সোমবার ● ২৫ মে ২০২০ ● ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ ● ১ শওয়াল ১৪৪১
এ সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়!
অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল
প্রকাশ: শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২০, ১০:৩১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

এ সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়!

এ সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়!

টানা দশ দিনের ছুটির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। এখন পর্যন্ত যা সিদ্ধান্ত তাতে আগামী ৫ এপ্রিল থেকে কাজে ফিরবে সবাই। প্রশ্নটা দাঁড়াচ্ছে এটা ঠিক হবে, না হবে না। পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি আছে অনেক। যারা খুলে দেয়ার পক্ষে তাদের যুক্তি, এই ছুটি খুব বেশিদিন টেনে নিয়ে গেলে তাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুর্দশা বাড়বে। নিম্ন আয়ের যে মানুষ আছেন, যে ফলওয়ালা ফালি ফালি করে কাটা পেয়ারাগুলো বিক্রি করেন এক ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে আরেক সিগন্যালে কিংবা বঙ্গবন্ধুর সামনের ফুটপাথের পান-বিড়িওয়ালা, ল্যাবএইডের সামনের বাদামওয়ালা অথবা ঢাকার লাখো রিক্সাচালক – কি হবে তাদের? অনেকে এমনটাও যুক্তি দেন, এক ঈদের ছুটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় যে ক’জন মানুষ প্রতিবছর মৃত্যুবরণ করেন সে তুলনায় তো কিছুই ঘটেনি কোভিড-১৯-এ। এই সেদিনও তো চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১০ জনের বেশি মানুষ, আর কোভিড-১৯-এ এখনও ৫। তাহলে কি আমরা ঈদে দেশে যাওয়া বন্ধ করে দিব? কথায় যুক্তি আছে নিশ্চয়ই। আতঙ্ক কিংবা আবেগ, এ দুইয়ের কোনটার বশবর্তী হয়েই সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এটা না। এই দু’ক্ষেত্রেই মানুষের ভুল হয় বেশি। সিদ্ধান্ত নিতে হবে বুঝে-শুনে পরিস্থিতি যৌক্তিকভাবে বিচারবিশ্লেষণ করেই।

বাংলাদেশে এই যে ছুটি, এর শুরু গত ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস থেকে। মিডিয়া আর সামাজিক যোগাযোগ মাধমের কল্যাণে এ কথা এখন সবারই জানা যে এ সময় যারা নোভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হবেন তাদের ইনকিউবিশন পিরিয়ড শেষ হবে ১৪ দিন পর। অর্থাৎ এপ্রিলের ৯ তারিখে। এসব রোগীদের লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে ৯ এপ্রিলের পর। ধরে নেয়া যায় ৯ এপ্রিলের পর কিছু কোভিড-১৯ রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হবেন। ৯-এর সঙ্গে ২ যোগ করলে সংখ্যাটা দাঁড়াচ্ছে ১১। সরকার চলমান ছুটিকে বাড়িয়ে ১১ পর্যন্ত নিয়ে গেছেন। পাটীগণিতে খুব বেশি পারদর্শী না হলেও, আমার সাধারণ যুক্তি আমাকে বলছে।’ আমরা যদি এপ্রিলের ১১ তারিখ পর্যন্ত ঘরে থাকতে পারি তাহলে বোধ করি আরও সহজে এ ধাক্কাটা কাটিয়ে ওঠা যায়। আর প্রধানমন্ত্রী তো বলেছেন প্রয়োজনে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সীমিত পরিসরে এ ছুটি বাড়ানো যেতেও পারে।

প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে ১৪ দিনের ইনকিউবিশন পিরিয়ড শেষে আমরা কি ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারি সে সম্বন্ধে আগাম ভবিষ্যতবাণী করাটা সম্ভব কিনা? ম্যাথামেটিক্যাল মডেল ব্যবহার করে এ ধরনের প্রেডিকশন দেয়া যেতেই পারে। বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি’র গতিপ্রকৃতি সামনে কেমন হতে যাচ্ছে, ম্যাথামেটিক্যাল মডেলের মাধ্যমে তার ওপর একটা বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ আমি নিজেই ক’দিন আগে একটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশ করেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আমি জানি যে, এই ধরনের ম্যাথামেটিক্যাল মডেলগগুলোর প্রেডিকশন সবসময় নির্ভুল হয় না। আর অতশত বোঝার দরকারটাই বা কি? এই যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তারা কি আজ থেকে দু’সপ্তাহ আগেও আজকের দিনটা সম্বন্ধে ধারণা করতে পেরেছিল?

কাজেই আমি অত জটিল মডেলে যাব না। আমি ফিরে যাব যুক্তির কাছে। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ঘেটে আমি দেখতে পাচ্ছি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করায় আমার সরকার উদ্যোগ নিয়েছে সবার আগে। নিজ দেশে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হওয়ার পর ভারত লকডাউনে গেছে ৫২তম দিনে, ফ্রান্স ৫৩তম আর অস্ট্রেলিয়া ৫৪তম দিনে। আমেরিকা আর জাপান তো এখনও লকডাউন করেইনি। সেখানে আমরা এই কাজটি করেছি ৮ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো ৩ জন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হওয়ার ১৮ দিনের মাথায় ২৬ মার্চ। আর স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি দেয়া হয়েছে তারও ঢের আগে ১৭ মার্চ থেকে। এমনকি এত প্রত্যাশিত আর প্রতীক্ষিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন, তার সব আয়োজনও কমিয়ে আনা হয়েছিল ন্যূনতমতে। অতএব আমাদের যথেষ্ট কারণ ছিল নাকে সর্ষের তেল দিয়ে ঘুমানোর।

কিন্তু কার্যত তা সম্ভব নয়। কারণ আমরা এ সময়ে বেশ কয়েকটি অপরাধও করে ফেলেছি। ইতালি আর অন্যান্য দেশ থেকে যেসব প্রবাসী দেশে ফিরেছেন তারা হোম কোয়ারেন্টাইনের তোয়াক্কা করেছেন থোরাই। ঘুরে বেড়িয়েছেন, সামাজিকতা করেছেন, এমনকি বসেছেন বিয়ের পিঁড়িতেও! আর আমরা যারা দেশে ছিলাম তারাই বা কম গেলাম কোথায়? ৩০ হাজার লোকের দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হলো লক্ষ্মীপুরে। করোনার বাধ্যবাধকতায় যে ছুটি, তাকে ঈদের ছুটি বানিয়ে ৯০ লাখ লোক ছেড়ে গেল ঢাকা। আর যাদের মুখে সারাদিন প্রেসক্লাবে আর নয়াপল্টনে শুনতাম বড়-বড় কথা, সরকারের এই ভুল, সেই ভুল ধরতে যাদের মুখে এতদিন ফেনা উঠছিল, দলীয় নেত্রীর অপ্রত্যাশিত মুক্তিতে তারাই লকডাউন ঢাকায় আইন ভঙ্গের যে মচ্ছব বসালেন। তার প্রায়শ্চিত্তও তো আমাদের একটু-আধটু হলেও করতে হবে। কাজটা কিন্তু খুব কঠিন না। কাজটা হলো আগামী ক’টা দিন নিষ্ঠার সঙ্গে সামাজিক বিচ্ছিন্নতাটা নিশ্চিত করা। সবকিছু গেল-গেল, আমেরিকা পারেনি, পারেনি ইতালি, আমরা কোন্ ছাড়- এসব ভেবে হাল ছেড়ে দেয়ার কোন কারণ ঘটেনি। শুধু ঘরে থাকুন। ঘরে থাকলেই ভাল থাকবেন – ভাল রাখবেন।

¯্রষ্টা না করুন, যদি কোন কারণে পরিস্থিতি এতটুকুও খারাপ হয়, সবার আগে বিপদে পড়বে কিন্তু আপনার-আমার ভালবাসার মানুষগুলো। আর বিপদে পড়বেন ঐ প্রান্তিক মানুষগুলো। কারণ তাদের স্বাস্থ্য ঝুকি যেমন বেশী, তেমনি উদ্ভুত কোন পরিস্থিতির কারণে ছুটি যদি আরো অনেক লম্বা করতে হয়,তাতে তাদের পেটেও আঘাত পড়বে সবার আগে। আর ছুটি যদি আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত নেয়া হয়, তাতেও তাদের কষ্ট আরো দু’সপ্তাহ বাড়বে ঠিকই, কিন্তু সম্ভবত এর বেশী আর হয়ত না।

আর এই সময়টায় তাদের দেখভালের দায়িত্বতো নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ৬ মাসের খাদ্য সহায়তার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। রফতানিমুখী গার্মেন্টসের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাবদ ৫০০০ কোটি টাকা প্রদান করতে যাচ্ছে তার সরকার। পাশাপাশি এগিয়ে আসছে আওয়ামী লীগ আর তার নেতাকর্মীরা। এগিয়ে আসছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মতো নাগরিক আন্দোলনগুলোও। জনপ্রতিনিধিদেরও আমরা মাঠে দেখছি। দেখছি যেমন ঢাকা উত্তরের নবনির্বাচিত মেয়র আতিকুল ইসলামকে, মাঠে তেমনি আছেন অন্যরাও। কাজেই এ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে আপনার-আমার বরং উচিত হবে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী এ ধরনের মহতী উদ্যোগগুলোয় শরিক হওয়া।

আর একটি কাজ খুবই জরুরী। যে যারা কখনও বিজ্ঞান আর কখনও বা ধর্মের দোহাই দিয়ে বিভ্রান্তি আর গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের একদমই সুযোগ দেয়া যাবে না। এরা যে শুধু বাংলাদেশেই আছে তা-না, এমনি সুযোগসন্ধানী ছড়িয়ে আছে দেশে-দেশে। অস্ট্রেলিয়া সরকার তার নাগরিকদের সঠিক তথ্য জানাবার জন্য তৈরি করেছে এ্যাপস, যাতে করে অস্ট্র্রেলিয়রা গুজবে আর বিভ্রান্ত না হয়। আর ব্রিটিশ সরকার তো এ ধরনের গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে এদেশে গুজব ছড়াচ্ছে বাংলাদেশ সরকারও তাদের আইনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে আমরা জানতে পারছি।

অতএব আপনার-আমার দায়িত্বটা এখন খুবই পরিষ্কার। পরিস্থিতি বুঝে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। প্রয়োজনে ছুটি বাড়াবে। ঘরে বসে দেশ রক্ষায় যে বিরল সুযোগ আমরা এবার পেয়েছি, আমাদের তা হাতছাড়া করলে চলবে না কোনভাবেই। আমাদের প্রমাণ করতে হবে এখন যদি আরেকবার মুক্তিযুদ্ধ হতো, তবে আমরা সবাই সে যুদ্ধে যোগ দিতাম। আর এটা করা সম্ভব শুধু আগামী ক’টা দিন ঘরে থেকে।

লেখক: চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »




সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]