মঙ্গলবার ● ১১ আগস্ট ২০২০ ● ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭ ● ২০ জিলহজ্জ ১৪৪১
ঝানু প্রতারক আমিনুল এখন ৫০০ কোটি টাকার মালিক!
ভোরের পাতা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২০, ৫:২২ পিএম আপডেট: ৩০.০৬.২০২০ ৫:৪৭ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

ঝানু প্রতারক আমিনুল এখন ৫০০ কোটি টাকার মালিক!

ঝানু প্রতারক আমিনুল এখন ৫০০ কোটি টাকার মালিক!

এরশাদ এসএসসি পাশ করতে পারলেও আমিনুল প্রাইমারি স্কুলের গন্ডি পেরোতে পারেনি। অভাবের তারণায় ঠিকমত যার পেটে ভাত ঝুটতো না, রিকশার গ্যারেজের খুপরি ঘরে গাদাঁগাদি করে ছিলো যার রাত্রিযাপন। সেই আমিনুল আর তাঁর বড় ভাই এরশাদ আলী এখন প্রতারণা আর জালিয়াতি করেই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। রাজশাহীর ঝানু প্রতারক আমিনুল ঢাকায় জালিয়াতির হোতা হিসেবে পরিচিত। কৌশলে ব্যবসার কথা বলে সাধারণ মানুষের টাকা মেরে, ব্যবসায়ীদের পথে বসিয়ে তিনি বিলাসী জীবন যাপন করছেন। ঢাকার ধানমন্ডিতে পরিবার নিয়ে বসবাসের পাশপাশি বিদেশেও পাচার করেছেন কয়েকশত কোটি টাকা। জালিয়াতি করে ব্যবসায়ার টাকা আতœসাত করার অভিযোগে কারাগারে ছিলেন প্রতারক আমিনুল। জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়াকাগজপত্রের মাধ্যমে চারটি ব্যাংকের ২৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগে এরশাদ আলীর বিরূদ্ধে মামলা রয়েছে।
 
এরশাদ অ্যান্ড ব্রাদার্সের চেয়ারম্যান এরশাদ আলী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলামের বিরূদ্ধে জালিয়াতি এবং প্রতারণার বেশচা ল্যকর ঘটনা উঠে এসেছে। এরশাদ ও আমিনুলের ধনি হওয়ার ঘটনা আলাদীনের রূপকাহিনীকেও হার মানায়। যে আমিনুলের পরিবারের অভাব লেগেই থাকতো, তিন বেলা ভাত খেতে পারতেন না। অভাবের কারণে লেখাপড়াও ঠিকমত করতে পারেনি সেই আমিনুল আর এরশাদ এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আমিনুল ইসলাম ও এরশাদ আলী বিদেশে মানবপাচার শুরু করেন। বিদেশে লোক পাঠানোর নামে শতশত মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে প্রায় কোটি টাকার মালিক বনে যান। এরপর শুরু করেন হার্ডওয়্যারের ব্যবসা। সেই ব্যবসার ফাকেঁ বড় ভাই এরশাদ আলীর নামে এরশাদ এন্ড ব্রাদার্স নামে একটি কোম্পানী খুলেন। সেই কোম্পানীর চেয়ারম্যান হন এরশাদ আলী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ নেন আমিনুল ইসলাম। রাজধানীতে একটি অফিস ভাড়া করে চাকচিক্য ডেকোরেশন করে মোটা অংকের জালিয়াতির পরিকল্পনা শুরু করেন। জালিয়াতির মাধ্যমে কিছু ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে আতাত করে একটি ব্যাংক থেকে নিলেন কয়েক কোটি টাকা ঋণ। সেই ঋনের টাকায় দুই ভাই ঢাকা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন স্থানে জমি কিনেন। সেই জমি আবারও অন্য ব্যাংকে ৭ থেকে ৮ গুন বেশি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা ঋণ নেন আমিনুল ও এরশাদ। শুধু এবি ব্যাংক থেকেই এরশাদ অ্যান্ড ব্রাদার্সের নামে ১৫০ কোটি ব্যাংক ঋণ নেয় আমিনুল ও এরশাদ আলী। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচারসহ ঢাকা রাজশাহী, গাজীপুর, সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় প্লট, ফ্ল্যাট, বাড়ি গাড়িসহ শতশত একর জমি কিনেন আমিনুল ও এরশাদ আলী।  ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে চলছে দুর্নীতির ও জালিয়াতির মামলা। শুধু ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতিই নয়- ইট-বালু, পাথর, সাপ্লাই ব্যবসার নামেও বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কোটি টাকা হাতিয়ে নিতে থাকেন আমিনুল ইসলাম। অর্ধশত ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পাথর, সিমেন্টসহ বিভিন্ন উপকরণ বাকিতে নিলেও বছরের পর বছর ঘুরলেও টাকা পরিশোধ না করেই আত্মসাত করেন আমিনুল। এভাবে ঋণের নামে ব্যাংকের প্রতারণা টাকা আর পাথর,ইট-বালু ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা মেরে দিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়তে থাকেন দুই ভাই আমিনুল ও এরশাদ আলী। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যে আমিনুল আর এরশাদ থাকতেন রিকশার গ্যারেজ। আজ তারা থাকেন ঢাকার আলিশান বাড়িতে। জালিয়াতি করে কোটি কোটি মালিক হলেও রাজশাহী নগরীর ভদ্রা এলাকার প্রতারক ও আদম পাচারকারি হিসেবেই পরিচিত। নগরীর ভদ্রা এলাকার মানুষরা এই নামেই তাঁকে বেশি চেনেন। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে অনুসন্ধানে যা ওঠে আসে আমিনুল গংদের প্রতারণা, জালিয়াতি, ঋণখেলাপীসহ নানা ধরনের ভয়ংকর চিত্র। 

রাজশাহী নগরীর ভদ্রা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা হযরত আলী এখনো অবাক হয়ে যান এই আমিনুলদের উত্থানের গল্প বলতে গিয়ে। একদিন রাজশাহী শহরে বাদাম আর রিকশা চালাতো। সেই তারা আলাদিনের চরাগ পাওয়ার মতো অবস্থা। রাজশাহী শহরেই ৩০ বিঘা জমির মালিক। কিভাবে এতো টাকার মালিক বনে গেছেন সেটা প্রথম দিকে না জানলেও প্রতারণা আর জালিয়াতির পাকা মাস্টার এটা এখন মানুষের মুখে মুখে। সাধুর মোড়ের বাসিন্দা আজিজার রহমান বলেন,‘ প্রতারণা করে আর মানুষ ঠকিয়ে এভাবে এতো টাকার মালিক হওয়া যায়, সেটা আমিনুলদের দিকে তাকালেই বুঝা যায়। রাজশাহীর অনৈক মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং ঢাকার মানুষের সঙ্গেও প্রতারণা করে আজ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। নগরীরর ভদ্রা এলাকার মিজানুল ইসলাম আমিনুলের সঙ্গেই চলাচল করতেন। তিনি বলেন,‘ কম লেখাপড়া জানা মানুষ আমিনুল জালিয়াতি করেই আজ বহু সম্পদের মালিক বনে গেছেন। কিন্তু এক সময় তিনবেলা খাবার খেতেও তাদের কষ্ট হতো।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৮০ সালের শুরু দিকে। রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় পদ্মার নদী ভাঙ্গন কবলিত চর নারায়নপুরের আব্দুর রশিদের ৫ পুত্র আমিনুল এরশাদ আলী, খাইরুল আলম ও আমজাদকে নিয়ে আসেন রাজশাহী শহরে। শহরের ভদ্রা এলাকার আব্দুস সাত্তারের বাড়ির দুটি কক্ষ নিয়ে আব্দুর রশিদ পুত্রদের নিয়ে থাকতেন। অভাবের তারণায় বাদাম বিক্রি এবং রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেছেন তারা। কয়েক বছর   এসএসসি পাশ করা এরশাদ নিজেও কখনো কখনো রিকশা চালাতেন আবার কখনো বাদাম বিক্রি করতেন। সেই আব্দুর রশিদের পুত্র আমিনুল ও এরশাদ জালিয়াতি প্রতারণা করে আজ হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। 

অভিযোগ রয়েছে, নিকটাত্মীয় থেকে শুরু করে একের পর এক সাধারণ মানুষকে মালেয়শিয়া নিয়ে যাওয়ার নাম করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাত করতে থাকেন এরশাদ ও আমিনুল। কেউ কেউ যেতে পারেন, আবার অনেকেই টাকা দিয়েও মালেয়শিয়া যেতে ব্যর্থ হন। মালেয়শিয়ায় মানব পাচারের জন্য খুব বেশি দিন থাকতে পারেননি আমিনুল ও এরশাদরা। কয়েক বছর পরেই তাঁরা দেশে ফিরে আসেন। এরপর শুরু করেন রড-সিমেন্টের ব্যবসা। কিছুদিন পরেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই ব্যবসার পাশাপাশি টাইলসের ব্যবসা শুরু করেন। সঙ্গে নগরীর অদূরে বিভিন্ন এলাকায় জমি কিনতে শুরু করেন। 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এরশাদ এ্যান্ড ব্রাদার্স কর্পোরেশন নাম দিয়ে কম মূল্যে জমি কিনে বেশি মূল্য দেখিয়ে একের পর একে ব্যাংক ঋণ নিতে শুরু করেন এই প্রতারক চক্রটি। নগরীর অদূরে রাজশাহী সিটি বাইপাশের পাশে কয়েদিন আগেও অন্তত ৮টি স্থানে ‘এই জমির মালিক এরশাদ এ্যান্ড ব্রাদার্স কর্পোরেশন’ বলে সাইনবোর্ড ঝুলানো ছিল। কিন্তু সম্প্রতি এই সানইবোর্ডগুলো রাতারাতি উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে এখনো নগরীর খড়খড়ি এলাকায় একটি সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। স্থানীয় মুনসুর রহমান বলেন, ‘খড়খড়ি এলাকায় বাইপাশের ধারে অন্তত ৩০ বিঘা জমি কিনে রেখেছে এরশাদ এবং তাঁর ভাইয়েরা। ১৫-২০ লাখ টাকা বিঘা জমি কিনে সেই জমি নাকি বিঘাপ্রতি অন্তত কোটি টাকা মূল্য দেখিয়ে ব্যাংক ঋণ নিয়েছে তাঁরা। তবে কয়েকদিন ধরে তাদের সাইনবোর্ড আর চোখে পড়ছে না।’ 

তবে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পরেই ওইসব সাইনবোর্ডগুলো রাতারাতি তুলে নেয় আমিনুল-এরশাদ গংরা। যেন তাঁদের অবৈধ সম্পদের খোঁজ কেউ না দিতে পারে দুদককে। এদিকে, দুদকের অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে আমিনুল ও এরশাদ গংদের অবৈধ সম্পদের বেশ কিছু তথ্য। রাজশাহী নগরীর ভদ্রায়, রানীনগরে, সাধুরমোড় এলাকায়, রাজশাহী অভিজাত পদ্মা আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে  আমিনুল ও তার ভাইদের নামে-বেনামে কয়েকশত কোটি টাকার সম্পদ। ঢাকার ধানমন্ডি, রাজশাহীর শহরে, উত্তরাসহ বিভিন্ন স্থানে বিলাসবহুল বাড়ি। চলেন কোটি টাকার দামি গাড়িতে। রাজশাহীতে নতুন আরো একটি বহুতল ভবনের নির্মাণের কাজ চলছে। 

এরশাদ এ্যান্ড ব্রাদার্স কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান এরশাদ আলী ও তার ভাই আমিনুল ইসলামের অফিস বাংলামোটরের নাসির ট্রেড সেন্টারের লেভেল-৪ এ। আর এরশাদ-আমিনুল পরিবার নিয়ে বসবাস করেন ধানমন্ডির ৭/এ নিজস্ব বাসায়। রাজশাহী নগরীর বোয়ালিয়া থানার সাধুর মোড়ে রয়েছে আমিনুল ইসলাম ও এরশাদ আলীর বিলাসবহুল বাড়ি। এরশাদ ব্রাদার্স কর্পোরেশনসহ নানা নামে তার রাজশাহীর ভদ্রা, নওদাপাড়া আম চত্ত্বর এলাকায় একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »




আরও সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: vorerpata24@gmail.com news@dailyvorerpata.com