শুক্রবার ৬ আগস্ট ২০২১ ২১ শ্রাবণ ১৪২৮

শিরোনাম: মেসির বার্সা ত্যাগ, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা    প্রযোজক রাজ মাদক মামলায় রিমান্ডে    পরীমনিকে রিমান্ডে পেল পুলিশ    রাতেই আদালতে পরীমনি-রাজ, রিমান্ড আবেদন     ভারতকে বাদ দিয়ে ব্রিটেনের লাল তালিকায় বাংলাদেশ    সিনোফার্মের সাড়ে ৭ কোটি টিকা কিনছে বাংলাদেশ    ভ্যাট দিল গুগল   
https://www.dailyvorerpata.com/ad/Inner Body.gif
লকডাউনে বিধি নিষেধ শিথিল ও কঠোর
মমতাজ হুসেন চৌধুরী
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ জুলাই, ২০২১, ১১:১৮ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

লকডাউনের আভিধানিক অর্থ হলো ঘর, ভবন বা আবাসস্থল থেকে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী  বাহিরে না যাওয়া অন্যদিকে বাহির থেকে অন্য কেউ প্রবেশে বাঁধা  অর্থাৎ আসা বা যাওয়া নিষিদ্ধ। কার্যত: লকডাউন বলতে অঘোষিত গৃহবন্দী বুঝায়। রাষ্ট্র বা সরকার বিশেষ প্রয়োজনে জরুরী অবস্থায় লোকজন ও যান চলাচল নিষেধ করার জন্য ১৪৪ ধারা,  কারফিউ বা সান্ধ্য আইন জারী করে থাকেন। কভিড-১৯ এর শুরুতে চীনের উহানে প্রথম লকডাউন চালু করা হয়, করোনার সংক্রমণ বিশ্বব্যাপী উর্ধমুখী হওয়ার ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর নির্দেশনায় লকডাউন এর প্রচলন শুরু হয়। 

অবশ্য করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে তখন লকডাউনের কোন বিকল্প হাতে ছিলনা। সাথে সাথে মাস্ক ব্যবহার, ঘন ঘন হাত ধোয়া , নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা , জন সমাগম পরিহার , স্যানিটাইজেশন সহ কিছু স্বাস্থ্য বিধি আরোপ করে প্রথম ধাক্কা সামাল দেয়ার চেষ্টা চলে। সাথে সাথে জীবন জীবিকার প্রশ্নে সামর্থ্য অনুযায়ী স্ব স্ব দেশের সরকার আর্থিক  প্রণোদনা প্যাকেজ সহ খাদ্য সহায়তার কর্মসূচী প্রবর্তন করেন। প্রাথমিক অবস্থায় করোনার চিকিৎসা নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা হিমশিম খাচ্ছিল। অনেকক্ষেত্রেই trail and error এর মধ্য দিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্তার সংস্কার ও রূপান্তর ঘটে। উন্নত দেশগুলো চিকিৎসা সেবা সামাল দিতে নাস্তানাবোধ হয়ে উঠে, আমরা ইতালির প্রধানমন্ত্রীকে এক পর্যায়ে বলতে শুনেছি , আমাদের ঈশ্বর বা উপরের দিকে তাকানো ছাড়া আর গত্যন্তর নেই। শেষ অব্ধি অনেক জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে চিকিৎসা পদ্ধতির সঠিক গাইডলাইন সহ টীকা আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষ প্রশান্তির ঢেঁকুর তুলে। শুরু হল টীকা দান কর্মসূচী পাশাপাশি ভ্যাক্সিন ডিপ্লোম্যাসি। গুরুত্ব অনুধাবন করে টীকার মজুদকারীরা টীকাকে ব্যবসায়ী পণ্য হিসেবে বাজারে নিয়ে এলো, অধুনা অস্ত্র ব্যবসায়ীরা টীকা ব্যবসায়ী হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াল। যার গ্যাঁড়াকলে অনেক দেশ এখন ও টীকার মুখ দেখেনি। অবশ্য কোভেক্সের মাধ্যমে টীকা সরবরাহের উদ্যোগ টীকা সরবরাহের  খানিক অবসান হয়েছে বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন।

বাংলাদেশ এ ব্যাপারে অনেক তৎপর ছিল বলেই করোনার প্রথম ঢেউ নিয়ন্ত্রণে সরকারের সাফল্য ছিল লক্ষণীয়। সীমিত লকডাউন শুরু থেকেই বলবৎ ছিল , তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৌশলী পদক্ষেপে লকডাউন চলাকালে তৈরি পোশাক শিল্প কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত দূরদর্শী বটে যদি ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল । ফলশ্রুতিতে রফতানি আয় লক্ষ্য মাত্রা ছাড়িয়ে যায় ও পোশাক শিল্পের ৫০ লক্ষ শ্রমিক স্বাস্থ্য বিধির আওতায় থেকে নিরাপদ ছিল বলে অনেকের ধারনা ।।উপরন্তু করোনার ভয়াবহতা বিবেচনা করে সরকার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উদযাপনের জাতীয় কর্মসূচী পুনর্বিন্যাস করেন। 

করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণে এ বছরের ৫ এপ্রিল থেকে বিধি নিষেধ আরোপ করে সরকার । উল্লেখ্য এই সময়কালে দেশে বেশ কয়েকটি উৎসব পালিত হয়। ১৪ এপ্রিল ছিল বাংলা নববর্ষ , একুশের বইমেলা পিছিয়ে দেওয়া হয় , ১৪-১৬ মে ছিল পবিত্র রমযান শেষে ঈদ আল ফিতর। আমরা গভীর উদ্বেগের সহিত পর্যবেক্ষণ করলাম , সরকার আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও ঘরমুখো ঈদ যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় , যেহেতু আন্ত:জেলা বাস চলাচল নিষিদ্ধ ছিল পায়ে হেটে যাত্রা শুরু , বালুর ট্রাকে যাত্রী , সি এন জি , ঠেলা গাড়ী , ভ্যানে ইত্যাদি যান পরিবর্তন করে পাঁচ ঘণ্টার যাত্রা বিশ ঘণ্টায় পারি দিল । ফেরী পারাপারে মানুষের চাপ ছিল অকল্পনীয় , এমনকি চাপাচাপির ফলে প্রাণহানি ঘটেছে । ঈদ পরবর্তী ফেরত যাত্রীদের একি অবস্থা। পুলিশ প্রাণপণ চেষ্টা করে ও জনস্রোত ঠেকাতে পারেনি । ফলে ঈদের পরপর করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পেতে দেখা গেল। 

ইত্যবসরে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে করোনার ভয়াবহতা তুঙ্গে উঠে। ভারতে সর্বোচ্চ দৈনিক ৪০০০ হাজার লোকের প্রাণহানি ও পাঁচ লক্ষ লোকের করোনা শনাক্তের কারণে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমাদের ভাবিয়ে তুলে। সীমান্ত পথে জন চলাচল নিষিদ্ধ করে শুধু পণ্যবাহী যানবাহন প্রবেশের অনুমতি দিয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ভারতে চিকিৎসারত অনেক যাত্রী বিপাকে পড়েন  ও কোরাইন্টাইন ব্যবস্তা রেখে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেন। ভারতের ভ্যারিয়েন্টটি ছিল মানবঘাতী যা দ্রুত ছড়িয়ে পরে ও অল্প সময়ে ফুসফুসের ক্ষতি করে। পরবর্তীতে যা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট হিসেবে নাম দেওয়া হয়। 

বিশেষজ্ঞ মহলের আশংকা অনুযায়ী সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ে , আস্তে আস্তে সারা বাংলাদেশের অনেক জেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এই ভ্যারিয়েন্ট ধরা পরে , দেশে সংক্রমিত প্রতি ১০ লাখে ১০০ জনের মৃত্যু , গত এক সপ্তাহে করোনায় সবচেয়ে বেশী মৃত্যু হয়েছে এমন দেশের আনুপাতিক তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান নবম ।মোট মৃত্যুর হিসেবে আমাদের অবস্থান ৩৪তম। গত পাঁচদিনে ১০০০ লোকের প্রাণহানি সহ করেননা সংক্রমণের হার ৩১% ছিল যা উদ্বেগজনক বটে, তবে গতকাল ৩০% এর কম ছিল।

সংক্রমণ ঠেকাতে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া লকডাউন বা কঠোর বিধিনিষেধ আজ বুধবার রাত ১২টায় শেষ হচ্ছে ।যদি ও দুই সপ্তাহ কঠোর লকডাউন শেষে সংক্রমণের লাগামে আশানুরূপ টান পড়েনি।

বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে পবিত্র ঈদ আল আযহা উপলক্ষে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিনিষেধ শিথিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে কর্তৃপক্ষ । এতে আগামীকাল মধ্যরাত থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মাস্ক পরিধান সহ স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলাচল উন্মুক্ত ও স্বাভাবিক থাকবে কিছু কিছু জায়গায় চলাচলে নিষেধ বহাল রেখে। পবিত্র ঈদ আল আযহা উদযাপন , কোরবানির হাট , পশু বেচাকেনা যা অনলাইনে করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে, নিরাপদ জায়গায় কোরবানি করা , ঈদ জামাতে স্বাস্থ্য বিধি মানা ,যাতায়ত নিশ্চিত করন, দোকান পাঠ খোলা, কেনা কাঠা, ব্যবসা বাণিজ্য তথা আর্থিক কার্যক্রমে গতি ফেরানো এর মুল টার্গেট। তবে ঈদের পর ২৩ জুলাই সকাল ছয়টা থেকে আগামী ৫ আগস্ট রাত ১২টা পর্যন্ত নতুন কিছু বাড়তি শর্ত সহ কঠোর বিধিনিষেধ বলবৎ থাকবে, যাতে শিল্প কারখানা সহ মার্কেট, রিসোর্ট ইত্যাদি  বন্ধ থাকবে। জরুরী স্বাস্থ্য সেবা, আইন শৃঙ্খলা, টীকা দান কর্মসূচী, ত্রাণ বিতরণ,কাঁচা বাজার সহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের চাহিদা মেটানোর ব্যবস্তা থাকবে। কঠোর লকডাউন বাস্তবায়নে পুলিশ, বিজিবির পাশে সেনাবাহিনী সহ বিধি অমান্যকারীদের জেল জরিমানার জন্য নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মাঠে থাকবেন। মোদ্দা কথা, গনপরিবহনে চলাচলে আরোপিত বিধি নিষেধ মানা, স্বাস্থ্য বিধি মানা, আত্মরক্ষা বোধ অর্থাৎ সচেতন হওয়া জরুরী। আগুনে হাত দিলে হাত পুরবে , অনুরূপ ভাইরাস থেকে বাঁচতে হলে বিধি সম্মতভাবে চলতে হবে। দোষাদোষি না করে আত্মশুদ্ধি অবলম্বন করি তবেই পেতে পারি পরিত্রাণ । টীকার বিকল্প হিসেবে মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করি, জনসম্পৃক্ততা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি সহ সবাই মিলে রুখে দাঁড়ালে আমরা জিতে যাব ইনশাল্লাহ।



সবচেয়ে আশার কথা হলো , মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা নতুন করে আরও পাঁচটি প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছেন। ৩২০০ কোটি টাকা প্যাকেজগুলো ব্যয় হবে নিম্ন আয়ের  মানুষের সহায়তা দেয়ার জন্য। এতে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে নগদ অর্থ সহায়তা, পরিবহন শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শহর এলাকার নিম্ন আয়ের মানুষ সহ খোলাবাজারে ওএমএস কার্যক্রম, ৩৩৩ নাম্বারে ফোন করে জরুরী সহায়তা , পর্যটন খাত সহ পল্লী ঋণ সহায়তা ও কিছু মানবিক সহায়তা থাকবে। জীবন জীবিকার চরম দ্বান্ধিক ইস্যুকে কাউন্টার ব্যালেন্স করার লক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মানবিক উদ্যোগ সফল হউক এই আমাদের কামনা। আমরা সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকতার সহিত এর বাস্তবায়নের দাবী জানাই , যাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মুখ উজ্জ্বল হয়।

বিশ্বের অনেক দেশ করোনার কঠিন আঘাত পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ইউরো ফাইনালের ফুটবল ম্যাচে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি তাই জানান দেয়। আমেরিকা, ইউরোপ, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত সহ অনেক দেশ করোনার আক্রমণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জংশন মাস্ক বিহীন চলাফেরা করতে বলে দিয়েছেন। এসব সম্ভব হয়েছে টীকার বদৌলতে। যে সব দেশে ৭০ থেকে ৮০% টীকা কার্যক্রম সম্পন্ন করেছেন তারা নিরাপদ জোনে আছেন বলে দাবী করেন। আমাদের দেশে গন টিকাদান কর্মসূচী চলমান , অনতিবিলম্বে আমরা ও এরকম সাফল্যের দাবীদার হব হলে আশা করতেই পারি। 

সর্বোপরি বলতে চাই , আগামী সাত দিন শিথিল লকডাউন চলাকালে আমাদের সবাই সর্বাত্মক সতর্কতা ও মেপে জোকে চলি, চলতে হবে, সচেতন নাগরিক দায়িত্ব বলতে যা বুঝি তা পুরোপুরি পালন করতে শিখি, গেল ঈদের ভুল থেকে শিখি, ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি না করি, তাহলেই আমরা ও হতে পারবো করোনা জয়ী। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক: 
সদস্য, শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
কার্যকরী সভাপতি, প্রত্যাগত প্রবাসী আওয়ামী ফোরাম, কেন্দ্রীয় কমিটি

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
https://www.dailyvorerpata.com/ad/last (2).gif
https://www.dailyvorerpata.com/ad/agrani.gif
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]