শনিবার ৬ মার্চ ২০২১ ২১ ফাল্গুন ১৪২৭

শিরোনাম: অনন্য অসাধারণ শেখ হাসিনা আমাদের গর্ব    নরসিংদীতে ‘থার্টি ফার্স্ট’ উপলক্ষে চাঁদা না দেয়ায় ব্যবসায়ীকে কোপালো সন্ত্রাসীরা    না.গঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণ: ২৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র    টেকনাফের রাখাইনে স্বামীর ছুরিকাঘাতে স্ত্রী খুন,ঘাতক স্বামী গ্রেফতার     শালিখায় গণতন্ত্রের বিজয় দিবস উদযাপন    আমার গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান পরিচয় আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান:তাপস    মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের আংশিক কার্যক্রম বন্ধ   
গোপালপুর গণহত্যা, নোয়াখালী
স্বাধীন বাংলার পতাকা রাখায় ক্রুদ্ধ পাকবাহিনী হত্যাযজ্ঞে মেতেছিল
আরিফ রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২০, ১:২৮ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

স্বাধীন বাংলার পতাকা রাখায় ক্রুদ্ধ পাকবাহিনী হত্যাযজ্ঞে মেতেছিল

স্বাধীন বাংলার পতাকা রাখায় ক্রুদ্ধ পাকবাহিনী হত্যাযজ্ঞে মেতেছিল

১৯ আগস্ট ১৯৭১, সকাল আনুমানিক দশটা। অত্যাধুনিক অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রায় দেড়শ পাক সৈনিক নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার বাংলাবাজার থেকে হেঁটে উত্তরে গোপালপুরের দিকে আসতে থাকে। বর্ষার কারণে তখন গোপালপুর ছিল গাড়ি চলাচলের অনুপযোগেী। পাকসেনা আসার খবর পেয়ে বাজারের মানুষ পালাতে থাকে। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ডা. আনিস তখন বাজারে ছিলেন, এর আগেও বহুদিন পাকি বাহিনী আসার গুজবে বাজারে লুট হতো। এ ভেবে ডা. আনিস বলতে লাগলেন, কেউ আসেনি, তোমরা ভয় পেও না। 

পাকসেনারা বাংলাবাজার থেকে পায়ে হেঁটে গোপালপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। বেতুয়া বাজারের মোড় নামক স্থানে এসে তারা দুইভাগে বিভক্ত হয়। রাজাকাররা বাজারের পশ্চিম দিকের প্রাইমারি স্কুলের পথ অবরোধ করে। পাক হানাদার সেনারা বাংলাবাজার থেকে গোপালপুর আসার উত্তর পাশের পথটি দিয়ে পুরো বাজার ঘেরাও করে। তখন অনেক মানুষ স্কুলের মাঠে চলে যায়। রাজাকাররা ওইসব মানুষকে ফিরিয়ে আনে। তারা বলে, আমরা তোমাদের কোন ক্ষতি করবো না। এখানে পিস কমিটির মিটিং হবে। স্থানীয় মাহবুবুল হায়দার চৌধুরী নসা মিয়া তখন উপস্থিত সবাইকে বলেন, ‘আমি বাঁচলে তোমরাও বাঁচবে। তোমরা ভয় পাবে না।’ নসা মিয়া ছিলেন গোপালপুরের ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে গোপনে যোগাযোগ করে তাদের পক্ষে কাজ করার জন্য মুসলিম লীগে যোগ দেন। গোপালপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম ভারতে চলে গেলে ডা. আনিসসহ পরামর্শ করে তিনি চেয়াম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নসা মিয়া নৌকায় করে যাচ্ছিলেন চৌমুহনী। তিনি সেনাবাহিনীর আগমনের সংবাদে নৌকা ফিরিয়ে বাজারের দিকে চলে আসেন। স্বল্পসংখ্যক হলেও মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। নসা মিয়া গণহত্যা ও অগ্নিসংযাগে ইত্যাদি এড়ানোর জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ না করে সরে যেতে বলেন। পাশাপাশি বাজারের ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষকেও বাজার ত্যাগ করতে পরামর্শ দেন। নসা মিয়া নিজেকে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা পরিচয় দিয়ে গণহত্যা ঠেকানারে চেষ্টা করেন। পাক সেনাবাহিনী বাজারে এসে প্রথমে খোঁজ করে ডা. আনিসকে। নসা মিয়া তখন সেনাবাহিনীকে বললেন, ডা. আনিসকে তার বাবা ত্যাজ্য করে দিয়েছে। সে এখন বাড়িতে নেই। নসা মিয়া বিষয়টি গোপন করেন মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচানোর জন্য। স্থানীয় রাজাকার মফিজুর রহমান ছিলেন তখন গোপালপুর ইউনিয়নের মেম্বার। তিনি পাক সেনাবাহিনীকে প্রতিদিন রিপোর্ট প্রদান করতেন। সেনাবাহিনী নসা মিয়াকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কে? উত্তরে নসা মিয়া বললেন, আমি পিস কমিটির চেয়ারম্যান, আমার দায়িত্ব সাপ্তাহিক সংবাদ প্রেরণ। তারা পুনরায় জিজ্ঞেস করল, তুমি এই সপ্তাহে কী রিপার্টে দিয়েছ? নসা মিয়া কৌশল করে বললেন, এই সপ্তাহে আমি মুক্তিবাহিনীর নাম শুনেছি, কিন্তু তাদেরকে দেখিনি। একদিন রাতে শুনেছি মুক্তিবাহিনী নৌকায় করে গোপালপুরে এসেছে। আমি তাৎক্ষণিক বের হয়ে গিয়ে তাদেরকে পাইনি। নসা মিয়া হানাদার সেনাবাহিনীকে বোঝানারে চেষ্টা করেন এখানে মুক্তিযোদ্ধারা থাকেন না এবং এখানে কোনো ট্রেনিং সেন্টারও নেই। অথচ আগের রাতেও তিনি মুক্তিবাহিনীর জন্য জামা-কাপড়, ঔষধ ও অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ করেন। তার ধারণা ছিল তিনি যেহেতু মুসলিম লীগ করেন এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে তার জানাশোনা আছে, তার কথায় হয়তো পাক হানাদার বাহিনী মানুষজনের ওপর অত্যাচার, হত্যা কিংবা বাড়ি-ঘরে আগুন দেওয়া থেকে বিরত থাকবে।

তখন রাজাকার মফিজুর রহমান বললো, এখানে কৃষি অফিসে মুক্তিবাহিনী তাদের কার্যক্রম চালায়। গতকাল রাতেও মুক্তিবাহিনী ছিল। নসা মিয়া তাদেরকে সাহায্য করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তার কথা শুনে রেগে যায় এবং নসা মিয়াকে রাইফেল দিয়ে বাড়ি দেয়, বুকে লাথি মারে এবং গালাগাল করতে থাকে। রাজাকারদের ইন্ধন এবং প্ররোচনায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তার কোনো কথাই শুনল না। পাকিস্তানি সেনারা বাজারে আসা প্রায় শ’ খানেক লোককে বন্দি করে গোপালপুর বাজারের গোলাম নবী রোডের উপরে বাজারের দক্ষিণ পার্শ্বের খাল পাড়ে বসিয়ে রাখে।

এলাকায় যেন কোন ধরণের নারী নির্যাতন না ঘটে সে দিকে নসা মিয়া লক্ষ রাখতেন। তার কাছে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর কমান্ডার জানতে চায়, আনিস ডাক্তার, সুবেদার মেজর জব্বর আলী কোথায়? তিনি এই প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি। বাজারের দোকানে দোকানে ওরা খুঁজতে থাকে স্বাধীন বাংলার পতাকা। কেননা তখনকার বেশিরভাগ বাঙালি, যারা সরাসরি যোদ্ধা ছিলেন না, তারা নিজেদের কাছে বাংলাদেশের পতাকা রাখতেন। তখন গ্রাম-গঞ্জে দোকান-পাটে দেখা যেত এই পতাকা। নসা মিয়ার মুদি দোকানের পাশেই ছিল ছিদ্দিকুলের দর্জির দোকান। সেই দর্জির দোকানে পেয়ে যায় তারা স্বাধীন বাংলার পতাকা। স্বাধীন বাংলার পতাকা দেখেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতো তারা। যথারীতি ক্রোধে ফেটে পড়ে পাকিস্তানি বাহিনী। উন্মত্ত পাকিস্তানি বাহিনী এসময় ইউপি সদস্য দ্বীন ইসলাম, ব্যবসায়ী ছিদ্দিক উল্যা, তার দোকানের কর্মচারী হাবিব উল্যা, দর্জি দোকানের মালিক মোহাম্মদ উল্যা দর্জিকে বাজারের মাঝখানেই বেধড়ক পিটুনি দেয়। 

পাকিস্তানি সেনারা আটককৃত লোকেদের মধ্য থেকে অপ্রাপ্ত বয়স্ক, হালকা দেহের অধিকারী অর্থাৎ যেসব লোক যুদ্ধে অংশগ্রহণে অপারগ বলে মনে হয়েছে তাদেরকে ছেড়ে দেয়। বাকি লোকদের কালেমা পড়ায়। নসা মিয়া কিছু লোককে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরাধে করেন। তার অনুরোধে পাকিস্তানি সেনারা লাইনে দাঁড় করানো মসজিদের ইমাম হাফেজ আজিজুর রহমান, পোস্টম্যান আব্দুল মান্নান, গোপালপুর ইউনিয়নের কষি অফিসার, কেরানিসহ কয়েকজনকে ছেড়ে দেয়। বাজারে একজন নিরীহ হিন্দু লোক মুড়ি বিক্রি করত। তার গলায় ছিল রুদ্রাক্ষের মালা। পরনে ছিল ধুতি। পাকিস্তানি সেনারা তাকে মালাউন বলে গালাগাল করতে লাগলো। নসা মিয়া বলেন, লোকটি খুবই গরিব। সে বাজারে মুড়ি বিক্রি করে কোন রকমে সংসার চালায়। তখন তাকে ছেড়ে দেয়। এরপর শহীদদের তাজা রক্তে লাল হয়ে যায় ভরা বর্ষার খালের পানি। ব্রাশফায়ারের পরও যারা বেঁচেছিলেন তাদের বেয়োনেট চার্জ করে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা চলে যাওয়ার পর শহীদদের স্বজনরা এসে তাদের লাশ নিয়ে যায়। শহীদদের লাশ সমাহিত করা হয় নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানে। হতভাগ্য লোকদের অপরাধ ছিল তারা বলেননি কারা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, কারা মুক্তিযাদ্ধো। তাদের অপরাধ তারা তাদের দোকানে রেখেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। সুজায়েত উল্যাহ ছিলেন হাসপাতালের কম্পাউন্ডার। তার বাড়ি ছিল লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। তিনি পাকিস্তানি সেনাদেরকে কম্পাউন্ডার পরিচয় দিলে তারা তাকে কমান্ডার ভেবে ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলে। একই সময় প্রাইমারি স্কুলের সামনের বাড়ির মোহাম্মদ উল্যাহ নামক যুবককে গুলি করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। তার গায়ে ছিল গেঞ্জি। চেহারা ছিল সুশ্রী। সে চায়ের দোকান করত। পাকিস্তানি সেনারা প্রথমে তার বুকে থাপড় দিয়ে বলে, ইয়ে সালা মুক্তি হয়। 

নসা মিয়া তখন পাকিস্তানি সেনাদেরকে অনুরাধে করেন, সে গরিব ছেলে। তাকে যেন ছেড়ে দেয়। তাকে মেরে লাভ কী? চেয়ারম্যান হিসেবে আমি অপরাধ করেছি। তোমরা আমাকে মারো। নসা মিয়া তখন তার পাঞ্জাবি ছিড়ে বুক খুলে দেন। তখন পাকিস্তানি সেনারা তার বাহুতে গুলি করে এবং লাথি মেরে তাকে বসিয়ে রাখে। নসা মিয়ার মাথায় ছিল গোল টুপি। তিনি এক হাত দিয়ে ক্ষত স্থানটি চেপে ধরেন এবং অপর হাতের টুপি দিয়ে চোখ ঢেকে রাখেন। পাকিস্তানি সেনারা ওইদিন গাপোলপুর বাজার আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। বাজারের উত্তর পার্শ্বস্থ গাপোলপুর মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান লাতু মিয়ার বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং বেশ কয়েকটি বাড়িতে হানা দিয়ে বাড়ির লোকদের মারধর ও অনেক মহিলাকে নির্যাতন করে। একঘণ্টার অধিক তারা গোপালপুর বাজারে অবস্থান করে। পরে আরও দুই বার গোপালপুর আক্রমণ করে পাকিস্তানি বাহিনী। দ্বিতীয় আক্রমণে ডা. আনিসুল ইসলামের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। তৃতীয় আক্রমণে গাপোলপুর ইউনিয়নস্থ সিরাজউদ্দিনপুরের রামকৃষ্ণ আশ্রমের সাধুকে পুড়িয়ে মেরে ফেলে এবং আশ্রমের নিকটস্থ ডা. যতীন্দ্র কুমার নাথ এবং কুনিরাম সর্দারের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।

১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরের উদ্যোগে প্রকাশিত গণহত্যা-নির্যাতন  নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালায় গোপালপুর গণহত্যা নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের এমফিল গবেষক মো. নুর নবী লিখিত সেই গ্রন্থে গোপালপুর গণহত্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। 

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  

সারাদেশ

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]