শুক্রবার ৬ আগস্ট ২০২১ ২১ শ্রাবণ ১৪২৮

শিরোনাম: মেসির বার্সা ত্যাগ, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা    প্রযোজক রাজ মাদক মামলায় রিমান্ডে    পরীমনিকে রিমান্ডে পেল পুলিশ    রাতেই আদালতে পরীমনি-রাজ, রিমান্ড আবেদন     ভারতকে বাদ দিয়ে ব্রিটেনের লাল তালিকায় বাংলাদেশ    সিনোফার্মের সাড়ে ৭ কোটি টিকা কিনছে বাংলাদেশ    ভ্যাট দিল গুগল   
https://www.dailyvorerpata.com/ad/Inner Body.gif
করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, বাড়ছে বাল্যবিয়ে!
মোশারফ হোসাইন
প্রকাশ: শনিবার, ১২ জুন, ২০২১, ৭:০৫ পিএম আপডেট: ১২.০৬.২০২১ ৭:১৫ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

আসমা আক্তার ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী, করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বাবা মায়ের অনুরোধে বিয়ে করতে রাজি হয়, বছর না ঘুরতে পারিবারিক কলহের শিকার হয়ে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। আসমার আক্ষেপ করোনার আধাঁর কাটেনি কিন্তু তার জীবনের উপর দিয়ে যে আধাঁরের ভয়াবহতা গিয়েছে সেটা মনে করতেই কান্না আসে। আসমা আরও জানান শুধু তিনিই নয়, তার বেশিরভাগ বান্ধবীদের বিয়ে হয়েছে। 

করোনাকালে বাল্যবিয়ের শিকার হওয়া কিশোরী সাবিনার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বাড়ি থেকে জোড়পূর্বক বিয়ে দেয়া হয়। তখন বাবা মায়ের মুখের উপর কিছু বলার সাহস পাচ্ছিলাম না। আমার আর পড়াশোনা করা হবে কীনা জানিনা। 

করোনাকালে বিয়ের পর গর্ভধারণ করা দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাশিদা বলেন, আমি নিজেই বাবা মায়ের উপর নির্ভর করে চলতাম কিন্তু বিয়ের পর জীবনটা উল্টাপাল্টা হয়ে গেছে। স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষগতা করবো কিন্তু বিয়ে হয়ে গেল আর কিছুদিন পর হয়ত বাচ্চাও হবে, এটার জন্য কী আমি দায়ি নাকি করোনা পরিস্থিতি?। করোনা না থাকলে হয়ত আমার বিয়ে হতো না, আমি এসএসসি পরীক্ষা দিতাম, কলেজের জন্য প্রস্তুতি নিতাম।

গত বছর ইউনিসেফ, ইউএনএফপি ও প্ল্যান বাংলাদেশের সহায়তায় ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ২১টি জেলার ৮৪ উপজেলায় বাল্যবিবাহ নিয়ে জরিপ চালায়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২১ জেলায় ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরগুনায় ১ হাজার ৫১২, কুড়িগ্রামে ১ হাজার ২৭২ ও নীলফামারীতে ১ হাজার ২২২টি বাল্যবিবাহ হয়েছে। ১৬ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে ৫০.৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়েছে, ১৩ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে ৪৭.৭ শতাংশ এবং ১.৭ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়েছে ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে। 

তবে ২০২১ সালে কোনো প্রতিবেদন এবং পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়নি বলে জানান মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। 

এদিকে নিজেদের সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে বেশকিছু শিক্ষার্থীরা এবছর নিজের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করেন তবুও এ যেন সংখ্যায় অনেক কম। সামাজিক সংগঠকরা মনে করছেন সচেতনতার অভাবেই বাড়ছে বাল্যবিবাহ। অসচেতন মানুষদের সচেতন করার দায়িত্ব কাদের জানতে চাইলে সামাজিক সংগঠকরা সরকারে দিকনিদের্শনার উপর নির্ভশীলতার কথা জানান। তারা বলেন সরকারের সদিচ্ছার পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা, আইনের প্রয়োগ, নজরদারি এবং সরকারি বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে দেশ থেকে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা সম্ভব। বাস্তবিক অর্থে দেখা যায়, সরকারি জরুরী সহযোগিতা নম্বর, নারী ও শিশুদের সহায়তার নম্বরে ফোন  করেনা বাল্যবিবাহের শিকার হওয়া শিক্ষার্থীরা, পরিবার এবং আইনি জটিলতার কথা চিন্তা করেই মুখবুজে বিয়ের পিড়িতে বসতে হয় তাদের। 

২০১৭-১৮ সালে অনুষ্ঠিত বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিল কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি ইউনিয়নের বাঁশজানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দল, স্বরলিকা পারভীন ছিলেন এই দলের অধিনায়ক। করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বাল্যবিয়ে হয়ে যায় এই কিশোরী ফুটবলারের, শুধু স্বরলিকা নয়! তার মতো ফুটবলার, ক্রিকেটার ও প্রতিভাব অনেক কিশোরী করোনায় বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছেন। বাল্যবিয়ের ফলে দেশে বাড়ছে মাতৃমৃত্যু, পারিবারিক কলহ, নারীর প্রতি সহিংসতা, বিবাহ বিচ্ছেদ এবং কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনা। গত বছরের ২৫ অক্টোবর টাঙ্গাইল থেকে আসা ১৪ বছরের এক কিশোরী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। 



সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য মতে, তার মৃত্যুর কারণ ছিল যোনিপথে অত্যধিক রক্তক্ষরণ, এ রকম অসংখ্য ঘটনার জন্ম দিয়েছে করোনা পরিস্থিতি, সামাজকর্মীরা বলছেন বাল্যবিবাহ অন্যতম কারণ করোনার পরিস্থিতি, শিক্ষাস্তর ও পরিবার কর্মহীন হয়েপড়া দায়ী, এটা যেন করোনার সাথে বাল্যবিবাহ, এমন পরিস্থিতি দাড়িয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা যেসব তথ্য দিচ্ছে সেগুলো নামমাত্র, বাস্তবিক অর্থে এর পরিসংখ্যান অনেক বড় হবে। তবে জানা যায় দেশের বেশ কিছু এলাকায় ইউনিসেফ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট ট্রাস্ট এর শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষা তরান্বিতকরণ (এপিসি) প্রকল্পের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে পুঁথি গানের পাশাপাশি নাটকও পরিবেশনের পাশাপাশি উঠানবৈঠক ও সচেতন মূলক ক্যাম্পাইন করেছেন।

গত ৯ জুন বেসরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এক  ভাচ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। বৈঠকের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান রাশেদ খান মেনন বলেন, বাল্যবিবাহ বন্ধে যে অগ্রগতি হয়েছিল, করোনায় তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। 

তিনি বলেন, ‘আমরা অবশ্যই বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে পারি, এটা আমাদের অবশ্যকর্তব্য। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাল্যবিবাহ বন্ধে বিশেষ কোনো কর্মসূচি নেই। এ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়ার বিষয়টিতে সুপারিশ করবো। বৈঠকে কিশোরী প্রতিনিধি সীমা আক্তার, আসফিয়া কানিজ ফাতেমা এবং আরজু আক্তার বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও বাল্যবিবাহের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। 

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোঃ মুহিবুজ্জামান (শিশু ও সমন্বয় উইং) এর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, জেলা উপজেলা পর্যায়ে সারাদেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের কমিটি আছে, বাল্যবিবাহ ছেলে পক্ষ ও মেয়ে পক্ষের সম্মতিতেই হয়, এবং সেটা রাতের আধারে। আমরা যখনি বাল্যবিবাহের সংবাদ পাই তখনি পদক্ষেপ নিয়ে থাকি। এটি একটি সামাজিক সমস্যা, সমাজে বাল্যবিবাহ এখনো আছে, রাতের আধাঁরে হওয়ায় অনেক সময় আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারিনা। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনারা কী বাল্যবিবাহ নিয়ে সরকারি সচেতনতার প্রচার প্রচারণা তৃণমূল পর্র্যায়ে দেখতে পাচ্ছেন?। আমাদের কথা হলো প্রত্যেকটা উপজেলায় বাল্যবিবাহ রোধ করার যে কমিটি আছে আসলে  সেটা কাজ করেনা, যদি করতো তাহলে অনেক বাল্যবিবাহ রোধ করা যেত, এখন তো কোনো লকডাউন নেই, সবই স্বাভাবিক তবুও তাদের কাজের অগ্রগতি দেখা যায়না। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকারের যে অঙ্গিকার ও প্রত্যয় সেটা আরও দৃঢ় করতে হবে। 

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
https://www.dailyvorerpata.com/ad/last (2).gif
https://www.dailyvorerpata.com/ad/agrani.gif
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]