে থাকাতে তাঁকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে যাচ্ছিলেন নানাভাই সে সময় ভিডিও কলে দেখলেই বলতেন,"তুই কি আসতে পারবি, সমস্যা হবে?" সেখান থেকেই লোপাও আসার জন্য সুযোগ খুঁজছিল যদিও ওই বছরই দেশে দুইমাস নানাভাই এর বাসাতেই লোপা থেকে এপ্রিলেই অস্ট্রেলিয়াতে গিয়েছিল এজন্য আবার আসাটা একটু সময়ের ব্যাপার ছিল। মৃত্যু আসন্ন হলে সম্ভবত মানুষ আঁচ করতে পারে নানাভাইও পেরেছিলেন বলতেন ,"মনে হয় লুপির সাথে দেখা হবে না আর" এবং সেটাই হয়েছিল। আমাদের পরিবারে আসলে বলতে গেলে নানাভাই এরই প্রথম চলে যাওয়া আমাদের রেখে যার কারণে কেউই বুঝতে পারি নি যে কি হতে যাচ্ছে সবারই ধারণা সে সুস্থ হয়েই যাবে।

নানাভাই থাকা অবস্থায় কেউই খেয়াল করি নি যে কত বড় একটা আশ্রয় ছিলেন সবার,নিজেই টের পেতে দেননি কাউকে।কখনও কারও থেকে কোনো চাওয়া পাওয়া ছিল না চাওয়া একটাই পরিবারের সবাই একসাথেই থাকতে হবে যত যাই হোক মিলটা ধরে রাখতেই হবে এখনও সেটা অবশ্য আছে বলা যায়।

আমার নানাভাই মানুষটা খুব অদ্ভুত ছিলেন ৬ফুট লম্বা পড়নে হাফ হাতা শার্ট,ঢোলা একটা প্যান্ট হাতে রুমাল আর সিগারেটের একটা প্যাকেট হাতে নিয়ে নিজের ঘর থেকে বের হয়ে নানুকে আসি বলে বের হতেন কর্মস্থলে।রিকশায় করে ইত্তেফাকে যেতেন এরপর সন্ধ্যায় চিরাচরিত ভালবাসার প্রেসক্লাবে এই জায়গাটায় নানাভাই এর যে কত স্মৃতি সেটা আমার মা খালারা ভাল জানেন। এখানে ঘন্টার পর ঘন্টা একা বসে বসে সিগারেট টানতেও কোনো ক্লান্তি ছিল না তাঁর। মাঝে মাঝে মিলন ভাইয়ের সাথে আড্ডা দিতে আসতেন অনেকেই।সিগারেটটা কখনও ছাড়তে পারেন নি কথা একটাই এটা ছাড়লেই নাকি শেষ হয়ে যাবেন।

আমার মনে হয় নানাভাই থাকা অবস্থায় আমাদের সাথে তাঁর কিছুটা দুরত্ব ছিল কারণ বাসায় একটা ঘরেই নিজের বই,পত্রিকা,কলম,রঙ চা আর সিগারেট নিয়েই থাকতেন আর আমাদের সব আবদার অত্যাচার সব নানুর কাছে নানুর ঘরে নানাভাইয়ের ঘরের ধারেকাছেও ঘেষত না কেউ কিন্তু নানাভাই অফিসে চলে গেল ঐ জ্ঞানের রাজ্য আমাদের খেলার রাজ্য হয়ে যেত আবার রাত নয়টার মধ্যে রাজ্য ছেড়ে দিতে হত কারণ নানাভাই আসবে। সারাদিনে হয়ত কথাই হয় নি আমাদের সাথে আমরা যে ঐ বাসায় এসেছি নানু না জানালে জানতেন কি না সন্দেহ আছে আমার কিন্তু ঠিক ঠিক দিন শেষে আমাদের জন্য হাতে কিছু না কিছু নিয়েই আসতেন সেটার জন্য আমাদেরও কি অপেক্ষা আবার অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে গেলে পরদিন সকালেই নানুকে জেরা করা হত যে কি আনসে নানাভাই কালকে। নানু আর নানাভাই এর দুইটা আলাদা ঘর ছিল আর নানু সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকে আর নানাভাই নিজের ধ্যানে কিন্তু দুইজনের ভেতর বোঝাপড়াটা অবাক করার মত ,খুবই চমৎকার একটা সম্পর্ক ছিল দুইজনের।এইজন্যই কি না জানি না শেষবারও বাসা থেকে হাসপাতালে যাওয়ার সময়ও শুধু নানুকেই হাত দেখিয়ে গাড়িতে উঠেছিলেন।



শেষ দিনটাও নানুই সারাক্ষণ ছিল নানাভাইয়ের সাথে।একটু পর পর নানাভাইয়ের খারাপ লাগলেই নানুর দিকে তাকাতো নানু উঠে গিয়ে দোয়া পড়ে ফুঁ দিত।আমি,ভাইয়া,আম্মু ,আব্বু সন্ধ্যা নাগাদ হাসপাতালে যাই গিয়ে দেখি নানু একপাশে দাঁড়ানো দোয়া পড়ছে আরেক পাশে মামী মাথায় হাত বুলাচ্ছে মামা পেছনে দাঁড়ানো। নানাভাইয়ের সবচেয়ে আদরের ছিলেন হচ্ছে আমার মামা এটা ওইদিনই বুঝেছি তাঁর আগে কখনও খেয়াল হয় নি। মামাকে এক সেকেন্ড এর জন্য আড়াল হতে দিচ্ছিলেন না,আড়াল হলেই হলেই ক্রমাগত  ""সুমন কই সুমন কই" বলছিলেন। সোফায় বসে সব দেখছিলাম আব্বু ডাক্তারের সাথে কথা বলছে বড় খালা তখন আরেক প্রফেসরের চেম্বারে ঘুরছে রিপোর্ট নিয়ে আম্মু মামী মাথার কাছে দাঁড়ানো ছোট খালা অফিস থেকে না বাসা থেকে হাসপাতালে আসছিল মেঝ খালাও তখন হাসপাতালের দিকের রাস্তায়ই। এই হিসাবটা এখনও মিলে না সবাই ওই সময় একই জায়গায় কিভাবে কারণ আমাদের কারও মাথায় এটা নেই যে আর কয়েক ঘণ্টা আছে হাতে এবং খুব যে উদ্বিগ্ন সবাই তেমনও ছিল না ব্যাপারটা এরপর নানাভাই বললেন স্যুপ খাবেন  কথামতো দিল মামী না আম্মু কে জানি এখন কোনোভাবেই সে তাঁদের হাতে খাবেন না কথা একটাই "আমি কি অচল হয়ে গেসি নাকি?" নিজের হাতে মগটা নিয়ে খেতে পারলেন না ঠিকমতো কারণ হাত কাঁপছিল তাও মগ ছাড়লেন না।আমি আর ভাইয়া আর কিছুক্ষণই ছিলাম সেখানে এর মধ্যে একবারই তাকিয়ে বললেন ,"ধরবি না আমাকে?" উঠে যে ধরব ঐ কথা তো মাথায় আসছেই না কারণ নানাভাইকে কখনও স্পর্শ করে দেখেছি কি না আমার মনে নাই এরপর আম্মুর ধমক খেয়ে উঠে গিয়ে হাত ধরলাম কি শক্ত করে ধরল বলল , "ছাড়িস না" আমি তখনও ঘোরে যে কি হচ্ছে এভাবে তো কথা বলে না এরপর ডিউটির ডাক্তার আসায় হাত ছাড়িয়ে বাইরে চলে আসি এটাই আমার নানাভাইকে শেষ দেখা আর প্রথম ও শেষ শক্ত করে ছোঁয়া। এরপর আমাকে আর ভাইয়াকে মামীর সাথে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপর রাত বাড়তেই থাকল আর ফোন আসতেই থাকল যে অবস্থা ভালো না। রাতের দিকে নাকি তাঁর সহকর্মীদের কয়েকজন এসেছিলেন তো তাঁদের একজনের সাথে হ্যান্ডশেক করে বললেন,"লীডার আর তো দেখা হবে না" নানারকম সংগঠন করার কারণে লীডার বলে একজন আরেকজনকে তাঁরা ডাকতেন। এরপর তাঁদেরও শেষ বিদায় জানালেন নানাভাই।এরপর নানাভাইয়ের নিজেরই একটা অদ্ভুত অপেক্ষা শুরু হয় একটু একটু বলছিলেন "ডাক্তার কখন আসবে" বলতে বলতে একবার অনেকক্ষণের জন্য চুপ হয়ে গেলেন সবার আসতে আসতে শঙ্কা শুরু হলো তাহলে কি আজকেই.....

এরপর নানুকে ছোটখালার সাথে পাঠিয়ে দেয়া হল বাসায় এতদিনের সবচেয়ে কাছের সঙ্গীকেও বিদায় জানালেন নানাভাই। এরপর আর দুই কি তিন ঘণ্টা তিন মেয়ে এক ছেলের সাথেই ওই কয়েকটা শেষ ঘন্টা গেল এরপর আই সি ইউতে নেয়া হল একে একে সেখানেও ছেলেমেয়েদের বিদায় দিলেন শেষ সাক্ষাৎটা ছিল আমার মায়ের সাথে সম্ভবত টুকটাক কথা বলে আম্মুকে বলল "আমি একটু ঘুমাই তাইলে" মেয়েও তাঁর বাবাকে ঘুম পাড়িয়ে আসলেন এর কিছুক্ষণ পরেই বড় খালা গেল কিন্তু তখন আর রেসপন্স নেই ডাক্তার ডাকা হল আসলেন দেখলেন আর শেষ হয়ে গেল সুন্দর এই মানুষটার জীবন।
আমার জীবনে দেখা প্রথম কারও মৃত্যু এটা তাও নিজেরই পরিবারে ওই সময়টা মনে করতে চাই না আর কি।

এই লেখা আর ছবিগুলো যে দিলাম এটার একটাই উদ্দেশ্য আমার পরের যে জেনারেশনটা আছে মানে বাসার ছোটগুলি ওরা যাতে এগুলো মনে রাখে সবসময় আর ধারাটাও যাতে ধরে রাখে।

আমার নানাভাই যেখানেই থাকুক,সৃষ্টিকর্তা তাঁকে ভাল রাখুক।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
http://dailyvorerpata.com/ad/apon.jpg
https://www.dailyvorerpata.com/ad/last (2).gif
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]