শুক্রবার ৬ আগস্ট ২০২১ ২১ শ্রাবণ ১৪২৮

শিরোনাম: প্রযোজক রাজ মাদক মামলায় রিমান্ডে    পরীমনিকে রিমান্ডে পেল পুলিশ    রাতেই আদালতে পরীমনি-রাজ, রিমান্ড আবেদন     ভারতকে বাদ দিয়ে ব্রিটেনের লাল তালিকায় বাংলাদেশ    সিনোফার্মের সাড়ে ৭ কোটি টিকা কিনছে বাংলাদেশ    ভ্যাট দিল গুগল    ইতিহাসের সর্বোচ্চ মৃত্যু দেখলো দেশ   
https://www.dailyvorerpata.com/ad/Inner Body.gif
করোনায় বেড়েছে যৌতুকের জন্য স্ত্রী হত্যা!
২০০২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া যৌতুকের জন্য হত্যা মামলার মাত্র ৩ শতাংশের সাজা হয়েছে, করোনাকালে ১১৭ জনকে যৌতুকের জন্য নির্যাতন এবং ৫২ নারীকে হত্যা করা হয়েছে।
মোশারফ হোসাইন
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ জুলাই, ২০২১, ৭:৪১ পিএম আপডেট: ১৯.০৭.২০২১ ৭:৪৫ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

বিবাহ একটি সামাজিক পবিত্র বন্ধন এবং বৈধ চুক্তি। যার মাধ্যমে নারী ও পুরুষের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এই দাম্পত্য জীবন বাধঁতে গিয়ে কেউ কেউ আবার  খোলস পালটে হয়ে যায় বিষধর সাপ। নিষিদ্ধ যৌতুকের জন্যে হত্যা করে স্ত্রীকে। গত ১৩ জুলাই নাটোরের গুরুদাসপুরের বিয়াঘাট ইউনিয়নে স্ত্রীকে হত্যা করেন স্বামী সাগর হোসেন। আটকের পর ১৮ জুলাই রোববার সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানান, বিয়ের পর থেকে যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হতো। ঘটনার দিন রাতে ভিকটিমের মুখে কাপড় গুজে লাঠি দিয়ে নৃশংসভাবে মারধর করেন। একপর্যায়ে ভিকটিমের মৃত্যু হলে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে চালিয়ে দেয় তারা। ৪ জুন লক্ষ্মীপুরে যৌতুকের টাকা জন্য শাহিনুর আক্তার শানু নামে এক গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যার করে স্বামী । এঘটনায় স্বামীসহ শ্বশুর বাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করে নিহতের পরিবার। 



কুড়িগ্রামের চিলমারীর উপজেলায় গত ১৫মে নূরুন হুজ্জাতুন নামে এক কিশোরী গৃহবধূকে যৌকের জন্য নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে, জানা যায় ৬ মাসের শিশু সন্তান আছে যৌতুকের নির্যাতনে মারা যাওয়ার নূরুনের। এঘটনায় মামলার এজাহারে উল্লেখ আছে, তিন লাখ টাকা যৌতুকের দাবি না মেটানোয় স্বামী আরিফুজ্জামান আরিফ ও শ্বশুর-শাশুড়িসহ পরিবারের অন্যান্যরা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে,  ঘটনার পরদিন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় তারা। ভোরের পাতার সাথে কথা হয় নূরুনের বাবা আকতারুজ্জামানের সাথে, মেয়ে হারানো আর্তনাদ জানিয়ে বলেন আমি শুধু আমার মেয়ের হত্যার বিচার চাই, তাদের এমন শাস্তি হোক যেন দেশে আর কোনো মেয়ে যৌতুকের নির্যাতনের শিকার না হয়।  

ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারিক নিবন্ধনের তথ্য অনুসারে ২০১০ সালে যৌতুকের দাবিতে খুন হয়েছে ১৫জন, ২০১১ সালে খুন হয়েছে ২৬জন, ২০১২ সালে খুন হয়েছে  ২৫জন, ২০১৩ সালে খুন হয়েছে ৩০জন, ২০১৪ সালে খুন হয়েছে ২২জন, ২০১৫ সালে খুন হয়েছে ২৫জন এবং ২০১৬ সালে খুন হয়েছেন ২৭জন নারী। ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, করোনাকালে ১১৭ জনকে যৌতুকের জন্য নির্যাতন এবং ৫২ নারীকে হত্যা করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারিক নিবন্ধন খাতার তথ্য বলছে, ২০০২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া যৌতুকের জন্য হত্যা মামলার মাত্র ৩ শতাংশের সাজা হয়েছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন বাস্তবতা এই পরিসংখ্যানকে ছাড়িয়ে যাবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এর সাবেক প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, আইন পরিবর্তন হলেও সমাজে যৌতুকের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো পরিবর্তন হয়নি। আমাদের সমাজের যৌতুক দেয়া এবং নেয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যপার হয়ে দাড়িয়েছে। আমি যেহেতু এখন গ্রামে কাজ করছি সেহেতু প্রায়ই মানুষের কাছে শুনতে হয় মেয়ে বড় হয়েছে বিয়ে দিতে হবে টাকা পয়সার দরকার আছে। যৌতুকের ব্যপারে পুরুষের পরিবার এবং নারী পরিবার একই রকম রয়ে গেছে, দুই পক্ষ থেকে উৎসাহিতবোধ করে। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাড় করিয়ে দেয় আর সেই নির্যাতনের প্রতিবাদে কেউ এগিয়ে আসেনা, তাদের মনের কথাই হলো বিয়ে করেছো যৌতুক কেন দিবে না, সমাজ কিন্তু পাশে এসে দাড়ায় না । গ্রামে যৌতুকের নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে আইনের দিকে না গিয়ে গ্রাম্যসালিশের দিকে ঝোকে, সেই সালিশে চাহিদার চেয়ে অর্থের অংক হয়ত কমে আসে কিন্তু যৌতুক প্রতিরোধ হয়না। পরিবারের সম্পত্তিতে যদি নারীর সমান অধিকার ফিরে আসে তখন যৌতুকের চাহিদা থাকবেনা আর এতে যৌতুক প্রবণতা কমে আসবে বলে মনে করেন এই আইন বিশেষজ্ঞ। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক উম্মে ওয়ারা বলেন,  যৌতুক প্রবণতা সমাজের সাথে মিশে গেছে। আমরা যেই তথ্যের ভিত্তিতে কথা বলি সেটা পুলিশের কাছে আসা মামলা ও ট্রাইব্যুানালে যেসব অভিযোগ আসে এর সুবাদে, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে হাজার হাজার ঘটনা আছে যেগুলো মামলা পর্যন্তও যায়না, সেটা ঘরের বাইরে যায়না। যৌতুক এমন একটি অপরাধ যেটি সংস্কৃতিগত, জীবন আচরণের সাথে জড়িত। অনেক অপরাধ বিভক্ত করা যায়, কিন্তু নারীর প্রতি যে সহিংসতা সেটি আমাদের বেড়ে ওঠা, পারিবারিক রীতিনীতির উপর নির্ভর। এই অপরাধ একদিনে বা হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি, এ অপরাধের পিছনে অনেক সামাজিক কারণ রয়েছে। দেশের কিছুকিছু অঞ্চলে যৌতুক এখনো প্রকাশ্যে নেওয়া হয়, যৌতুককে মেয়ের বাড়ি থেকে নাম দেওয়া হয়েছে উপহার, কখনো মেয়েই বাড়িতে বলে কিছু না নিয়ে গেলে আমার মানসম্মান থাকবে না, এই ক্ষেত্রে শুধু ছেলে দোষ দিলে হবেনা। আইন ও শাস্তি প্রনয়ণ করার পরও যখন যৌতুক প্রবণতা দেখা দেয় তখন বুঝে নিতে হবে এটি আমাদের সমাজ ব্যবস্থার সাথে মিশে গেছে, আর যা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে যদি সামাজিক মূলবোধের জায়গাটি তৈরি করা যায়; শুধু যৌতুক না, অন্যান্য অপরাধ প্রবণতাও কমে আসবে মনে করেন এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
https://www.dailyvorerpata.com/ad/last (2).gif
https://www.dailyvorerpata.com/ad/agrani.gif
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]