শুক্রবার ● ২২ জানুয়ারি ২০২১ ● ৮ মাঘ ১৪২৭ ● ৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২
https://www.dailyvorerpata.com/ad/Inner Body.gif
সূর্যালোকে চির ভাস্বর-উজ্জ্বল বঙ্গবন্ধু
ড. কাজী এরতেজা হাসান
প্রকাশ: রোববার, ১০ জানুয়ারি, ২০২১, ১২:০০ এএম | অনলাইন সংস্করণ

সূর্যালোকে চির ভাস্বর-উজ্জ্বল বঙ্গবন্ধু

সূর্যালোকে চির ভাস্বর-উজ্জ্বল বঙ্গবন্ধু

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মেছিলেন বলেই আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের আলো বাতাসে বড় হয়েছি। দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মাধ্যমে যৌবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সময়গুলো কারাগারে থেকেও বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের মহানায়ক হয়ে তিনি চির অমর হয়ে গেছেন। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিনই বঙ্গবন্ধুর নাম অম্লান থাকবে। 
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তদানীন্তন ভারতীয় উপমহাদেশের বঙ্গ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার পাটগাতি ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে  এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। শেখ লুৎফর রহমান ও মোসাম্মৎ সাহারা খাতুনের চার কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে তৃতীয় সন্তান শেখ মুজিব। বাবা-মা ডাকতেন খোকা বলে। খোকার শৈশবকাল কাটে বাইগার নদীর কোলঘেষা টুঙ্গিপাড়ায়।

১৯২৭ সালে ৭ বছর বয়সে গিমাডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন। নয় বছর বয়সে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন। পরে তিনি স্থানীয় মিশনারি স্কুলে ভর্তি হন। নয় বছর বয়সে তথা ১৯২৯ সালে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন এবং এখানেই ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেন।

১৯৩৪ সালে ১৪ বছর বয়সে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হলে তার একটি চোখ কলকাতায় অপারেশন করা হয় এবং চক্ষুরোগের কারণে তার লেখাপড়ার সাময়িক বিরতি ঘটে। চক্ষুরোগে চার বছর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার পর  ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জে মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন।

১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে তিনি এন্ট্রাস পাশ করেন ও কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে মানবিক বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে ভর্তি হন।  এদিকে তিনি কলকাতার ধর্মতলার বেকার হোস্টেলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। উল্লেখ করা যায়, সে সময় কলকাতায় শুধু বেকার হোস্টেল এবং কারমাইকেল হোস্টেলে মুসলিম ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। বঙ্গবন্ধু বেকার হোস্টেলের যে কক্ষে থাকতেন, সেই কক্ষটি এখনো আছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেই কক্ষটি যত্ন করে সংরক্ষণ করছে। সেই কক্ষটি এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি নিয়ে একটি জাদুঘর। বঙ্গবন্ধুর বাবা প্রতি মাসে কলকাতায় যে অর্থ পাঠাতেন, তা দিয়ে নিজের ও তাঁর সহপাঠী ভূমিহীন ক্ষেত-মজুরের ছেলে শেখ শাহাদাৎ হোসেনের পড়ালেখা চলত। ১৯৪৭ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় এসে প্রথমে ১৫০ নং মোগলটুলীর কর্মী-ক্যাম্পে ওঠেন। তাঁর বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলে আইনজীবী হবেন। বাবার ইচ্ছে পূরণে ১৯৪৭ সালের শেষ দিকে বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং মাঝে মাঝে সলিমুল্লাহ হলে থাকতেন।  তিনি ১৯৪৯ সালের ৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের দাবিদাওয়া আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এ অভিযোগে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে পুনরায় পড়াশোনার সুযোগ দিতে রাজি ছিল- যদি ভবিষ্যতে ভালো হয়ে চলার ‘বন্ড’ সই করেন এবং ১৫ টাকা জরিমানা দেন। মুজিব ঐ জরিমানা বা বন্ড সই কোনোটিই দিতে রাজি হননি। বহিষ্কৃত হওয়ার পর তিনি গ্রেফতার হন এবং ১৯৫২ সালের শেষ পর্যন্ত বন্দিজীবন কাটান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হলেও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল দুর্বলতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো আন্দোলনে তিনি সমর্থন দেন।

ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সকল আন্দোলনে তিনি অনুপ্রেরণা দেন। ১৯৭১ সালের ২ ও ৩ মার্চ ছাত্র সমাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে যে শপথ নেয় তাতে বঙ্গবন্ধু পূর্ণ সমর্থন জানান। দেশ স্বাধীন হলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য ব্যাপক সহায়তা দেন। পাকিস্তান আমলে ঢাকাসহ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর যে কলাকানুন ছিল ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর তা তিনি বাতিল করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৩ অনুমোদন করেন। এর আগে ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করেন।

১৯৭২ সালের মে মাসে ডাকসুর আজীবন সদস্য পদের ডকুমেন্ট এ স্বাক্ষর করেন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-র আমন্ত্রণে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। ডাকসু আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে ডাকসু’র জীবন সদস্যপদ দেয়া হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুক্রবার বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়ার কথা ছিল। ঐদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ ঘোষণার সিদ্ধান্তও ছিল। কিন্তু ঘাতকের বুলেটের আঘাতে নিহত হওয়ায় তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া আর হয়নি।

এবার আসি আসল কথায়। আজ ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৭২ সালের এই দিনে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি পাকিস্তানের কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্তি লাভ করে তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করে। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে থেকে মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসার মাধ্যমে সে বিজয় পূর্ণতা লাভ করে। এইদিন স্বাধীন বাংলার নতুন সূর্যালোকে সূর্যের মতো চির ভাস্বর-উজ্জ্বল মহান নেতা ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফিরে আসেন তার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে। স্বদেশের মাটি ছুঁয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের নির্মাতা শিশুর মতো আবেগে আকুল হলেন। আনন্দ-বেদনার অশ্রুধারা নামলো তার দু’চোখ বেয়ে। প্রিয় নেতাকে ফিরে পেয়ে সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালি আনন্দাশ্রুতে সিক্ত হয়ে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনিতে প্রকম্পিত করে তোলে বাংলার আকাশ বাতাস। জনগণনন্দিত শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়িয়ে তার ঐতিহাসিক ধ্রুপদী বক্তব্যে বলেন, ‘যে মাটিকে আমি এত ভালবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি যেতে পারবো কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইয়েদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’

যুদ্ধবিধ্বস্ত ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সদ্য স্বাধীন বাঙালি জাতির কাছে ছিল একটি বড় প্রেরণা। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ তিতিক্ষা, আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে বাঙালি জাতি যখন কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি তখন পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। ২৯০ দিন পাকিস্তানের কারাগারে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর প্রহর গুনতে গুনতে লন্ডন-দিল্লি হয়ে মুক্ত স্বাধীন স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসেন বাঙালির ইতিহাসের বরপুত্র শেখ মুজিবুর রহমান। সে থেকে প্রতিবছর কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি নানা আয়োজনে পালন করে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস।

লেখক:
সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক ভোরের পাতা, দ্য পিপলস টাইম
সহ-সভাপতি, সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগ
পরিচালক, এফবিসিসিআই
সদস্য, কেন্দ্রীয় শিল্প-বাণিজ্য উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ইরান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ








https://www.dailyvorerpata.com/ad/BHousing_Investment_Press_6colX6in20200324140555 (1).jpg
https://www.dailyvorerpata.com/ad/last (2).gif
https://www.dailyvorerpata.com/ad/431205536-ezgif.com-optimize.gif
https://www.dailyvorerpata.com/ad/agrani.gif
সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]