মঙ্গলবার ● ১১ আগস্ট ২০২০ ● ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭ ● ২০ জিলহজ্জ ১৪৪১
ডব্লিউটিসির নৈরাজ্য
নিজস্ব লাইটার জাহাজে পণ্য পরিবহনে বাঁধায় আতঙ্কে আমদানিকারকরা
অভ্যন্তরীণ রুটে পণ্য পরিবহনে বিশৃঙ্খলার শঙ্কা। ডব্লিউটিসির ছাড়পত্র ছাড়া মাদার ভেসেল থেকে পণ্য আনায় বাঁধা।
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২০, ৮:০২ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

নিজস্ব লাইটার জাহাজে পণ্য পরিবহনে বাঁধায় আতঙ্কে আমদানিকারকরা

নিজস্ব লাইটার জাহাজে পণ্য পরিবহনে বাঁধায় আতঙ্কে আমদানিকারকরা

নাব্যতা কমের কারণে দূর সমুদ্রে মাদার ভেসেল নোঙর করা হয়। আর সেই জাহাজ থেকে আমদানি করা পণ্য ছোট বা লাইটার জাহাজে দেশের ৩৭টি ঘাট ও শিল্প মালিকদের কারখানা ঘাটে নিয়ে খালাস করা হয়। এসব পণ্যের বড় অংশ সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল, ইস্পাতের কাঁচামাল, কয়লা, সার ও ভোগ্য পণ্য। তবে উপকূল অতিক্রমের অনুমতিপত্র থাকার পরও মালবাহী নৌযানকে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের (ডব্লিউটিসি) ছাড়পত্র নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করায় অভ্যন্তরীণ রুটে পণ্য পরিবহনে নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে। আর ডব্লিউটিসির এই নৈরাজ্যে অভ্যন্তরীণ নৌ-রুটে পণ্য পরিবহনে বিশৃঙ্খলা ও সাপ্লাই চেইন ভেঙ্গে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নিজের লাইটার জাহাজের পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা থাকলেও অন্যের মুখ চেয়ে থাকতে হচ্ছে শিল্প উদ্যোক্তা ও আমদানিকারকদের।

সূত্র জানায়, উদ্যোক্তাদের আমদানি পণ্য নিজেদের জাহাজে নিজ কারখানায় পরিবহনে বাঁধা দিচ্ছে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি)। কর্ণফুলী নদী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন নৌ-ঘাটে নিয়ে হুমকি ধামকি দিচ্ছে। লাইসেন্স ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে জাহাজ আটক করা হচ্ছে। এ ধরনের বেপরোয়া কর্মকান্ডে নদীপথে পণ্য পরিবহনে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বাঁধা পাচ্ছে ভোগ্য পণ্য ও শিল্প কারখানার পণ্য।

সূত্র জানায়, ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের এই নৈরাজ্যের মূলে রয়েছে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের এক আদেশ। গত ৪ জুন জারি করা মহাপরিচালক কমডোর সৈয়দ আরিফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই সার্কুলারে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ মালবাহী নৌযানসমূহের অনুকূলে উপকূল অতিক্রমের অনুমতিপত্র (বে-ক্রসিং) থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো অভ্যন্তরীন মালবাহী নৌযান ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের ছাড়পত্র ব্যতীত মালামাল পরিবহন করে তাহলে ঐসকল মালবাহী নৌযানের মালিক ও এজেন্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে।

অভিযোগ উঠেছে, নিজেদের নিয়ন্ত্রন খর্ব হয়ে যাওয়ায় জোর করে সব লাইটার জাহাজ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের অধীনে নিয়ে আসতে চাইছে। অথচ নেতারা যে ডব্লিউটিসির বাইরে জাহাজ চালাচ্ছেন। অধিদপ্তরের আদেশ পেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন ডব্লিউটিসি নেতারা।

গত ২৯ জুন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সাথে বৈঠক করেছেন শিল্প মালিক ও বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশন। মাদার ভেসেল থেকে ডব্লিউটিসির মাধ্যমে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাসের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরা হয়। আমদানিকারকরা বলেন, কোন মালিকের জাহাজ কি কার্গো লোড করবে তার জন্য উব্লিউটিসি ও মালিকেরাই যথেষ্ট। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কারো পক্ষ নেওয়ার দরকার নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদার ভেসেলের জন্য ডব্লিউটিসি থেকে ভাড়া করা জাহাজে নানা সমস্যা। ভাড়া বেশি হলেও লাইটার জাহাজসমূহ ক্রুটিপূর্ণ ও মানহীন। বীমা নেই। জাহাজের মাস্টার ও নাবিকরা কার্গো চুরিতে যুক্ত। অভিযোগ করার পরও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। জাহাজের ডিবি ট্যাঙ্কের কোনো সাউন্ডিং পাইপ না থাকায় জাহাজের কার্গো সঠিকভাবে পরিমাপ করা যায় না বিধায় কার্গো অথবা ব্যালাস্ট ওয়াটার ডিবি ট্যাঙ্কে স্থানান্তর করে কার্গো চুরি সহজ হয়।

আমদানিকারকরা বলছেন, লাইটার জাহাজ চাওয়া হলে যথাসময়ে পাওয়া যায় না। ডব্লিউটিসির অনীহার কারণে মাদার ভেসেলকে বসিয়ে রেখে খোয়াতে হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। এতে বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। আমদানি ব্যয় বাড়ায় চাপ পড়ছে ভোক্তার উপর।

নদীপথে পণ্য পরিবহনে ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনতে জাহাজ মালিকদের সংগঠনগুলো ২০০৩ সালে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল গঠন করে। পণ্য পরিবহনে ডব্লিউটিসি থেকে লাইটার জাহাজ ভাড়া নিতে হত। ২০১৩ সালে লাইটার জাহাজে চরম সংকটে একটি জাহাজ বরাদ্দ পেতে একমাসের বেশি সময় অপেক্ষায় থাকতে হয়েছিল। ঠিকমতো লাইটার জাহাজ বরাদ্দ না পেয়ে পণ্য পরিবহনে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন দেশের বড় শিল্পগ্র“পগুলো। তখন অন্তত ২৫ শিল্প মালিক নিজেদের বিনিয়োগে ছোট জাহাজ তৈরী করেন। একেকটি জাহাজ তৈরীতে খরচ হয় ১০ কোটি টাকার বেশি। তখন থেকেই নিজেদের জাহাজেই নিজেদের পণ্য পরিবহন শুরু করেন জাহাজ মালিকরা।

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের ছাড়পত্র ছাড়া মালামাল পরিবহন করা যাবে না এই মর্মে সার্কুলার জারি করায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে লাইটার জাহাজ বানিয়েও পণ্য আনতে বাঁধা পাচ্ছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।

এই অবস্থায় ডব্লিউটিসির ছাড়পত্র ছাড়া লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস না করার আদেশ বাতিল করতে সম্প্রতি নৌপরিবহন অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ) মহাপরিচালক বরাবর পাঠানো ওই চিঠিতে বলছে, ডব্লিউটিসির অদক্ষতা ও উপকূল বাণিজ্যে জ্ঞানের অভাবে তীক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে লাইটার জাহাজের মাস্টারদের উপর ডব্লিটিসির কোনো কতৃত্ব নেই। জ্ঞানের অভাবে গন্তব্যে পণ্য পৌঁছতে সাপ্লাই চেইন বাঁধা পাচ্ছে। বাড়তি ব্যয়ের কারণে স্থানীয় বাজারে পণ্যের বেশি দাম পড়ছে। আমদানিকারকরাও ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বৈদেশিক মুদ্রাও লোকসান গুনতে হচ্ছে। অনিয়মের কারণে ডব্লিউটিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

দেশের বড় ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক বিএসএম গ্র“পের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলছেন, লাইটার জাহাজ বরাদ্দ পেতে ভয়ানক সংকটের সময় বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিলাম। তখন বাধ্য হয়ে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে লাইটার জাহাজ কেনা হয়। এসব জাহাজে নিজেদের পণ্যই পরিবহন করি। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে যা করা হচ্ছে তাতে আমাদের পক্ষে আর পণ্য পরিবহন চালু রাখা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে শংকায় আছি। পদে পদে হয়রানি করা হলে যথাসময়ে নির্ধারিত গন্তব্যে ভোগ্যপণ্য পৌঁছানো সম্ভব হবে না। এতে দেশব্যাপী পণ্য পরিবহনের সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।’ 

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের এক জাহাজ মালিক বলেন, ‘গতকাল কর্ণফুলী নদীর ১৫ নম্বর ঘাটে গিয়ে একদল লোক লাটিসোটা নিয়ে জাহাজ কর্মীদের হুমকি ধামকি দিচ্ছে। জাহাজে উঠে ডব্লিউটিসির ছাড়পত্র চাইছে; গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিনিয়ে নিচ্ছে। এটা হতে পারে না। এটাকে আমি বলবো নৈরাজ্য। সরকার যদি সিদ্ধান্ত নেয় ডব্লিউটিসির সিরিয়ালেই সব ছোট জাহাজ চলবে তাহলে আলোচনার মাধ্যমে সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে।’  

কাধিক জাহাজ মালিক বলছেন, ডব্লিউটিসির শীর্ষ নেতারা জাহাজের সিরিয়াল না মেনে নিজেদের ইচ্ছে অনুযায়ী পণ্য পরিবহন করে। করোনাকালীন সময়ে সাধারন জাহাজ মালিকরা কোন ট্রিপ না পেয়ে অলস বসে থাকলেও নেতারা ঠিকই পণ্য পরিবহন করে আয় করেছেন। কই তখনও তারা তো সিরিয়াল নেননি। আগে নেতাদের জাহাজ সিরিয়ালে আনেন; তারপরই শৃঙ্খলা ফিরবে। 
প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলছেন, পণ্য পরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের প্রয়োজন আছে; কিন্তু নীতিমালা ঠিক করে প্রতিষ্ঠানটি সব স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহনে পরিচালনা করতে হবে। একপক্ষীয়ভাবে ঠিক করা উচিত নয় নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সাথে আমরা শিল্প মালিকরা ইতোমধ্যে বৈঠক করেছি; এতে তিনি বিষয়টির যৌক্তিকতা বুঝতে পেরেছেন। আশা করছি ইতিবাচক কিছু হবে এবং সমাধান আসবে।’

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »




সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: vorerpata24@gmail.com news@dailyvorerpata.com