শুক্রবার ● ২৭ নভেম্বর ২০২০ ● ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ ● ১০ রবিউস সানি ১৪৪২
https://www.dailyvorerpata.com/ad/Inner Body.gif
ব্লু ইকোনমি ও পর্যটন শিল্প
ড. মোহাম্মদ শামসুর রহমান
প্রকাশ: রোববার, ২৫ অক্টোবর, ২০২০, ১০:৩১ পিএম আপডেট: ২৫.১০.২০২০ ১০:৪৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

ব্লু ইকোনমি ও পর্যটন শিল্প

ব্লু ইকোনমি ও পর্যটন শিল্প

আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ার পর 'ব্লু ইকোনমি’ শব্দটির সঙ্গে  বাংলাদেশের মানুষের ব্যাপক পরিচিতি ঘটে। সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির অনেক উপকরনের মধ্যে পর্যটন খাত অন্যতম। এ দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে সমুদ্র ব্যবস্থাপনায় পর্যটনখাত গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখার অপরিসীম সুযোগ রয়েছে। ব্লু ইকোনমি হচ্ছে সমুদ্রসম্পদ নির্ভর অর্থনীতি। অধ্যাপক গুন্টার পাউলি ১৯৯৪ সালে প্রথমবারের মতো ব্লু ইকোনমি  ধারনা প্রবর্তন করেন। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সংস্থা  সমূহ (UNEP, WORLD BANK, FAO, EU) তাদের উন্নয়ন কৌশল  প্রণয়নে ব্লু ইকোনমি কে যথেষ্ঠ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সভা সম্মেলনের পাশাপাশি বাংলাদেশেও ব্লু ইকোনমি নিয়ে  প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সভা সম্মেলন, সেমিনার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই সব সভা-সেমিনারে কিভাবে বিশাল সমুদ্রসম্পদকে কাজে লাগিয়ে দেশের জিডিপি ডাবল ডিজিটে নেয়া যায়, এ ব্যাপারে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সুপারিশ মালা প্রণীত হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া, অস্টোলিয়াসহ অনেক দেশেরই  জাতীয় অর্থনীতির সিংহভাগ সমুদ্র নির্ভর। বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহনের মাধ্যমে কিভাবে সমুদ্র অর্থনীতির চাকা সচল রাখা বা আরো উন্নতি করা যায় এ ব্যাপারে দেশগুলি নতুন নতুন কৌশল প্রণয়ন করছে যা অনুসরনের মাধ্যমে বাংলাদেশও সমুদ্র সেক্টরে প্রভূত উন্নয়ন সাধন করতে পারে। এস ডি জি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা ও ভিশন-২০৪১ অর্জনের জন্য ব্লু ইকোনমি কে বাংলাদেশ সরকার অন্যতম হাতিয়ার হিসাবে বিবেচনা করছে। এ জন্য সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশে সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্র চিহ্নিত করে  কাজ শুরু করেছে।  যেমন সমুদ্রবন্দর, জাহাজ নির্মান শিল্প, সামুদ্রিক মৎস্য ও অন্যান্য জলজ পন্য, জৈব প্রযুক্তি, তেল গ্যাস ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ ইত্যাদি ছাড়াও উপকূলীন পর্যটন একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ন খাত হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। 

চিহ্নিত বিভিন্ন সেক্টরের সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়ার জন্য দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তুলতে বাংলাদেশ সরকার 'বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ  ইনস্টিটিউট’  এবং 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইমস ইউনিভার্সিটি' প্রতিষ্ঠা করছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশ নৌবাহিনী কর্তৃক সমুদ্র সম্পদ গবেষণার  জন্য বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিটাইম রিচার্স এন্ড ডেভেলপমেনট (ইওগজঅউ) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সমুদ্র উপকূল ভিত্তিক পর্যটনের প্রসারে ও ইওগজঅউ কাজ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে মূলত ব্লু ইকোনমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য। সমুেদ্র পাওয়া ১,১৮,৮১৩ বর্গ কি.মি. এলাকার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ডেলটা প্লান-২১০০ প্রণয়ন করা হয়েছে যেখানে সমুদ্র ভিত্তিক অর্থনীতিকে অগ্রধিকার ভিত্তিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার আমেরিকা, জাপান, চীন, ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে সহযোগিতা পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় উন্নয়নে সমুদ্রসম্পদের গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯৭৪ সালে প্রথম মেরিটাইম জোনস এ্যাক্ট পাসের মাধ্যমে দেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ ও ২০১৪ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক প্রচেষ্টায় সালিশি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা সম্পর্কিত বিরোধ নিস্পতি হয়। যার ফলে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে এক লক্ষ আঠার হাজার আটশত তের বর্গ কিলোমিটারের বেশী সমুদ্র এলাকায় অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। এ বিশাল সমুদ্রসীমায় অবস্থিত প্রানীজ ও অন্যান্য সম্পদের সর্বভৌম অধিকার রক্ষায় বর্তমান সরকার নতুন করে মেরিটাইম জোনস এ্যাক্ট ২০১৯ মন্ত্রিপরিষদ সভায় অনুমোদন দেয়। নতুন আইনটি প্রবর্তনের মাধ্যমে ব্লু ইকোনমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সহজতর হবে।

'পর্যটন' শব্দটি ১৯৩৯ সালে প্রথম ব্যবহৃত হলেও জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৭৫ সালে 'বিশ্ব পর্যটন সংস্থা' গঠিত হয়, বাংলাদেশ যার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ষড়ঋতুর এ বাংলাদেশের বৈচির্ত্যময় পরিবেশ, সমুদ্র ও উপকূলভিত্তিক পর্যটনের একটি অনন্য কেন্দ্র হয়ে উঠার সব ধরনের সুযোগ রয়েছে। সমুদ্ররেখা বরাবর ৭১০ কি. মি. উপকুল, পৃথিবীর দীঘর্তম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, একক সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনা াল-সুন্দরবন, পদ্মা-মেঘনা-যমুনার প্রবাহ বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থল-মোহনা, কুয়াকাটা, প্রবাল দ্বীপ-সেন্টমার্টিনসহ অন্যান্য অনেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান রয়েছে, যা সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনের প্রান কেন্দ্র হিসাবে বিবেচিত। সমুদ্র অর্থনীতির অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহন করেছে। এর মধ্যে দ্রুত যোগাযোগের জন্য কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ নির্মান অন্যতম। এছাড়াও সুন্দরবন ভিত্তিক ইকো- ট্যুরিজম এর উন্নয়নে ও ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সমুদ্র ও উপকুলভিত্তিক পর্যটনের জন্য পাবলিক ও প্রাইভেট সেক্টরে বিভিন্ন ধরনের উদ্যেগ নেওয়া প্রয়োজন। যেমন- ছোট ও মাঝারি মানের ভ্রমনতরী, অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্মলিত হোটেল, কটেজ, রেষ্টরেন্ট নির্মান, বীচ ফুটবল/ভলিবল আয়োজন, সর্ফিং ক্লাবসহ ছোট ছোট দ্বীপসমূহকে পর্যটনের আওতায় নিয়ে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ন। এ জন্য প্রয়োজন বোধে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহ যেমন মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড থেকে আমাদেরকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষন ও সাহায্য নিতে হবে।

যেখানে বিশ্ব জিডিপির ৫% এবং মোট কর্মস্থানের ৬-৭% উপকূলীয় পর্যটন থেকে আসে, সেখানে আমাদের আর পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কে আকর্ষন করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন এখন সময়ের দাবী। সমুদ্রভিত্তিক পর্যটন শিল্পের প্রসারে অন্যান্য সেক্টরের ও সাহায্য নেওয়া যেতে পারে, যেমন- চিংড়ি চাষ, কাঁকড়া চাষ, লবন চাষ, শুটকি উৎপাদন, ঝিনুক ও মুক্তা চাষসহ অন্যান্য অনেক শিল্পকে পর্যটনের সাথে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে পর্যটকদের আকৃষ্ট করা যেতে পারে। বিশ্বব্যাপী সমুদ্র অর্থনীতির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য মেরিন স্পেসিয়াল প্লানিং (গধৎরহব ঝঢ়ধঃরধষ চষধহহরহম, গঝচ)  গ্রহন করা হয় যা আমাদের দেশে দ্রুতই শুরু করা প্রয়োজন। এর আওতায় সমুদ্র অর্থনীতির সকল অনুষঙ্গসমূহ বিবেচনা করা হয়। যেমন - নৌচলাচল, মৎস্য আহরন ও মেরিকালচার, তেল-গ্যাস উত্তোলন, উপকূলীয় উন্নয়নসমূহ অন্যান্য, এই প্ল্যানিং এর আওতায় পর্যটন শিল্পকে ও নিয়ে আসতে হবে যাতে করে গভীর সমুদ্র ও উপকূলের কোন কোন স্থানসমূহ পর্যটনের জন্য অধিক উপযুক্ত তা চিহ্নিত করা যায় এবং প্রয়োজনীয় উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটক আকর্ষন করা যায়। তবেই পর্যটন শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে সমুদ্র অর্থনীতির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সহজ হবে।

লেখক: অধ্যাপক, মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






https://www.dailyvorerpata.com/ad/BHousing_Investment_Press_6colX6in20200324140555 (1).jpg
https://www.dailyvorerpata.com/ad/last (2).gif
https://www.dailyvorerpata.com/ad/431205536-ezgif.com-optimize.gif
https://www.dailyvorerpata.com/ad/agrani.gif
সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: vorerpata24@gmail.com news@dailyvorerpata.com