সোমবার ● ২৫ মে ২০২০ ● ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ ● ১ শওয়াল ১৪৪১
গৃহবন্দী রাষ্ট্রনায়করা কি এখন যুদ্ধ না চিকিৎসায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেবেন
পীর হাবিবুর রহমান
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২০, ১:১৮ এএম | অনলাইন সংস্করণ

গৃহবন্দী রাষ্ট্রনায়করা কি এখন যুদ্ধ না চিকিৎসায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেবেন

গৃহবন্দী রাষ্ট্রনায়করা কি এখন যুদ্ধ না চিকিৎসায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেবেন

পৃথিবীর মুখ মনে হয় কত দিন দেখি না! করোনার অভিশাপে আজ নিথর নিস্তব্ধ পৃথিবীই যেন অভিশপ্ত। কেবল মৃত্যুশোক অশ্রু ভয় আর বাঁচার আর্তনাদ। কত হাজার বছর দেখি না যেন প্রিয় স্বদেশের মুখ। প্রিয়জনের চাঁদমুখ ঢেকে আছে অমাবস্যার আঁধারে- দেখা হয় না তাও অনন্তকাল! মনে হয় ভুলে গেছি প্রিয় শহর ও নগরের চেনা সব পথ! কেমন আছে সকল প্রিয়জন? বন্ধুবান্ধব, আপনজনরা?

সবাই সবার কথা ভুলে গেছি যেন।

ভুলে গেছি মনের টান, আবেগ-অনুভূতি। ভালোবাসাময় পরিবার, সমাজ! একেক আড্ডার প্রাণবন্ত আসর বসে না বোধহীন আতঙ্কগ্রস্ত পৃথিবীতে। ধূসর হয়েছে আসরের সব মুখ! প্রিয়জনকে দেখার জন্য সে কি আকুতি ছটফটে, অস্থির, চঞ্চল মন আজ নেই বরং নির্বাক উত্তেজনাহীন বড়ই স্থবির। মর্মান্তিক মানব-মানবীর করুণ পরিণতি কেবল খবর হয়ে স্ক্রল হচ্ছে। পৃথিবীই ল-ভ- হয়নি, মনোজগৎ কি ভয়ঙ্করভাবে বদলে গেছে! ক্লান্ত-শ্রান্ত কর্মমুখর মানুষও এমন ছুটি চায়নি। সাহারা মরুভূমির হাহাকারও ভুলে গেছে সবাই। এই সময়ের চেয়ে আর কখনো মন এমন খরাকবলিত হয়নি। এমন করে আর্তনাদও করে ওঠেনি প্রাণের পৃথিবী!
কত দিন বুকভরে শ্বাস নেয়নি মানুষ! কত দিন স্পর্শ করেনি বৃষ্টির ফোঁটা। জোছনায় ভিজে ঘরে ফেরার আকুতি মরে গেল কেমন করে! অফিসে যাওয়ার টান নেই, ঘরে ফেরার তাড়া নেই, কেবল বিষাদ আর বিষাদ। গোটা পৃথিবীর সুর থেমে গেছে। নবদম্পতিরা হানিমুন বাতিল করেছে, প্রেমিকযুগল উষ্ণ আলিঙ্গন হারিয়ে ফেলেছে। কোথাও বসে না গানের আসর, পাঠ হয় না কবিতা! কি প্রেমের, কি দ্রোহের! ভায়োলিন বাজে না, তানপুরায় ধুলোবালি, বাঁশিতে নেই সুর। সিনেমা গানে সুপারস্টারে কোনোই আকর্ষণ নেই। রোমান্স দৃশ্য দেখে প্রেমিকযুগল গভীর চুম্বনে আজ সিক্ত হতে চায় না! পৃথিবীজোড়া সব গান সব আনন্দ সব আবেগ প্রেম কোলাহল হৈচৈ আমোদ, আনন্দ আড্ডা থেমে গেছে। শিশুরাই কেবল নির্মল হাসে আর বাকিদের কেবল একটাই ভীতি, একটাই আতঙ্ক, একটাই দুঃস্বপ্ন- করোনা!

করোনার অভিশাপ থেকে মুক্তির কোনো পথ এখনো পৃথিবীর কোনো শক্তিই বের করতে পারেনি। ছোটবেলায় শোনা রূপকথার মতো দৈত্যের প্রাণটাও সাগরতলে বাক্সের ভিতর আছে জেনেছিল। কিন্তু তামাম দুনিয়ার এত এত বই পড়া আর গবেষণাগারে কাটিয়ে দেওয়া বিজ্ঞানীরা জানেন না করোনাকে মারার ওষুধ বা রুখবার ভ্যাকসিন কোথায়?

কি প্রতাপশালী রাষ্ট্র আমেরিকা! গণতন্ত্রের মহিমায় কতই না উজ্জ্বল ছিল উন্নয়নের প্রতীক হয়ে সুনাম ছড়িয়ে। পৃথিবী কতই না সমীহ করে, কিছু হলেই ছুটে যায় চিকিৎসা নিতে! আজ করোনায় আক্রান্তের শীর্ষে থাকা দেশের রাষ্ট্রপতি লড়ছেন অসহায়ভাবে। ব্রিটেন একসময় পৃথিবীই শাসন করেছিল! সভ্যতা ও গণতন্ত্রের পথপ্রদর্শক রাষ্ট্রটি তছনছ হয়ে যাচ্ছে। রাজপুত্র মুক্ত হলেও প্রধানমন্ত্রী আক্রান্ত! বাতাস ভারী লাশে লাশে! চীনের গণতন্ত্রহরণের একদলীয় শাসনে অর্থ আর অস্ত্রের দাপটও নিষ্ফল! ইতালিতে আজ মৃতের পাহাড়, স্পেনে লাশের মিছিল, ফ্রান্সের চিত্রকর্ম লুটিয়ে পড়েছে মরণযন্ত্রণায়! ভারতে মুখ থুবড়ে পড়েছে হিন্দুত্ববাদের স্লোগান, গোমূত্র ভেসে গেছে আক্রান্ত ও মৃতের খবরে! প্রিয় স্বদেশে ব্যাংক লুটেরা দুর্নীতিবাজরা গা-ঢাকা দিয়েছে! আমরা জানি না পরিণতি কোথায়, আজাবের আলামত উপমহাদেশে শুরু!

লকডাউনে অসহায় পৃথিবীর সব দম্ভের পতন ঘটেছে। দুনিয়াজুড়ে এখন চিকিৎসাবিহীন মৃত্যুর মিছিল! নাস্তিকরাও ভয়ে এখন সৃষ্টিকর্তার অসীম করুণা খুঁজতে ব্যস্ত। ধর্মান্ধরাও দেখছে ধর্মের নামে মানুষ হত্যা যত সহজ, ছোট্ট এক জীবাণুর মুখে বেঁচে থাকা দায়। যে সৌদি বাদশাহ কথায় কথায় ধর্মের নামে শিরন্ডেদ দিতেন, আজ লকডাউনে ফেলেছেন পবিত্র নগরী, কাবাঘর থেকে মসজিদ বন্ধ করেছেন জানের ভয়ে। গির্জায়, মন্দিরে ঝোলে তালা! চিকিৎসক, ধর্মযাজক, ইমাম, রাষ্ট্রনায়ক থেকে রাজকন্যারা প্রাণ হারাচ্ছেন!

যে পৃথিবী পারমাণবিক অস্ত্রে যুদ্ধের ভয়ঙ্কর দম্ভে, আর সামরিক অভিযানের বোমারু বিমানে আকাশ কাঁপিয়ে দিত আজ এক জীবাণুর সামনে অতিশয় ক্ষুদ্রই নয়, তুচ্ছ হয়ে গেছে। গণমাধ্যমও আর খবর নেয় না কার কত সামরিক শক্তি কার কত বিত্তবৈভব। গোটা মানবজাতি এক মোহনায় মিলিত হয়েছে আজ করোনার ত্রাসের মুখে! পৃথিবীর তাবৎ বাদশাহ আর ক্ষমতাধর একনায়ক যারা কথায় কথায় জেল দিতেন আজ কোয়ারেন্টাইনের নামে জীবনের ভয়ে কার্যত তারাও গৃহবন্দী! ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়করা এখন কি সামরিক ও যুদ্ধ ব্যয় কমিয়ে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বরাদ্দ সর্বোচ্চ করবেন?

পৃথিবীজুড়ে মানব বিপর্যয়ের আড়ালে চলছে এখন অর্থনৈতিক বিপর্যয়। করোনা রুখলেই বেরিয়ে আসবে তার ভঙ্গুর বিধ্বস্ত চেহারা! বেঁচে থাকলে করতে হবে আরেক লড়াই। আরেক আত্মসমালোচনা আত্মশুদ্ধি আত্মসংযমের পথ। প্রকৃতিকে রুদ্ররুষ্ট করার নির্দয়তার পথ থেকে মুক্ত হয়ে মানবিক পৃথিবী গড়ার চেতনায় কি এই লাশের ওপর দাঁড়িয়ে শিক্ষা নেবেন রাষ্ট্রনায়করা? ধর্মের নামে ক্ষমতার নামে কর্তৃত্ববাদী আচরণ ও দম্ভের পথে মানুষ হত্যা আর দখল থেকে মুখ ফেরাবেন? আদৌ কি তারা বুঝছেন মানুষ হত্যা সহজ কিন্তু সেই জীবনই রক্ষা অনেক কঠিন!

শিশুরা যে সত্য জেনেছে আজ সেই সত্যের মুখে কি তারা আজ দাঁড়াবেন? মানুষ হত্যা দুর্বলের কাজ- রক্ষাই সবলের। মৃত্যুই সত্য কিন্তু স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি মানবজাতির অধিকার। পৃথিবীতে সমরাস্ত্রের ক্ষমতা নয়, মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করার যে বার্তা দিয়েছে করোনা সে চ্যালেঞ্জ কি নিতে পারবে দুনিয়া? করোনার তা-ব থামলে বেঁচে থাকলে দেখা যাবে সেটি। তাই না? এখন কেবল মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »




সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]