বৃহস্পতিবার ● ২৮ মে ২০২০ ● ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ ● ৪ শওয়াল ১৪৪১
বাক স্বাধীনতা এবং ত্রান স্বাধীনতা
এইচ রহমান মিলু
প্রকাশ: বুধবার, ২০ মে, ২০২০, ৮:৪৪ পিএম আপডেট: ২০.০৫.২০২০ ৯:০৪ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

বাক স্বাধীনতা এবং ত্রান স্বাধীনতা

বাক স্বাধীনতা এবং ত্রান স্বাধীনতা

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল অর্থাৎ বিএনপি এবং তাদের সমমনা ডান, বাম ও বন্ধু দলগুলোর নেতাদের মুখে বিগত ১২ বছর ধরে যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে তা হলো “বাক স্বাধীনতা”।

দেশে বাক স্বাধীনতা নেই এমন বাক ও শুনেছি হররোজ বিভিন্য সভা সমাবেশে। তিন ডজন টেলিভিশনের রোজকার টক শোতে নানা বাক বিতন্ডতায় তারা বলেছেন দেশে বাক স্বাধীনতা নেই। পত্রিকায় যেমন খুশি কলাম লিখে বিএনপি পন্থী বুদ্ধিজীবিরাও একই অভিযোগ করে বলেছেন দেশে বাক স্বাধীনতা নেই। 

এতো অনায়াসে ও আরামসে যখন বলতেই পারছেন সব জায়গায়, সব মাধ্যমে, তাহলে বাক স্বাধীনতা নেই কেমন করে ? কোথায় গেলো এই মশাই ? 

যেহেতু দেশের গনতন্ত্রের গলা চেপে, সামরিক উর্দি গায়ে গরিবের আব্রাহাম লিংকন, জনাব জিয়াউর রহমান এদেশে ধানের সহিত তাহার আদর্শের বহুদলীয় গনতন্ত্র চাষ করেছিলেন, তাই তেনাদের সাত খুন মাফ বৈকি। যেহেতু তেনার সামরিক ফরমানের মধ্যেও এই বঙ্গীয় দেশে অনেক জ্ঞানী গুনী স্ফটিক স্বচ্ছ গনতন্ত্র খুঁজে পান, তাই তার দলের নেতাদের যে কোন বক্তব্য মেনে নিতে হবে বৈকি।

যেমনটি, এক ছেলে অসূস্থ্য হয়ে মূর্ছা গেলে তার বাবা দৌড়ে ডাক্তার আনলেন। ডাক্তার বেজায় পরিক্ষা নিরিক্ষা করে জ্ঞানগর্ভ মেজাজে বললেন আপনার ছেলে মারা গেছে। জ্ঞান ফেরাতে ছেলেটি লাফ দিয়ে বললো “বাবা আমি মরিনি” গনতন্ত্রের জনক জিয়াউর রহমান সাহেবের অন্ধ ভক্ত পিতা বললেন “চুপ থাক গাধার বাচ্চা, তুই বেশি জানিস নাকি ডাক্তার সাহেব”

অনেকে পড়ছেন আর ভাবছেন হয়তো এই করোনা কালে কেন এসব পুরনো কাসুন্দি ঘাটছি। আমি আসলে এই বিষয়ে লিখতে আজ বসিনি। তবে মিল আছে বলে এবং অনেকটা প্রারম্ভিক বলে একটা বিষয় আছে ওটা করতেই এই টুকু লিখেছি। আশা করি গরীব দেশের আব্রাহাম লিংকনের বিদেহী আত্মা এতে রুষ্ঠ হবেন না।

দু মাস ধরে করোনা প্রাদুর্ভাবের কারনে বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের মানুষদের মাঝে সরকার এবং নানা সংগঠন এবং ব্যাক্তি পর্যায়ে ত্রান বিতরন চলছে। এই দুঃসময়ে দেশের স্বচ্ছল মানুষের একটি বড় অংশ নিজ আগ্রহেই অসহায় মানুষদের খুঁজে খুঁজে সামর্থ অনুযায়ী ত্রান সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।

টেলিভিশন, পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে আমরা ত্রান বিতরন করা শত শত প্রতিষ্ঠান ও ব্যাক্তিদের সংবাদ দেখেছি, তাদের কর্মকান্ড সম্পর্কে জেনেছি। তাদের এই কাজ দেখে অনেকেই উৎসাহী হয়ে নিজেরাও ত্রান কাজে নেমে পড়েছে।

কম বেশি অনেকের ত্রান বিতরনের ছবি ও সংবাদ পেলেও বাংলাদেশের গনতন্ত্রের বীজ বপনকারী দল বিএনপি, পাকিস্তানের বিছড়ে হুয়া সন্তান জামাত এবং কথায় কথায় তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করে মাইরি টাইপের বিবৃতি দেওয়া বাম দলের তেমন কোন ত্রান কার্যের ছবি ও সংবাদ কোনটাই এই দুই মাসে আমাদের তৃষিত নয়নে ধরা পড়েনি।

অবশ্য এতে অবাক হইনি এবং মাথা ব্যাথাও ছিলোনা আমার। কিন্তু, গতকাল বিএনপি মহাসচিব প্রাচ্যের গোয়েবলস জনাব মির্জা ফখরুল যখন জানালেন যে তার দল এযাবৎ ৩১ লাখ পরিবারকে ত্রান সহযোগিতা করেছে, তা শুনে মগজে ঠাডা পড়ার মতো তব্দা লেগে গেলো।

হঠাৎ মনে পড়লো, বাক স্বাধীনতা নেই তো গেলো কোই ? একই ভাবে ৩১ লাখ পরিবারকে দেওয়া ত্রান ও পরিবারগুলো গেলো কোই ? 

যে যুগে দুই কেজি চাল দানের জন্য পাঁচজন মিলে ব্যাগ ধরে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিয়ে দেয়, সেই যুগে ৩১ লাখ পরিবারকে দেওয়া ত্রানের ছবি তো চন্দ্র পিষ্ঠে লেমিনেট করে সাটিয়ে দেবার কথা। যাতে করে গোটা দুনিয়ার লোকজন দেখতে ও জানতে পারে। 

এই তো সেদিন, আমার স্পস্ট মনে আছে। রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রান দিতে যাবেন বিএনপি নেত্রী, ঢাকা থেকে সড়কপথে গেলেন বিশাল বহর নিয়ে। কারনটা কি ? কারন হলো যতক্ষন এই বহর টেকনাফে না পৌছাবে, ততক্ষন পর্যন্ত সংবাদে থাকবে। মানুষ জন জানতে পারবে বিশ্ব মানবতার আখরি চেরাগ বেগম সাহেবা ত্রান নিয়ে মানবতার সেবায় আসছেন। 

একেক জেলার কোন এক পয়েন্টে এলেই লাইভ সংবাদে জনৈক টেলিভিশন রিপোর্টার ঘেমে নেয়ে কয়েক ডজন কনুই এর গুতো হজম করে বলে যাচ্ছেন “আপনারা দেখতে পাচ্ছেন ত্রানের গাড়ি বহরটি এখন এখানে এসে পৌঁছেছে, আপনার দেখতে পাচ্ছেন ..!!!!

ব্যাপক মিডিয়া সিকার এই দলটি গোপনে ৩১ লাখ পরিবারের বাসায় গিয়ে রাতের অন্ধকারে দরজায় ফুলের টোকা দিয়ে দরজার গোড়ায় ত্রান সামগ্রী রেখে লুকিয়ে চলে আসবে ? এই ৯বম আশ্চর্য আপনারা গিললেও, আমি মুখেও তুলতে পারছিনা।

গরীব ও অশিক্ষিতের দেশ ছিলো বিধায় সামরিক উর্দির জিয়াউর রহমান সাহেব অনেক প্রহসন করে পার পেয়েছেন হয়তো, কিন্তু আজ আর কেউ ডাক্তার সাহেব মৃত ঘোষনা করলেই চোখ বন্ধ করে জিবীত সন্তানকে মৃত ধরে নেয়না।
আজ সবাই পরিক্ষা করে, সত্য মিথ্যা যাচাই করে, তারপর বিশ্বাস করে।

জনাব ফখরুল সাহেব, সরকার যেমন কে কোন দলের সমর্থক, তা দেখে ত্রান দিচ্ছেনা, আওয়ামীলীগ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসা দল ও সংগঠন যেমন কোন ধর্ম, বর্ন, দল যাচাই করে ত্রান দিচ্ছেনা, তেমনি আপনারাও দয়া করে কোন ধাপ্পাবাজী করে ত্রানের নামে প্রহসন করবেন না। সত্যি যদি ৩১ পরিবারকে মন থেকে সাহায্য করতে দিয়ে থাকেন তবে তাই বলুন, আপনাদের এই ৩১ ব্যাগ ত্রান আপনার মিথ্যা ৩১ লাখের চেয়েও অধিক সন্মান বয়ে আনবে। তবুও প্লিজ, এই দুর্যোগের সময় এহেন অমানবিক মিথ্যাচার থেকে বিরত থাকুন। 

দূর্যোগ কেটে গেলে “দেশে বাক স্বাধীনতা নেই” সেই মিথ্যাচার না হয় আবারও করবেন।

এইচ রহমান মিলুলেখক ও সমাজকর্মী

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »




সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]