বৃহস্পতিবার ● ২৮ মে ২০২০ ● ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ ● ৪ শওয়াল ১৪৪১
দুর্নীতি-অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতা: এক চেয়ারম্যানের কাহিনি
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ১১ মে, ২০২০, ৯:০৮ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

দুর্নীতি-অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতা: এক চেয়ারম্যানের কাহিনি

দুর্নীতি-অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতা: এক চেয়ারম্যানের কাহিনি

নিয়ম ভেঙে উৎকোচের বিনিময়ে খেয়াঘাট ইজারা দিয়েছিলেন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্ত করে সেই ঘাটের ইজারা বাতিল করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। খাস কালেকশনের জন্য ঘাটটি নতুন করে একজনের দায়িত্বে দেওয়া হয়। তিনি একজন মাঝিও নিয়োগ করেন ঘাটে যাত্রী পারাপারে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ইউপি চেয়ারম্যান মাঝিকে মারধর করেন। হুমকি দেন ঘাটের পারাপার বন্ধ করে দিতে। সমালোচিত এই ঘটনাটি ঘটিয়েছেন ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইনামুল হাসান। 

তার বিরুদ্ধে এর আগেও অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, প্রবীণদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়েও কটুক্তি ও ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করে মামলার আসামি হয়েছেন তিনি। যৌতুক না পেয়ে স্ত্রীকে নির্যাতন, মামলার আসামি অতঃপর দায় মিটিয়ে বিয়ে বিচ্ছেদও ঘটিয়েছেন নানা সময়ে বিতর্কিত এই ইউপি চেয়ারম্যান। এছাড়া মহল্লাদার বা চৌকিদারের চাকরি স্থায়ী করার আশ্বাস দিয়ে উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।  
গত ২৭ এপ্রিল গোপালপুর বাজার লাগোয়া খেয়াঘাট এলাকায় মাঝিকে মারধর করে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন ইনামুল হাসান। ঘটনাটি স্থানীয় সরকার প্রশাসনের নজরে এসেছে। তারা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছেন বলে জানা গেছে। 

জানতে আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাশেদুর রহমান বলেন, ‘গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অন্যায়ভাবে খেয়াঘাটে নিয়োজিত মাঝিকে মেরেছেন বলে অভিযোগ পাই। পরে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে খবর নিয়েছি। ঘটনা সত্যি।’ বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য তদন্ত চলছে বলেও জানান তিনি।

মারধরের ওই ঘটনায় মাঝি ওবায়দুর রহমান গত ৩০ এপ্রিল চেয়ারম্যান ইনামুল হাসানের বিরুদ্ধে আলফাডাঙ্গা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। ডায়েরি নম্বর-১১৬৮। 

স্থানীয় একাধিক সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা সোহরাব শেখের ছেলে রবিউলকে এক বছরের জন্য গোপালপুর ও দিগনগর ঘাট ইজারা দেন। এজন্য রবিউলের কাছ থেকে প্রতিঘাট বাবদ ৭৫ হাজার টাকা করে দেড় লাখ টাকা চুক্তি করেন। যার মধ্যে ৮০ হাজার টাকা রবিউল এরই মধ্যে পরিশোধ করেছে। কিন্তু চেয়ারম্যান ইনামুল হাসান দুই ঘাটের ইজারা বাবদ সরকারি রাজস্ব দেখিয়েছেন ৪০ হাজার টাকা। 

নিয়ম ভেঙে উৎকোচ বিনিময়ে ঘাট বরাদ্দের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে অভিযোগ করে সংক্ষুব্ধরা। পরে ইউএনও ঘটনার সত্যতা পেলে রবিউলের অনুকূলে ইজারা বাতিল করে ঘাটটি ফের দরপত্র হওয়ার আগ পর্যন্ত খাস কালেকশনে দেন। এ দায়িত্ব পান স্থানীয় উজ্জল শেখ। তিনি মাঝি ওবায়দুর  রহমানকে গোপালপুর ঘাটে যাত্রী পারাপারের কাজে নিয়োজিত করেন। 

ওবায়দুর রহমান ইনামুল হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেন, অবৈধভাবে গোপালপুর খেয়াঘাট বিক্রি করেন ইনামুল হাসান। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তদন্ত করে ঘাটের ইজারা বাতিল করে এবং চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন। পরে ইউএনও ঘাটের খাস কালেকশনের জন্য গোপালপুর গ্রামের স্থানীয় উজ্জল শেখকে মৌখিকভাবে অনুমতি দেন। এতে ইউএনওর ওপর ইনামুল হাসান ক্ষিপ্ত হন। 

ভুক্তভোগী ওবায়দুর রহমান অভিযোগ উল্লেখ করেন, গত ২৭ এপ্রিল দুপুর দুটোর দিকে গোপালপুর ঘাটে যান চেয়ারম্যান। সেখানে গিয়ে মাঝি ওবায়দুর রহমানকে ডাকেন। মাঝি তার কাছে এলে গালিগালাজ করে এবং তাকে যাত্রী পারাপার করতে নিষেধ করে। 
পরে ওবায়দুর রহমান বলেন, আমি উজ্জল শেখের প্রতিনিধি হিসেবে যাত্রী পারাপার করছি। এক পর্যায়ে চেয়ারম্যান ইনামুল হাসান ওবায়দুর রহমানকে এলোপাথারি কিল, ঘুষি ও লাথি মারে। বলেন, আমি এই ঘাট যাকে বাইতে দিয়েছি সেই বাইবে ইউএনও কে? আমি এই ইউনিয়নে যা বলবো তাই হবে। 

এর আগেও বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি, দুর্ব্যবহার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে বিতর্কিত হয়েছেন গোপালপুর ইউপির চেয়ারম্যান ইনামুল হাসান। 

বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটুক্তি এবং ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করার অভিযোগ আছে ইনামুল হাসানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মানহানির মামলাও হয়েছে। পিটিশন মামলা নং-২৮/২০২০

এছাড়া  দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রবীণদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগে গত ৩১ জানুয়ারি গোপালপুর বাজারে ইনামুল হাসানের বিরুদ্ধে ঝাড়ু মিছিল ও বিক্ষোভ দেখিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ। 

সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েও বিতর্কিত হয়েছেন গোপালপুর ইউপি চেয়ারম্যান। গত ২৫ জানুয়ারি রাতের ওই ঘটনায় পরদিন আলফাডাঙ্গা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন সাংবাদিক মুজাহিদুল ইসলাম। সাধারণ ডায়েরি নং-১০৬৫ 
এর আগে যৌতুক না পেয়ে স্ত্রীকে নির্যাতনের ঘটনায় ২০১৯ সালের ১০ অক্টোবর গোপালগঞ্জ জেলার সহকারী জজ ও পারিবারিক আদালতে একাধিক মামলাও হয়েছিল ইনামুল হাসানের বিরুদ্ধে। পরে দেনমোহর পরিশোধ করে স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদও ঘটান তিনি।  
ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় মহল্লাদার বা চৌকিদার নিয়োগ স্থায়ী করার নামে উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ আছে চেয়ারম্যান ইনামুল হাসানের বিরুদ্ধে। ইউনিয়নের বাজড়া গ্রামের এক নারী গত ৫ মে এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। যেখানে তিনি লিখেছেন, মহল্লাদার বা চৌকিদার পদে তার চাকরি স্থায়ী করার কথা বলে ইনামুল হাসান তার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা নিয়েছেন। অথচ তার চাকরি স্থায়ী করা হয়নি। এছাড়া বিভিন্ন সময় তাকে কু-প্রস্তাব দেওয়া ও অশালীন আচরণের অভিযোগও এনেছেন ওই নারী। 

গৃহহীনদের জন্য সরকারের বিনামূল্যে বরাদ্দকৃত ঘর বিতরণে মোটা অংকের টাকা লেনদেনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। সেই সঙ্গে বয়স্কভাতা, বিধবাভাতা, শিশু কার্ড বিতরণে আর্থিক লেনদেন এবং বরাদ্দের চাল আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের ঘরে জুয়ার আসর ভাড়া দেওয়ার অভিযোগও ফরিদপুর জেলার স্থানীয় সরকার বিভাগে তদন্তনাধীন। 

ইউপি চেয়ারম্যান ইনামুলের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ আছে জানিয়ে ইউএনও রাশেদুর রহমান বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্ব্যবহারের অনেক অভিযোগ আছে। অনেককিছু আমরা তদন্ত করে দেখছি। কোনো অনিয়ম-দুর্নীতিকারী বা স্বেচ্ছাচারিতা করে কেউ পার পাবে না। পার পাওয়ার সুযোগ নেই।’ 

জানতে চাইলে ফরিদপুর জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, ‘আমরা সব সময় অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে। সব অভিযোগ খতিয়ে দেখবো।’

এ ব্যাপারে ফরিদপুর জেলার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মো.মনিরুজ্জামান বলেন, ‘যেকোনো অভিযোগ পেলে আমরা তা তদন্ত করে দেখি। তদন্ত অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

খেয়াঘাটের ইজারা নিয়ে যে অনিয়ম:
খেয়া ঘাটের ইজারাতে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে? জানতে চাইলে আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন,  ‘গোপালপুর ও দিগনগর ঘাট ইজারার বিষয়টি নিয়ে এতদিন আইনলঙ্ঘন চলছিল। কারণ ইউনিয়ন পরিষদ চাইলে ওই ঘাট ইজারা দিতে পারে না।’  

রাশেদুর রহমান বলেন, ‘গোপালপুর ও দিগনগর ঘাট দুটো আন্তঃবিভাগীয় ঘাট। এটি ইউনিয়ন পরিষদ চাইলেই ইজারা দিতে পারে না। প্রতিটি ঘাটের ইজারা মূল্য ১০ হাজার টাকা হলে ইউনিয়ন পরিষদ তা বরাদ্দ দিতে পারতো। কিন্তু তারা দুটো ঘাটের ইজারা মূল্য দেখিয়েছে ২০ হাজার করে ৪০ হাজার।  তার মানে তারা এটা দিতে পারেন না। এতদিন নিয়ম বহির্ভূতভাবে এটা চলছিল। আমি তা জানার পর বন্ধ করেছি।’

ইউএনও বলেন, ‘শোনা যায় এই ৪০ হাজারের বাইরেও টাকা লেনদেন হয়েছে। বাকি টাকা তারা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ আছে। তাছাড়া ঘাট দেখলেও তো অনুমান করা যায়, মূল্য কেমন হতে পারে। সবমিলিয়ে তারা এই ঘাট ইজারা দিতে পারেন না। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম চলছে।’ 
তিনি জানান, এই অনিয়মের সঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যান ইনামুল হাসানসহ তার অনুসারী কয়েকজন ইউপি সদস্যও জড়িত আছেন। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। 
নতুন করে ঘাটের ইজারা উপজেলা প্রশাসন থেকে দেওয়া হবে জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, জেলা প্রশাসক স্যারের কাছে বিস্তারিত লিখে অনুমতি চাইবো। অনুমতি পেলে দরপত্রের মাধ্যমে ঘাট ইজারা দেওয়া হবে।  আপাতত সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা তার দায়িত্বে খাস কালেকশন করবে। যেভাবে হোক রাজস্ব আদায় করবেন।
জানতে চাইলে আলফাডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ রেজাউল করিম বলেন, ‘মাঝিকে মারপিটের বিষয়ে আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »




আরও সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]